আধ্যাত্মিক দর্শন ও আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

আধ্যাত্মিক দর্শন ও আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা

5 December 2014, 2:18:40

স্কো. লি. আহসান উল্লাহ (অব.)

ভূমিকা। ব্যক্তি-মানুষের জীবনে পাঁচ ইন্দ্রিয় শক্তির (দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ) বাইরেও কিছু কিছু ঘটনা ঘটে থাকে। স্বাভাবিক বুদ্ধি বা কার্য-কারণ তত্ত্ব দিয়ে তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কিন্তু মানব জীবনে এরকম বহু ঘটনা ঘটে। যেমন: একজন স্বপ্নে দেখেছেন, তিনি মরা মানুষ জীবিত করতে পারেন; কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান; কারো কারো নজর লাগে বা মুখ লাগে যার ফলে অন্যের ক্ষতি হয়; কেউ কেউ ভবিষ্যতে কোথায় কি ঘটবে তার পূর্বাভাস পান, ইত্যাদি। এরূপ ঘটনা পাঁচ ইন্দ্রিয় ক্ষমতার বাইরে। তাই এসবের নাম অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক ঘটনা।

বিভিন্ন ধর্মে  আধ্যাত্মিক  বা অতীন্দ্রিক ঘটনা ও ক্ষমতার বহু নজির পাওয়া যায়। যেমন: হজরত ইবরাহিম(আ.)এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা পাওয়া এবং আল্লাহ কর্তৃক তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু (পুত্র) কুরবানি করার নির্দেশ, হজরত মূসার (ক.) সঙ্গে আল্লাহর সাক্ষাৎ বা তাঁর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়া,  হজরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য খাদ্যসজ্জিত টেবিল আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া, আল্লাহর ওহী জিবরাঈলের (আ.) মাধ্যমে হজরত মোহম্মদের (স.) এর কাছে নাজেল হওয়া এবং তাঁর মে’রাজ গমন, হজরত সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে বিশেষ ফিতারের জ্ঞানী এক ব্যাক্তিত্ব রাষ্ট্রের রানী বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকে ইয়ামন থেকে উঠিয়ে আনা,  হজরত ইউনূসের (আ.) মাছের পেটে বেঁচে থাকা ইত্যাদি বহু দৃষ্টান্ত দেয়া যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে বহু উদাহরণ আছে যারা এসব আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক চর্চা করে সফল হন। তারা সমাজে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন।এই উপমহাদেশে সভ্যতার উষালগ্ন থেকে আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক চর্চা হয়ে আসছে। সাধু-সন্ত-সন্যাসী, আউল-বাউল, পীর-ফকির, আউলিয়া-কুতুব-দরবেশ, মরমি-সুফি, ভিক্ষু-শ্রমণ, পুরুত-ঠাকুর, তান্ত্রিক-যোগী-পরমহংস প্রমুখ পদ-নাম এর সঙ্গে জড়িত। এঁরা অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক কেরামতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুগে যুগে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, যার যার ধর্ম বা আদর্শিক মতবাদ প্রচারের কাজ করেছেন এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন।

আবার জাদুকর, ডাকিনী, গুণিন, ওঝা, বৈদ্য, বাজিকর প্রমুখ ঝাড়ফুঁক, জাদু টোনা, বান মারা, বশ করা, ভুত ছাড়ানো প্রভৃতি তেলেসমাতি দেখিয়ে লোকজনকে বশীভূত বা সম্মোহিত করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করেন। আর যারা ব্যর্থ হন তারা উন্মাদ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও লাঞ্চনা-গঞ্জনার শিকার হন। বলা বাহুল্য, ধর্ম সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং গোঁড়ামিই তাদের মত ধোঁকাবাজদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ করে দেয়।

শাব্দিক অর্থ। আধ্যাত্মিক শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘আত্ম থেকে জাত’ বা ‘আত্মা সম্বন্ধীয়’ বা ‘মানসিক বা ব্রহ্মবিষয়ক’। অধ্যাত্ম অর্থ জীবাত্মা/পরমাত্মা। অধ্যাত্মবাদ একটি দার্শনিক মতবাদ যার মর্মকথাÑ ‘পরমাত্মাই সবকিছুর মূল’ । বাংলা ভাষায় অধ্যাত্ম ও আধ্যাত্মিকতা বা অতীন্দ্রিক ক্ষমতার বহু সমার্থক শব্দ পাওয়া যায়, যেমন অধ্যাত্মবাদ/তত্ত্ব, আত্মদর্শন, আত্মজ্ঞান/বিদ্যা, সুফিবাদ, ব্রহ্মবাদ/বিদ্যা, দেহতত্ত্ব, অন্তদৃষ্টি/জ্ঞানদৃষ্টি, মারেফাত, মনোজ্ঞান, যোগজ্ঞান, চীবর, মরমিবাদ, অতীন্দ্রিয়বাদ, পরমাত্মা, চৈতন্যবাদ, মুরাকেবা, আলোকদৃষ্টি, অলৌকিকতত্ত্ব ইত্যাদি।

২। আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক দর্শন (Mysticism)|

আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক দর্শন-এর সমার্থক শব্দ অধ্যাত্মবাদ, আত্মিকবাদ, অতীন্দ্রিয়বাদ, মরমিবাদ, সুফিবাদ ইত্যাদি (Mysticism)। এই নিবন্ধে Mysticism (মিস্টিসিজম) এর বাংলা পরিভাষা হিসেবেই এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। ‘মিস্টিসিজম’ এমন এক গূঢ় তত্ত্ব, যা স্রষ্টা সম্পকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্থাৎ সর্বত্রই বিরাজমান তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি দেয়। বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান, ইহুদী প্রতিটিতে ‘মিস্টিসিজম’ চর্চা চলে আসছে। তার সাথে সংশ্লিষ্ট সব আদর্শ, নৈতিকতা, আচার-প্রথা, পুরাণ, উপকথা, জাদুটোনা ইত্যাদিও রয়েছে। এর প্রভাব বিশ্বের প্রচলিত সব ভাষার সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা ও গানে অতি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

যিনি মিস্টিসিজম চর্চা করেন তাকে বলা হয় মিস্টিক। এর ব্যবহারিক বাংলা অর্থ মরমি সাধক বা মরমিয়া, সুফি, মুর্শিদ, দরবেশ, সাধু, সন্ন্যাসী, তান্ত্রিক, গুরু ইত্যাদি। ইংরেজি Mysticism এসেছে গ্রিক শব্দ mystes থেকে যার অর্থ চোখ বন্ধ করা। মরমি সাধকেরা চোখ বন্ধ করে অন্তর্দৃষ্টি ও গভীর চিন্তা-তন্ময়তার মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরকে উপলব্ধি করার প্রয়াস পান। এই প্রয়াসে মনীষা ও ভাবাবেগের এক প্রকার সংমিশ্রণ ঘটে। এই মিশ্রণের বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ রূপক ও উপমা ছাড়া সম্ভব নয়। সুফিবাদেরও মর্মকথা: ‘হৃদয়ে তোমার চলে যেন আলিফের (আল্লাহ) খেলা। পবিত্র দৃষ্টি দিয়ে যদি তুমি জীবনকে দেখতে শেখো, তুমি জানবে আল্লাহর নামই যথেষ্ট। আল্লাহ প্রেমময় ও সৌন্দর্যময়। তিনি অনন্ত, অবিনশ্বর ও সর্বত্র বিরাজমান। প্রেম ও ভক্তির পথে আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমেই তাঁকে পাওয়া যায়। আল্লাহতে অনুগত বা লীন হওয়া সুফি সাধকের চরম লক্ষ্য।’

আধ্যাত্মিক সাধনা বা অধ্যাত্মবাদ অর্থ ব্রহ্ম বা পরমাত্মাই সবকিছুর মূল, এই দার্শনিক মত; আমাদের যাবতীয় জ্ঞানই জ্ঞাতার আত্মগত, এই মত। সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়, অধ্যাত্মবাদ এমন এক দর্শন, যেখানে আত্মার অবস্থা সম্পর্কিত আলোচনাই মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে স্রষ্ঠা/আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মূলকথা। পরমসত্তা বা আল্লাহকে জানার ও চেনার আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের মাধ্যমে জানার প্রচেষ্টা হলো অধ্যাত্মবাদ বা আধ্যাত্মিকতা বা অতীন্দ্রিক দর্শন।

ধর্ম, অধ্যাত্মবাদ ও আধ্যাত্মিকতাকে যদি একটা পিরামিড ভাবা হয় তবে ধর্ম হল নিম্নতম স্থান, অধ্যাত্মবাদের স্থান এর উপরে এবং পিরামিডের চূড়ায় থাকছে আধ্যাত্মিকতা।

প্রথম ধাপে আছে ধর্ম- যেমন ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ধর্ম প্রমুখ। অর্থাৎ, যেটা মানুষের তৈরী ঈশ্বরের কাছে যাবার জন্যে আপন দেশ কাল গন্ডীর সীমায় আবদ্ধ থাকে। তাই বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মে একেক রকম ভাবনা- কেউ ভগবান, কেউ ঈশ্বর, কেউ ডাকেন আল্লাহ। সব মানুষদের তৈরী। ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার জন্যে পথের শুরু বলা যায়।

ধর্মের গভীরে যদি যাওয়া যায় তবে দেখা যাবে তার যে আসল ভাব সেটি হল অধ্যাত্মবাদ। অর্থাৎ, ঈশ্বরকে ভালোবেসে তার কাছে পৌঁছানোর জন্যে যে বিভিন্ন জ্ঞান, যোগ বা ভক্তির পথ তা এখান থেকে শুরু। এখানে অধ্যাত্মবাদে কোনো ধর্মের সংকীর্ণতার মধ্যে মানুষ আবদ্ধ হয়না। যারা ধর্মের দেশ কাল পাত্রের গন্ডীর উপরে উঠতে পেরেছেন তারাই এই অধ্যাত্মবাদ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন আর কিভাবে সেই অধ্যাত্মবাদকে আয়ত্ত করা যায় সেজন্যে চেষ্টা শুরু করেন।

আর অধ্যাত্মবাদ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে করতে যারা নির্দিষ্ট উপায়ে সে পথে এগোতে শুরু করেন তাদের মধ্যেই জাগে আধ্যাত্মিক চেতনা। তারাই হলেন যথার্থ আধ্যাত্মিক পথের পথিক। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, আধ্যাত্মিক হওয়াই আসল। কারণ সকল ধর্মের মূল নির্যাস হলো আধ্যাত্মিক চেতনা। তাইতো আধ্যাত্মিক পথের গভীরে গিয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন ‘যত মত তত পথ’। আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত হলে এই উপলব্ধিই আসে।

আবার চারু শিল্পী শহিদ কবির বলেন,‘অধ্যাত্মবাদ হচ্ছে রূঢ় বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানো। মনে হলো, অধ্যাত্মবাদের ওপর আমার বিশ্বাস বাস্তবতা থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। স্পর্শ না করা পর্যন্ত কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নয় এমন ধারণা আস্তে আস্তে পেয়ে বসে।’

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা ( Parapsychology)

কিভাবে শুরু হলো ?

আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড নিয়ে আমাদের দেশে কোন যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেষ্টা হয়েছে বলে জানা নেই।

উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে পশ্চিমে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়, বিশেষ করে জার্মানিতে। জার্মানিতে প্রথম মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাগার (Laboratory of Experimental Psychology) স্থাপনের পর মনোবিজ্ঞান যেমন বিজ্ঞানের মর্যাদা দ্রুত অর্জন করে, তেমনি তার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যাও।

অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বিজ্ঞানের যে শাখা কাজ করে তারই নাম আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিয় বা ইন্দ্রিয়াতীত বা আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা (parapsychology)

Parapsychology শব্দটি দার্শনিক ম্যাক্স Dessoir ১৮৮৯ সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে প্রথম ব্যবহার করেন। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক উইলিয়াম জেমস (১৮৪২১৯১০) প্রথম আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তখন বলা হতো মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক গবেষণা (psychical research)

১৯৩০ এর দশকে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক বিষয় হিসেবে পরীক্ষামূলক পদ্ধতির (experimental methodology) দিকে সরানো হয় এবং আধ্যাত্মিক গবেষণার বদলে আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জে.বি. রাইন ও তাঁর স্ত্রী লুসিয়া রাইন মনস্তাত্বিক গবেষণাকে পরীক্ষামূলক গবেষণায় উন্নীত করার চেষ্টা করেন।

জে.বি. রাইন বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য অতীন্দ্রিয় উপলব্ধিকে (extrasensory perception-esp) ব্যবহার করেন। অতীন্দ্রিয় উপলব্ধিকে অনেক সময় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নামেও অভিহিত করা হয়। অতীন্দ্র্রিয় উপলব্ধি বলতে বোঝায় মনের বিশেষ ক্ষমতার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে শারীরিক কোন উপায়ে বা পাঁচ ইন্দ্রিয় শক্তি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। এই পরিভাষাটি (esp) সাধারণ উপায় ব্যতিরেকে বিশেষ উপায়ে তথ্য লাভকে নির্দেশ করে। যেমনমনের দ্বারা অতীতকালের তথ্য লাভ।

১৯৪০ সালে জে.বি.রাইন ও জে. জি. প্র্যাট ১৮৮২ থেকে হালনাগাদ অবধি কার্ডভিত্তিক অনুমান সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগুলো পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে একটি রচনা লেখেন। রচনাটির নাম Extra-Sensory Perception After Sixty Years (আধ্যাত্মিক/অতীন্দ্রিক উপলব্ধির ষাট বছর)। এটি বিজ্ঞান সম্মত প্রথম মেটাঅ্যানালাইসিস হিসেবে স্বীকৃত। এতে ৫০টি পরীক্ষার কথা উল্লেখ আছে, তন্মধ্যে ৩৩টিতে রাইন ছাড়াও অন্যান্য গবেষক ও ডিউক ইউনিভার্সিটির অবদান রয়েছে। এই মেটাঅ্যানালাইসিস অনুসারে স্বাধীন পরীক্ষাগুলোর ৬১%ফলাফল আধ্যাত্মিক/অতীন্দ্রিক উপলব্ধির (ইএসপি) সপক্ষে।

মানে কি?

গ্রিকভাষা থেকে আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক মনোবিদ্যা Parapsychology টার্ম এর উৎপত্তি। এর বাংলা অর্থ- যে মনোবিদ্যা প্রচলিত/গোঁড়া বিজ্ঞান কর্তৃক বাদ দেয়া মানসিক ঘটনাবলী (psi phenomena) নিয়ে কাজ করে।জীববিজ্ঞানী Berthold P. Wiesner আবিস্কার করেছেন গ্রিক শব্দ psi (সাই)।গ্রিক বর্ণমালার ২৩তম অক্ষর psi (সাই)।এর অর্থ মন বা আত্মা। সাই বা মন বা আত্মা একটি অতীন্দ্রিক/আধ্যাত্মিক(extrasensory) উপলব্ধি/শক্তি।এই শক্তি দিয়ে কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।এই অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীর(psi phenomena) অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা প্রাকৃতিক বা জীব বিজ্ঞানে অস্বীকৃত। এ বিষয় নিয়েই কাজ করে Parapsychology (আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা)। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট দাউলেস ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকলজিতে লেখা একটি প্রবন্ধে ১৯৪২ সনে এ বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করেন। মনোবিজ্ঞান (Psychology) কাজ করে পাঁচ ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য আচরণ নিয়ে আর আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা (Parapsychology) কাজ করে পাঁচ ইন্দ্রিয়-বহির্ভূত আচরণ নিয়ে।

প্রকারভেদ

প্যারাসাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন সাইকে (psi) দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে- অতীন্দ্রিক উপলব্ধি (সাই-গামা)এবং মনো-সঞ্চালন শক্তি (সাই-কাপ্পা)।

অতীন্দ্রিক উপলব্ধি (extrasensory perception) হচ্ছে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা। শিশুদের মধ্যে এটা প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ক্ষমতাটি কমে যেতে থাকে। তবে কিছু মানুষের মাঝে বয়স বাড়লেও ক্ষমতাটি রয়ে যায়। আর এ কারণেই হয়তো এ জাতীয় মানুষদের মাঝে অন্যকে সাহায্য করার প্রবল প্রবণতা দেখা যায়।

মনো-সঞ্চালন শক্তি/ক্ষমতা (Psychokinesis/Telekinesis or Mind Over Matter) হচ্ছে কোন বস্তুকে মনের শক্তি দ্বারা নাড়ানো অথবা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বিখ্যাত ম্যাজিসিয়ান ইউরি গেলার (Uri Geller)এই শক্তির সাহায্যে চামচ বাঁকিয়ে ফেলতে পারেন যা ‘Geller-effect’ নামে খ্যাত। এই ক্ষমতা প্রায় সবাই পেতে চায়। এখানে ট্রিক হচ্ছে আপনি যেটা দেখছেন সেটাকে গভীর বিশ্বাসের সাথে ভিন্নভাবে দেখা। সিনেমায় এমনটি আমরা হরহামেশা দেখি।

পরীক্ষা-নীরিক্ষা পদ্ধতি।

আধুনিক প্যারাসাইকোলজি নিয়ে গবেষণা মূলত বিভিন্ন দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত ও বেসরকারি অনুদানের মাধ্যমে নির্বাহিত হয়। প্যারাসাইকোলজি গবেষণার বিষয় মূলধারার একাডেমিক জার্নালে/পত্রিকায় খুব কমই প্রকাশিত হয়। অল্প কয়েকটি আছে, যেমন- Journal of Parapsychology, Journal of Near-Death Studies, Journal of Consciousness Studies, Journal of the Society for Psychical Research and Journal of Scientific Exploration|

আধ্যাত্মিক মনোবিদরা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীকে দৃশ্যমানভাবে পরীক্ষা করার জন্য বহু পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে গুণগত বৈশিষ্ট্য পরিমাপক সনাতন মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তেমনি পরিমাণগত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নীরিক্ষা নির্ভর বিভিন্ন পদ্ধতি। এর মধ্যে Ganzfeld, Remote viewing, psychokinesis or random number generators, Direct mental interactions with living systems উল্লেখযোগ্য।

কি পাওয়া গেল?

এসব গবেষণা থেকে এটুকু সত্যতা জানা গেছে যে দূরে নিঃসঙ্গ থাকা কোন ব্যক্তির ওপর অন্য ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশেষ মনোযোগ আরোপ করলে, তা নিঃসঙ্গ ব্যক্তির স্নায়ুকে প্রভাবিত (চঞ্চল বা শান্ত) করে। তবে, আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা নিয়ে গবেষণা শত বছরের বেশী সময় ধরে অব্যাহত থাকলেও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অকাট্য প্রমাণ আজও দেখানো যায়নি বলে সমালোচিত।

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার গবেষণার ব্যাপ্তি

আধ্যাত্মিক মনোবিদরা দাবি করেন যে অতীন্দ্রিক/আধ্যাত্মিক/অস্বাভাবিক ঘটনাবলীও বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়ন করা যায়। তারা দৃশ্যত বেশ কয়েক রকমের ঘটনা নিয়ে কাজ করেন। যেমন, মনালাপন (telepathy), অলোকদৃষ্টি (clairvoyance),পূর্বজ্ঞান / ভবিষ্যদ্বাণী(pre-cognition), অতীতজ্ঞান(post-cognition / retro-cognition), মুমূর্ষু অভিজ্ঞতা (near-death experience), পুনর্জন্ম অভিজ্ঞতা (Reincarnation experiences), ভৌতিক অভিজ্ঞতা (apparitionalexperiences) প্রভৃতি- এগুলোকে অতীন্দ্রিক উপলব্ধিও (extrasensory perception)  বলা হয়। এ ছাড়া রয়েছে মনো-সঞ্চালন শক্তি (Psychokinesis) সহ অগণিত অতিপ্রাকৃতিক (supernatural) এবং আধ্যাত্মিক ঘটনাবলী । দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকটি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলোঃ

মনালাপন বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগ (Telepathy)

কোন ব্যক্তি তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্য বা ছাড়া অন্য ব্যক্তির নিকট তথ্য বা ভাব স্থানান্তর করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় মনালাপন বা অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগ। অর্থাৎ মনের সাহায্যে দূরের কারও সাথে যোগাযোগ করা। পরিচিত কেউ বিপদে পড়লে আপনি হয়ত টের পেয়ে যান কিংবা স্মরণ করলে আপনিও বুঝতে পারেন। ইংলিশ পরিভাষায় এর নাম telepathy (টেলিপ্যাথি)। শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিকভাষা থেকে।tele অর্থ দূর (distant) এবং patheia/pathos অর্থ অনুভূতি/বোধ (feeling), উপলব্ধি (perception), প্রবল অনুরাগ/আবেগ (passion), দুর্ভোগ (affliction), ইত্যাদি  অভিজ্ঞতা । তার মানে  ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়া নিজের মনোভাব দূরে প্রেরণ করা এবং অন্যের থেকে  গ্রহণ করা।

মনোবিজ্ঞানে টেলিপ্যাথির বাংলা পরিভাষা ‘ইন্দ্রিয়াতীত যোগাযোগ’। অতীন্দ্রিয়’র সমার্থক শব্দ যেমন- আধ্যাত্মিক, অলৌকিক, দেহতত্ত্ব, ব্রহ্মজ্ঞান, অতিপ্রাকৃত ইত্যাদি বহু আছে।

পৃথিবীর সব দেশে সব সমাজে অতীন্দ্রিক যোগাযোগের ব্যাপারটি প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান। আধুনিক গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে অতীন্দ্রিক যোগাযোগ একটি আকর্ষণীয় বিষয়। দেখা যায়, এসব গল্প কাহিনীর সুপার হিরো এবং সুপার ভিলেনরা এবং ভিন গ্রহের প্রাণিরা অতীন্দ্রিক ক্ষমতার অধিকারি।

বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে পাশ্চাত্যে উনিশ শতকের শেষে। টেলিপ্যাথি উদ্ভাবন করেন ইতালীয় ক্লাসিক্যাল পন্ডিত ফ্রেডরিক মায়ারস ( ১৮৪৩ – ১৯০১)। তিনি প্রথম গবেষণা করার লক্ষ্যে ‘সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা শুরু হয় ১৯৮২ সনে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার তাৎপর্যময় অগ্রগতির এক পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মানসিক ঘটনাবলীর দিকে নজর দেয়। অনুমান এই যে, প্রাণির মধ্যে চুম্বকধর্ম বা আকর্ষণ শক্তি রয়েছে, যার নাম সম্মোহন। এর উপর পরীক্ষণের মাধ্যমে কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে।

এই অনুমান থেকে পদার্থ বিজ্ঞানীরা বৈদ্যুতিক চুম্বকত্বের পরিবেশে (ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিকফিল্ড- ইএম) বৈদ্যুতিক চুম্বকত্বের (ইএম) পরীক্ষণের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা হয়তো দেয়া সম্ভব বলে আশা করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপট থেকেই টেলিপ্যাথির সূত্রপাত। এনিয়ে তারা বহু গবেষণা করেছেন কিন্তু কোন ফল পাননি। তাই পদার্থ বিজ্ঞানীরা আধ্যাত্মিক ঘটনাবলীর সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান। বিজ্ঞান আজো এর রহস্য উদঘাটন করতে না পারলেও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

অতীন্দ্রিক যোগাযোগের সঙ্গে দুটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণার মিল আছে। তার একটি মনের মধ্যে বিভ্রান্তির আশা-যাওয়া ((delusion of thought insertion/removal) এবং অন্যটি মনস্তাত্ত্বিক মিথোজীবিতা বা দুই ভিন্ন জীবের সামঞ্জস্যপূর্ণ সহ-অবস্থানের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন (psychological symbiosis) । এই মিল থাকার কারণে অতীন্দ্রিক ঘটনাবলী নিয়ে কোন কোন মনোবিদ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় এগিয়ে আসেন।

চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান অনুসারে মানব মনে বিভ্রান্তির আসা-যাওয়া বিশেষত সিজোফ্রেনিয়া বা অনুরূপ শক্ত মনোরোগ। এধরনের মনোরোগী অবাস্তব কল্পনা/চিন্তা করেন, অসংলগ্ন ভাষায় কথা বলেন এবং অস্বাভাবিক আচরণও করেন। মনোরোগী নিজে বিশ্বাস করেন, এসব চিন্তা তার নিজস্ব নয়, অন্য কোন ব্যক্তি-মানুষ বা ভুত-পেতিœ বা দুষ্ট জ্বীন বা শয়তান কিংবা শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্রকারী গোপন কোন দুষ্টলোকের যাদুটোনা তার উপর ভর করেছে। সে (অন্য কেউ) তার (মনোরোগী) মধ্যে ঢুকে এসব চিন্তা করে আবার বের করে নিয়ে যায় (thought insertion/removal)। সাধারণত এধরনের মানসিক রোগীকে এন্টি-সাইকটিক ঔষধ বা থেরাপি দিয়ে সুস্থ করা হয়।

কোন ব্যক্তির শৈশবের প্রথম দিকে নিজের মন মানসিকতা এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে থাকে। অর্থাৎ শিশু একদিকে তার নিজের মনের অবস্থা এবং অন্যদিকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। শৈশবে মনের এ অবস্থাকে বলে মনস্তাত্ত্বিক মিথোজীবিতা। শিশুর মানসিক ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এটা আর থাকে না। কিন্তু কোন ব্যক্তির পরিণত বয়সেও শৈশবের অবস্থার অন্তর্নিহিত মর্মার্থ খুঁজে বের করা যায়।

অনুমান করা হয় যে, বিভ্রান্তি বা মতিভ্রমের অভিজ্ঞতা অথবা মনস্তাত্ত্বিক মিথোজীবিতা মনোবিদদের মনালাপনের আবিষ্কারের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এ থেকেই মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে, আধ্যাত্মিকতার অস্তিত্ব আছে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণামূলক তথ্যাদি এই ধারণা দেয় যে বিকারগ্রস্থ অসামাজিক ও আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্বের লোকেরা বিশেষভাবে আধ্যাত্মিকতার প্রতি বিশ্বাসী হন। মনোচিকিৎসক এবং চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরাও একই মত পোষণ করেন।

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা টেলিপ্যাথিকে এক ধরনের অতীন্দ্রিক প্রত্যক্ষণ অথবা ব্যতিক্রমী পরিজ্ঞান (anomalous cognition) রূপে বিবেচনা করে। আধ্যাত্মিক মনোবিদদের মতে ব্যক্তি তার অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক শক্তির  মাধ্যমে তথ্য বা ভাব স্থানান্তর করে। বিষয়টিকে তারা পূর্বজ্ঞান এবং অলোকদৃষ্টির শ্রেণিভূক্ত করেন। আধ্যাত্মিক যোগ্যতা পরখ করার জন্য তারা বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) করেন। তন্মধ্যে দুটি সুপরিচিত পরীক্ষার নাম যথাক্রমে: জেনার কার্ড (Zener cards) এবং গ্যানজফেল্ড পরীক্ষা (Ganzfeld experiment)। কিন্তু কোন ইতিবাচক ফল পাননি।

মনালাপন/টেলিপ্যাথি তিন ধরনের

অতীন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে এমন তিন ধরনের মনালাপন/টেলিপ্যাথির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেয়া হলো:

সুপ্ত যোগাযোগ সুপ্ত যোগাযোগে ব্যক্তি তার আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে তথ্য স্থানান্তর করেন। তথ্য প্রেরণ এবং গ্রহণের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান নিরীক্ষণ করা যায়। অতীতজ্ঞান, পূর্বজ্ঞান এবং স্বতঃস্ফূর্তজ্ঞান লব্ধ অনুভূতি এ যোগাযোগের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। তার মানে মনালাপনের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি তার মনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত অবস্থা আরেকজনের কাছে জানাতে পারেন।

আবেগ সংক্রান্ত যোগাযোগ একে দূর নিয়ন্ত্রিত প্রভাব বা আবেগপ্রবণ স্থানান্তরও বলা হয়। এটি সুখদুঃখের অনুভূতিকে বিকল্প অবস্থায় স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া।

অতিসচেতন যোগাযোগএ ধরণের আধ্যাত্মিক যোগাযোগে ব্যক্তি তার মনের সচেতনার গভীরতম স্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। গোটা মানব প্রজাতি সম্পর্কে সার্বিক জ্ঞান আহরণের জন্য গভীর ও বিস্তৃত উভয় জ্ঞান জগতে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য ব্যক্তি এরূপ যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

মনালাপন বা টেলিপ্যাথি বিজ্ঞানের নিয়মনীতি বিরুদ্ধ। আজো এর কোন বিজ্ঞানসম্মত কর্মসাধন পদ্ধতি ঠিক করা যায়নি। মহাশূণ্যের ভেতর দিয়ে এক ব্যক্তি সংকেত পাঠাবেন আর তা হাওয়ায় মিলিয়ে দূরে চলে যাবে অপর প্রান্তে আরেক ব্যক্তির কাছে যার কোন প্রমাণ পাওয়া যাবেনা এমন তত্ত্ব প্রাকৃতিক বা জীব বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার বাইরে মনালাপন বা টেলিপ্যাথিকে ছলনা/প্রতারণা, আত্মবিভ্রম ও আত্মপ্রবঞ্চনার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্যক্তির চিন্তা ও ভাষার বিভ্রম ঘটার আরেক নামও মনালাপন। পিরিডিন (Phencyclidine) জাতীয় মাদক দ্রব্য সেবন করেও কৃত্রিমভাবে টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা দেখানো যায়।

বিশ্বের সব দেশে সব ভাষার সাহিত্যে নাটক সিনেমায়, টেলিভিশন শোতে রোমাঞ্চকর আনন্দানুভূতি সৃষ্টির কাজে মনালাপন (টেলিপ্যাথি)ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি এক ধরনের বিনোদন বলে মনে করা হয়।

অলোকদৃষ্টি (clairvoyance)

শব্দটি ফরাসী ভাষা থেকে আগত।এর অর্থ স্বচ্ছ দৃষ্টিক্ষমতা। এটি এক ধরনের অতীন্দ্রিক উপলব্ধি। মানুষের জ্ঞান বা ইন্দ্রিয় ক্ষমতার বাইরের কোন মাধ্যমের সাহায্যে দূরের কোন ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা বাস্তব ঘটনা জানার যোগ্যতা। এই ক্ষমতা দিয়ে শুধু দেখা যায়। এটি তিন রকমের: অতীত-জ্ঞান,পূর্ব-জ্ঞান এবং সমসাময়িক ঘটনাবলী দেখা (যা স্বাভাবিক মানবিক ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য শক্তির বাইরে)।যার এই ক্ষমতা আছে তাকে বলা হয় স্বচ্ছদ্রষ্টা বা ত্রিকালদর্শী ।

‘বৈদেশে বৈরাজ্যে যাগো পুত্র মারা যায়, পশু-পঙ্খি ন জানিতে আগে জানে মায়’- বাংলার এই লোকসংগীতের চরণটি অলোকদর্শনের এক উত্তম উদাহরণ। তবে এই স্বচ্ছ অনুভব ক্ষমতা অর্জিত হয় মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুরূপ অতীন্দ্রিক ক্ষমতা উপলব্ধির মাধ্যমে। বৌদ্ধিক ধ্যান বা সমাধি-চর্চায় এক উন্নততর স্তরের সচেতন প্রক্রিয়া হিসেবে এর স্বীকৃতি রয়েছে। চোখ দিয়ে যা দেখা যায়না তা দেখা, কান দিয়ে যা শোনা যায়না তা শোনা, নাক দিয়ে যে ঘ্রাণ পাওয়া যায় না সে ঘ্রাণ পাওয়া, জিহ্বা দিয়ে যে স্বাদ গ্রহণ করা যায় না সে স্বাদ অনুভব করা, স্বাভাবিক জ্ঞান চর্চা দিয়ে নয় অন্তর্লোকের জ্ঞান দিয়ে পাওয়ারই নাম আলোকদৃষ্টি ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আলোকদর্শনকে দৃষ্টিভ্রম/মতিভ্রম রোগের লক্ষণ বলে মনে করেন। আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যায় একে অনুভূতির/অনুভবের এক অতীন্দ্রিক উপলব্ধি বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞান এটাকে স্বীকার করেনা।

পূর্বজ্ঞান (Pre-cognition/Pre-monition)

ভবিষ্যতে ঘটবে এমন ঘটনার পূর্বাভাস পাওয়াকে বলে পূর্বজ্ঞান। তার মানে ঘটনা ঘটার আগে ভবিষ্যতের কোন স্থান বা ঘটনা সম্পর্কিত তথ্য আগাম উপলব্ধি করা। ভবিষ্যত জানতে পারা বা দেখতে পাওয়া। যেমন কেউ কেউ দাবী করেন যে তার ভবিষ্যতে কি হবে সেটা তিনি টের পান বা তিনি স্বপ্নে দেখতে পান ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে বা মন থেকে সতর্কবার্তা পান। এই ব্যাপারটির এমনি আরও নানান রকম উদাহরণ আছে ।

অতীত জ্ঞান(post-cognition/retro-cognition)

এটা হচ্ছে অতীত দেখতে পাওয়া। যেমন কোন এক পুরনো নির্জন ভাঙ্গা বাড়িতে গিয়ে কেউ অনুভব করতে পারেন এখানে কি ঘটেছিল। সেখানে কারা বাস করতেন, কেমন ছিলেন তাঁরা, কি ঘটেছিল তাঁদের ভাগ্যে ইত্যাদি। এই ক্ষমতার অধিকারীরা অতীত সম্মন্ধে অনেক কিছু জানতে পারেন ।

মুমূর্ষু অভিজ্ঞতা (neardeath experience)

প্রায় যারা মারা যাওয়ার মতো বা মুমূর্ষু অবস্থা বা ক্লিনিক্যাল মৃত্যু  থেকে সেরে ওঠা কোন ব্যক্তির অভিজ্ঞতার বিবরণকে বলা হয় মুমূর্ষু অভিজ্ঞতা।এ অভিজ্ঞতার বিবরণ একেক জনের একেক রকম, যেমনঃ  দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়া; নিজের শরীর থেকে উপরে উঠে শূণ্যে ভেসে চলা এবং চারপাশের দৃশ্যাবলী অবলোকন করতে থাকা; ভালোবাসায় এবং শান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া; একটি সুড়ঙ্গের সরুপথ বেয়ে উপরের দিকে চলে যাওয়া; ইতিপুর্বে মৃত আত্মীয়-স্বজন বা ঐশ্বরিক/ভৌতিক আকৃতি/চেহারার সঙ্গে সাক্ষাত হওয়া; অপ্রত্যাশিত আলোর সামনে পড়া বা আলো হয়ে যাওয়া; নিজের জীবনকে পুননিরীক্ষণের অভিজ্ঞতা; কোন কিছুর শেষ/প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া;এবং স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিজের দেহে ফিরে আসার অনুভূতি ইত্যাদি।

পুনর্জন্ম অভিজ্ঞতা (Reincarnation experiences)

মৃত্যুর পর আবার জন্ম নিয়ে নতুন শরীরের মধ্যে  পূর্বজন্মের  মানবিক চেতনা বা আত্মার স্মৃতি প্রকাশ করতে পারার নাম পুনর্জন্ম অভিজ্ঞতা । এ সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোচিকিৎসাবিদ আয়ান স্টিভসন্স প্রায় ৪০ বছর ধরে ২৫০০ কেস স্টাডি করেন এবং এগুলো নিয়ে ১২টি বই লেখেন। তিনি দেখতে পান যে পুনর্জন্মের সাথে বাহ্যত শৈশবের স্মৃতি জড়িত/সম্পৃক্ত। সাধারণত তিন থেকে সাত বছরের শিশুরা আগের জন্মের স্মৃতি মনে করতে পারে। তারপর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা স্মৃতি থেকে মুছে যায়। এ নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর পক্ষে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

ভৌতিক অভিজ্ঞতা (apparitional experiences)

কোন মৃত ব্যক্তির আত্মা তার বেঁচে থাকা কালীন পুরনো জায়গায় বারবার ফিরে আসে বলে মনে করা, বা মৃত ব্যক্তি বেঁচে থাকা কালে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের সম্মুখীন হওয়াকে বলে ভৌতিক অভিজ্ঞতা।এটি দৃশ্যত কোন জীব বা অশরীরী কিছু বিনা প্ররোচণায় সামনে এসে হাজির হতে দেখা। ব্যক্তি জেগে থেকে বা ঘুমেও এমন স্বাপ্নিক দৃশ্য দেখতে পায়।এটি একটি এলোমেলো, বিশৃঙ্খল, ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধি।একে জ্বিন-ভুত-প্রেত আরোপিত ঘটনাও বলা হয়।

বিজ্ঞান একে প্রেতাত্মা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারণ, মানুষ মৃত্যুর পরেও কিছু স্মৃতি রেখে যায়, যা অন্যের কাছে বাস্তব বা মুর্তি রূপে ধরা পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ভূতের গল্পের/কাহিনীর ভূত আর সত্যিকার ভৌতিক অভিজ্ঞতা প্রাপ্তদের ভূত এক নয়। ভৌতিক অভিজ্ঞতার ভূত/প্রেতাত্মা জীবজগতের মানুষ বা অন্যকোন প্রাণী কিংবা অপ্রাণীবাচক কোন বস্তু। গল্পের ভূতের মতো একেবারে কাল্পনিক কোন মুর্তি নয়।

এক গবেষণায়, বাস্তব জীবনে ভৌতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এরকম ১৮০০ ব্যক্তির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ থেকে জানা যায় যে, গতানুগতিক ভূত-প্রেতের গল্পের চেয়ে প্রেতাত্মা দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা পুরোপুরি আলাদা। বাস্তবে ভৌতিক অভিজ্ঞতা সবসময় ভীতিকর নয়। বরং বিভিন্ন মানসিক চাপ কিংবা সংকটে পড়েই মানুষ প্রেতাত্মা দেখলেও তা মানসিক চাপ কমাতে বা সংকটে শান্ত থাকতে সাহায্য করে। ব্যক্তি প্রেতাত্মা দেখতে পায় নিজের বাড়িতে বা কর্মস্থলে কর্মরত অবস্থায় এবং স্নায়বিক দূর্বল অবস্থার কারণে। কেউ ভূত দেখার ইচ্ছা করলেই ভূত দেখা যায় না। ভূত দেখে ছায়ামূর্তিরূপে কিন্তু পরিষ্কারভাবে নয়। ব্যক্তির দৃষ্টিভ্রম অবস্থার মান অনুযায়ী প্রেতাত্মার মূর্তিরূপ দেখতে পায়। অনেক সময় অভিজ্ঞতার পর তার অন্তর্দৃষ্টিতে ভেসে উঠে। ভূত-দ্রষ্টার সাথে দেখা ভূতের কোন কথা-বার্তা হয় না । শুধুই দেখে। ভৌতিক অভিজ্ঞতাটা কেবল ঐক্ষিক/দৃষ্টি নির্ভর।

ভৌতিক অভিজ্ঞতাটা মূলত দু'একটি দৃষ্টিবিভ্রম(visual illusion/hallucination)।মানসিকভাবে সুস্থ বা অসুস্থ যে কেউ তার অন্তর্নিহিত  মানসিক অবস্থার কারণে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারে।

একই সময় দুই জায়গায় দেখা দেয়ার ক্ষমতা (Bilocation)

কোন ব্যক্তির একই সময় দুই বা ততোধিক ভিন্ন ভিন্ন স্থানে শারীরিক ভাবে উপস্থিত হওয়া বা দেখা দেওয়ার আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে বাইলোকেসন বা মাল্টিলোকেসন বলে। বলা হয়ে থাকে আউলিয়া, দরবেশ,পীর-ফকির, মুনি ঋষি প্রমুখ এ ধরনের ক্ষমতার অধিকারী হন। এ তত্ত্বটি গ্রিক দর্শন, পুরোহিত-চিকিৎসাতত্ত্ব (Shamanism) পৌত্তলিকতাবাদ (Paganism), লোকাচার বিদ্যা (Folklore), ব্রহ্মবিদ্যা/জ্যোতিষশাস্ত্র (Occultism), জাদুবিদ্যা, অতীন্দ্রিয়চর্চা, সিদ্ধিলাভ তত্ত্ব, বৌদ্ধতত্ত্ব, রহস্যবাদ এবং দিব্যজ্ঞানবাদ (Theosophy) ইত্যাদিতে দেখা যায়। কোন কোন ধার্মিক গুরু বা ব্যক্তি (সাধু-সন্ন্যাসী, পীর-পয়গম্বর, মুনি-ঋষি) একই সময় বিভিন্ন স্থানে দেখা দেন বা তাঁকে দেখা গেছে বলে দাবী করা হয়। এটি একটি উচ্চমার্গের ব্যক্তিকেন্দ্রিক (highly subjective) অভিজ্ঞতা। এর রহস্য এখনও বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি।

নক্ষত্রলোকে ভ্রমণ (Astral Projection /travel)

আধ্যাত্মিক ভাবে বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারার ক্ষমতা, তবে শারীরীক ভাবে নয়। পুরো ব্যাপারটিই মানসিক। চীন সহ বিভিন্ন দেশে হাজার বছরের পুরনো একটি ধারণা। এ এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কোন ব্যক্তি তার বর্তমান দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, নক্ষত্র-ভ্রমণোপযোগী দেহ বা রূপ ধারণ করে ভিন্ন নক্ষত্রে গিয়ে ফিরে আসাকে বলে নক্ষত্রলোকে ভ্রমণ বা এ্যাস্ট্রাল প্রজেকসন/ ট্র্যাভেল। নক্ষত্রলোকটা আমাদের পৃথিবীর বাইরে ভিন্ন কোন প্রান্তর (Astral Plane)।

এই তত্ত্বটি বিশেষত ধর্মের সঙ্গে জড়িত। ধর্মগ্রন্থ বাইবেল ও কোরআন, প্রাচীন মিশরীয় ধর্মতত্ত্ব, চীনের তাওবাদ, ভারতে বাল্মিকির যোগবশিষ্ঠ মহারামায়ণ প্রভৃতি গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে।

হজরত মুহাম্মদ (স.)তাঁর মক্কী জীবনের শেষ দিকে, মতান্তরে হিজরতের তিন বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে বোরাক নামক বাহনযোগে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে রফরফ যোগে ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণের মাধ্যমে সৃষ্টির অনন্ত রহস্য অবলোকন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করেন। এর পর বায়তুল মুকাদ্দাস ফিরে এসে সব নবী-রসূলের ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করে মক্কায় ফিরে আসেন। নবীজির (স.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের ভ্রমণকে 'ইসরা' এবং বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বলোকে ভ্রমনকে 'মেরাজ' বলা হয়। আরবি শব্দ মেরাজ অর্থ ওপরে ওঠার সিঁড়ি বা সোপান। ইসরা সম্পর্কে কোরানের ১৭ নং সূরা ইসরার প্রথম আয়াতে এবং মেরাজ সম্পর্কে কোরআনের ৫৩ সংখ্যক সূরা আন নাজমের ৮ থেকে ১০ এবং ১৩ থেকে ১৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বহু বিশুদ্ধ হাদিসেও ইসরা ও মেরাজের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে  এমন আরও বাস্তব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যেমন হজরত মুসা (আ.)-এর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়ার ঘটনা (৭ম সূরা আরাফ), হজরত ইবরাহিম(আ.)এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা পাওয়া (২১ সূরা আম্বিয়া আয়াত ৬৮- ৬৯), হজরত ঈসা(আ.)-এর উম্মতের জন্য আকাশ থেকে গায়েবি খাদ্য মান্না ও সালওয়া নামিয়ে দেয়া(২ সূরা বাকারা ৫৭ আয়াত), হজরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য খাদ্যসজ্জিত টেবিল আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া (৫ সূরা মায়েদা ১১২-১৩ আয়াত), হজরত সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে বিশেষ ফিতারের জ্ঞানী এক ব্যাক্তিত্ব রাষ্ট্রের রানী বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকে ইয়ামন থেকে উঠিয়ে আনা (২৭ সূরা নামল, আয়াত ৪০)। ভারতের গুরু পরমহংস যোগানন্দ নক্ষত্র ভ্রমণের মাধ্যমে স্বামী প্রণবানন্দের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন । ভগবান শ্রী রজণীশও অনুরূপ নক্ষত্রলোকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন বলে দাবী করেন। আত্মসম্বরণ ও আত্ম-শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন-যাপনের মাধ্যমে যোগসাধনা করে এবং ধ্যানের মাধ্যমে নক্ষত্রলোকে ভ্রমণ করা সম্ভব বলে চীন-তিব্বতী আধ্যাত্মিক সিস্টেমে এবং বৌদ্ধ ধর্মে দাবী করা হয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান দাবী করে যে নক্ষত্র ভ্রমণ কোন বস্তুগত ঘটনা নয় কারণ এর কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা এ নিয়ে গবেষণা করে কোন ইতিবাচক ফল পায়নি। মনোবিদরা দাবী করেন এটি অলীক বিশ্বাস (delusion), দৃষ্টিভ্রম/মতিভ্রম (hallucination) বা রঙিন স্বপ্ন। স্বপ্ন, মাদকাসক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের ধ্যানমগ্নতার কারণে নক্ষত্রলোকে ভ্রমণের কাল্পনিক অভিজ্ঞতা হতে পারে বলে চিকিৎসা মনোবিদরা দাবী করেন।

মনোসঞ্চালন শক্তি (Psychokinesis)

কোন ব্যক্তি তার মনের জোর বা মানসিক শক্তি দিয়ে অন্য কোন ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা সময়কে নাড়ানো বা প্রভাবিত করার যে ক্ষমতা বা শক্তি তারই নাম মনো-সঞ্চালন শক্তি। ইংরেজীতে Psychokinesis। শব্দটি গ্রিকভাষা থেকে নেয়া। গ্রিক শব্দ psyche মানে মন (mind), আত্মা (soul), তেজস্বিতা (spirit), হৃদয় (heart) ও শ্বাস-প্রশ্বাস বা দম (breath)এবং kinesis মানে গতি (motion), সঞ্চালন বা নাড়ানো (movement)। এক কথায় সাইকোকাইনেসিস-এর শব্দগত অর্থ মনো-সঞ্চালন শক্তি (mind movement)।

একে Telekinesis (টেলিকাইনেসিস)ও বলা হয়। এর অর্থ দূর-সঞ্চালন শক্তি (distant movement)। এটি একটি মানসিক ক্ষমতা বা জোর যার দ্বারা কোন ব্যক্তি কোন বস্তুকে দৈহিকভাবে স্পর্শ না করে সরাতে বা নাড়াতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, ‘আরব্য রজনী’র আলী বাবার ‘সিসেম ফাঁক’ বলে ৪০ চোরের গুপ্তধন ভান্ডারের দরজা খোলা, আধ্যাত্মিক সাধকদের নিজ দেহকে শূণ্যে ভাসিয়ে বেড়ানো (levitating), কল্পবিজ্ঞানের প্রাণী বা বস্তুকে দূরে স্থানান্তর করা (teleport), প্রভৃতি।

আধ্যাত্মিক মনোবিদরা প্রবল মনো-সঞ্চালন শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করেন এবং এ নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। মনের জোর খাটিয়ে জুয়া খেলার ঘুঁটি (dices) এবং এলামেলো সংখ্যা (random number) পরিবর্তন করার উপর তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন ।

শুরুতে মনো-সঞ্চালন বা দূর-সঞ্চালন শক্তিকে মনে করা হতো মৃত ব্যক্তির প্রেতাত্মা, দুষ্ট জ্বীন, ভূত-পেত্নী বা অন্যান্য অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কর্মকান্ড। পরে, এটিকে জীবিত মানুষেরও কাজ হতে পারে বলে বিশ্বাস করা শুরু হয়। ধরে নেয়া হতো যে, কিছু ব্যক্তি এরকম ক্ষমতার বলে মৃতের আত্মার কাছ থেকে বার্তা লাভের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে- যেমন অন্ধকার নিঃশব্দ ঘরে এবং নির্দিষ্ট ভাষায়- মৃত ব্যক্তির আত্মাকে হাজির করিয়ে তার আত্মীয়দের সাথে কথা বলা যায়। এর আরেক নাম ‘প্লানচেট’।

পরবর্তি ধাপে এটি আধ্যাত্মিক মনোবিদদের গবেষণার বিষয় রূপে গণ্য হয়। ১৯৩৪ সনে জে বি রাইন এ নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু করেন। কিছু কিছু গবেষক অনুমান করেন যে, কোন কোন ব্যক্তির দেহকোষে এমন একটি রস বা তরল পদার্থ (fluid) আছে যার সাহায্যে তিনি মনের এই প্রবল জোরের অধিকারী হন। এই রসের নাম psychode, psychic force, বা ectenic force। যাহোক, গবেষকরা মানব দেহকোষে এ ধরনের রসের অস্তিত্ব আজো খুঁজে পাননি বলে এটিকে অনুমানই মনে করেন।

আধুনিক কালে, প্যারাসাইকোলজি, গল্পের জগত এবং ‘নিউ এইজ’ বিশ্বাস মনো-সঞ্চালন শক্তিকে (সাইকোকাইনেসিস) একই ছাতার তলে অনেকগুলো সমস্যা সমাধানের সমাহার বলে দাবী করেন। তালিকা নিম্নে দেয়া হলো: |

(১)       শারীরিক উপশম (biological healing)।

(২)        ইলেকট্রনের নিয়ন্ত্রণ।

(৩)       চুম্বকত্ব নিয়ন্ত্রণ (control of magnetism)।

(৪)        ছায়া নিয়ন্ত্রণ (control of shadows) ।

(৫)       সময়ের নিয়ন্ত্রণ।

(৬)       শক্তি বর্ম সৃষ্টি (energy shield) ।

(৭)        ক্রীড়া ও খেলাধূলা, জুয়া, নির্বাচন, আয়ুস্কাল বর্ধিতকরণ প্রভৃতি ঘটনায় প্রভাব সৃষ্টি।

(৮)      বস্তুর পারম্পরিক বাস্তব অবস্থান নির্ধারণ।

(৯)       বস্তুর আকৃতির রূপান্তর/পরিবর্তন।

(১০)   চিন্তার আকার সৃজন অর্থাৎ মনের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর আকৃতি তৈরী করে বাস্তবে তা হুবহু প্রদর্শন করা।

 (১১)   বস্তুর রূপান্তর সাধন।

দূরসঞ্চালন শক্তি (টেলিকাইনেসিস) প্রয়োগ/ব্যবহার করে ব্যক্তি বা বস্তুকে অবস্থান থেকে নাড়ানো বা পরিবর্তন করা যায়/হয়। এগুলো দু’ধরণের। তালিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:     

(১)       সামগ্রিক/ম্যাক্রো-সঞ্চালন (Macro-telekinesis) যার মাধ্যমে বড় বস্তু বা জনতাকে নাড়ানো/পরিবর্তন করা যায়/হয়। এর অন্তর্গত:

          (ক) পৃথিবী/গ্রহ নাড়ানো।

          (খ) বৃক্ষ/উদ্ভিদ নাড়ানো।

          (গ) নিজেকে শূণ্যে ভাসানো এবং উড়িয়ে নিয়ে অন্যত্র গমন।

(২)   ক্ষুদ্র/মাইক্রো-সঞ্চালন (Micro-telekinesis) যার মাধ্যমে পরমাণু (atoms), অণু (molecules) এবং কণিকা (particles) নাড়ানো যায়/হয়। এর অন্তর্গত:

         (ক) ক্রায়োকাইনেসিস (Cryokinesis) বা তাপমাত্রা কমিয়ে/জমিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা করা।

         (খ) পাইরোকাইনেসিস (pyrokinesis) বা তাপ এবং আলোর বস্তুতে আগুন ধরানোর ক্ষমতা।

         (গ) বাতাস/স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহ এবং ঝড়ো হাওয়া, মেঘমালা এবং বায়বীয় অবস্থা পরিবর্তন করা।

         (ঘ) জল/পানির প্রবাহে পরিবর্তন করা; স্থির জলে ঢেউ এবং ঢেউকে স্থির করা।

সাইকোকাইনেসিস (পিকে) বা টেলিকাইনেসিসকে (টিকে) বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তব বলে মনে করার মতো কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি। পিকে ও টিকের এক্সপেরিমেন্টের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের (variable control)  এবং পুনরাবৃত্তি যোগ্যতার (repeatability) অভাব রয়েছে বলে সমালোচনা করা হয়। কিছূ কিছু ক্ষেত্রে পরিক্ষণ-ব্যক্তির (subject) মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি/অধ্যাস সৃষ্টি করা হয় এবং এ জন্য আগে থেকেই তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত বা বিশ্বাসী করা হয়। মনো-সঞ্চালন শক্তি বা ক্ষমতার (Psychokinesis)  উপায় বিজ্ঞানের এখনো অজানা ।

সংক্ষেপে, এই হচ্ছে মোটামুটি আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার গবেষণার ব্যাপ্তি। উল্লেখ্য যে, প্যারাসাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন-এর মতে, আধ্যাত্মিক মনোবিদরা জ্যোতিষশাস্ত্র, অচেনা উড়ন্ত বস্তু (UFOs), বৃহদাকার লোমশ উল্লুক (Bigfoot), পৌত্তলিকতা (paganism), রক্তচোষা বাদুর (Vampire), কিমিতি/রসায়ন (alchemy) বা জাদুবিদ্যা (witchcraft) ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন না ।

ব্যতিক্রমধর্মী মনস্তত্ত্বাত্তিক প্রবণতা

বেশ কয়েকটি জরীপের সামগ্রিক পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে যে, বহুলোক এমন কিছু অভিজ্ঞতার বিবরণ দেয়, যাকে বলা যায় মনালাপন বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগ, ভবিষ্যদ্বাণী এবং অনুরূপ আরো অতীন্দ্রিক ঘটনাবলী। এসব ঘটনার সাথে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বিশ্বাসের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে সম্মোহন, নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন  এবং মনের সচেতন স্তরকে পরিবর্তন করার প্রবণতা বেশী। যারা খোলামেলা স্বভাবের, খ্যাপাটে এবং বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের, তাদের মধ্যে এটা দেখা যায় না। তবে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত মনোরোগ (সাইকোটিক), নিঃসঙ্গপ্রিয়তা (ডিসোসিয়েটিভ) সহ অন্যান্য তীব্র মানসিক রোগীদের মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা প্রবল দেখা যায়।  তবে, আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় যারা বিশ্বাসী সাধারণত তারা স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন হয় এবং তাদের মধ্যে  মানসিক অস্থিরতাজনিত ব্যাধি তেমন দেখা যায় না।

মানুষের মাঝে কোনো অতিপ্রাকৃত বা অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অস্তিত্ব আছে কি নেই, এই বিতর্কের সমাধান আজো হয়নি। কেউ বিশ্বাস করেন প্রবলভাবে, কারো কাছে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুয়া। বিজ্ঞানও কিন্তু এখন পর্যন্ত উড়িয়ে দিতে পারছে না সত্য হবার সম্ভাবনাকে, কেননা ভুরি ভুরি ঘটনা আছে যার ব্যাখ্যা বিজ্ঞান এখনও দিতে পারেনি। তবে সেই সাথে এও সত্যি যে আমাদের চেতন মনের চেয়ে অবচেতন মনটা অনেক বেশী শক্তিশালী। আর এই অবচেতন মন প্রায়ই আমাদেরকে নিয়ে এমন সব খেলা খেলে থাকে যে তাকে অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা ভাবা যেতেই পারে!

মেকি/ভুয়া বিজ্ঞান (psuedoscience)

পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ম্যারিও বান্জ (Mario Bunge) এর মতে, আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক মনোবিদ্যা একটি মেকি বিজ্ঞান। কারণ:

*         এটি অস্তিত্বের স্বরূপকে (ontology) সঠিকরূপে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনা এবং নির্ভুল চিন্তা থেকে দূরে এর অবস্থান।

*         এর তাত্ত্বিক অনুমান (hypothesis) প্রমাণ সাপেক্ষ নয়।

*         সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানের মতো তেমন অগ্রসর হয়নি।

*         গবেষণা করার মতো তত্ত্ব (theory) আজও দাঁড় করাতে পারেনি।

*         বিজ্ঞানের পদ্ধতি (experimental method) প্রয়োগ/ব্যবহারের প্রচেষ্টা থাকলেও বিষয়বস্তু অবৈজ্ঞানিক এবং তাত্ত্বিক ভিত্তি খুবই দুর্বল।

*         আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা গবেষণা বহির্ভূত এক বিশাল এলাকা।

তবে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী, মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ ও লেখক কার্ল সাগান মন্তব্য করেছেন যে, আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার গবেষণার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি দাবী সত্য হতে পারে এবং এ নিয়ে গবেষণাও হতে পারে।

ক। চিন্তার দিক থেকে মানুষ একাই শুধু কম্পিউটারের মধ্যে এলোমেলো (Random) সংখ্যাকে প্রভাবিত/পরিবর্তন করতে পারে।

খ। কোন লোককে সাময়িকভাবে হালকা স্নায়বিক বঞ্চনায় রাখা হলে যে/যারা রাখে তার চাহিদা মতো চিন্তা ও কল্পনা করে থাকে।

গ। ছোট শিশুরা কখনো সখনো তাদের পূর্ব জন্মের জীবন নিয়ে গল্প করে, যা পূণপরীক্ষা করা হলে সত্যতা পাওয়া যায়, যা পূণর্জন্ম ছাড়া যে অন্য কোন কিছু তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শেষ কথা

জ্ঞান জগতে শেষ কথা বলতে আসলে কিছু নেই। এ এক অনন্ত পথ চলা। এ চলাই মানব বিবর্তন ও ক্রমবিকাশের/ ক্রমোন্নতির ধর্ম। এখানে শেষ কথা বলতে এই ক্ষুদ্র গবেষণা পত্রটির দুরূহ সিদ্ধান্ত টানার একটি প্রচষ্টাকে বুঝিয়েছি।

আধ্যাত্মিকতা বা অতীন্দ্রিয়বাদ একটি ভাববাদী দার্শনিক তত্ত্ব। এর সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক নিবিঢ়। মানব সৃষ্টির আদি থেকে এ পর্যন্ত ব্যক্তি-মানব এবং মানব-সমাজের যে বিবর্তন ও ক্রমোন্নতি ঘটেছে তাতে ভাববাদের অবদান অনস্বীকার্য। অন্যদিকে বস্তুবাদ ও বিজ্ঞান যথাক্রমে যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ভর তত্ত্ব। সেখানে বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। বস্তুবাদ ও বিজ্ঞান ব্যক্তি-মানব এবং মানব-সমাজে বিপ্লবী পরিবর্তন/রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভাববাদ ও বস্তুবাদ এবং বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব বৈরী এবং বিপরীতমুখী। কেউ কারো তোয়াক্কা করেনা। অথচ ভাবজগৎ, বস্তুজগৎ ও বিজ্ঞানের পথ-নির্দেশক। কল্পনার জগৎ থেকেই মানুষ মহাকাশ, মহাসাগর ও দূর্গমকে জয় করার সাহস পেয়েছে।

আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যার অবস্থান এ দু’টির মাঝখানে। এটি ভাববাদী (আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিক) ধারণাগুলোর অস্তিত্বের সত্যতা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ণয়ে ব্রতী। বেশীর্ভাগ ক্ষেত্রে সাফল্য এখনও আসেনি। উপরের আলোচনায় অন্ততঃ তাই প্রমাণিত হয়েছে। তবে দু’এক ক্ষেত্রে এর সত্যতা কিঞ্চিৎ হলেও মিলেছে। যেহেতু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সংজ্ঞা বা পরীক্ষার বাইরে তাই পদার্থ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসা মনেবিজ্ঞান এবং মনঃচিকিৎসা বিজ্ঞান এ সত্য স্বীকার করতে নারাজ। তাই আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যাকে বলা হয় মেকি/ভুয়া বিজ্ঞান। কিন্তু তারপরও আধ্যাত্মিক মনোবিদরা হাল ছাড়েননি, দৃঢ়ভাবে তাদের গবেষণা কর্ম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৬৯ সনের আগে মানুষের চাঁদে গমন এক অবিশ্বাস্য কল্পনা ছিল কিন্তু এখন আর নয়।এমন বাস্তবতা এক্ষেত্রেও যে হবে না তা কে বলতে পারে।

আমরা, সাধারণ মানুষ ভাববাদী ও বস্তুবাদী দর্শন, ধর্ম ও বিজ্ঞান, বিশ্বাস ও পরীক্ষণ নির্ভর সত্যতার দ্বন্দ্বের মাঝখানে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো দুলছি। ঝগড়া-বিবাদ করছি। সংঘাত-যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। পশ্চিম-পূর্ব, ধনী-দরিদ্র, প্রভূ-ভৃত্য, শোষক-শোষিত, সভ্য-বর্বর, সাদা-কাল, আশরাফ-আতরাফ, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, উচ্চ-নীচ ইত্যাদিতে বিভক্ত হয়ে আছি। কিন্তু আসলে তো আমরা একটাই মানব জাতি।

এই নেতিবাচক দিকের পাশাপাশি এটাও সত্য যে মানবজাতি বিবর্তন বা সংস্কার এবং বিপ্লব উভয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এগুচ্ছে।

আমরা পৃথিবীর বাইরে গ্রহ, নক্ষত্র ও মহাবিশ্বকে জানার ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছি, এটা যেমন সত্য তেমনি তার বিপরীতে এটাও সত্য যে, মানুষ তার নিজেকে এবং একজন আরেকজনকে কতদূর জানার চেষ্টা করেছি বা জানতে পেরেছি, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। ভাববাদ ও বস্তুবাদ দুটোই মানুষের চিন্তার হাতিয়ার। মানুষ যদি নিজেকে সঠিকভাবে জানতে পারে / আবিষ্কার করতে পারে এবং পাশাপাশি অন্যকেও, তবে সম্ভবত এই সংঘাতময় বৈরী দ্বন্দ্বের নিরসন করে অবৈরি বা মিলনাত্মক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। যদি এমনটা করা যায় বা হয় তবে মানুষের সামগ্রিক উন্নতির ক্ষেত্রে বিবর্তনের চেয়ে বিপ্লবী পরিবর্তনই ঘটবে বেশী।

তাই শেষ কথা হিসেবে সক্রেটিসের উক্তিটি পূর্ণব্যক্ত করতে হয়,‘নিজেকে জানো’(know thyself)। আর নিজেকে জানতে হলে একটাই উপায় – জ্ঞান চর্চা করতে হবে নিরন্তর! ‘অধ্যয়নং তপঃ’।

 

বি.দ্র.  যতদূর জানি আধ্যাত্মিক মনোবিদ্যা (Parapsychology)এর ওপর বাংলাভাষায় একাডেমিক বা গবেষণাভিত্তিক লেখা এটি-ই প্রথম ।

 

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: