ইউনিয়ন পরিষদ গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ প্রসঙ্গে | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

ইউনিয়ন পরিষদ গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ প্রসঙ্গে

6 July 2014, 2:21:02

 স্কো. লি. আহসান উল্লাহ (অব.)

১. ভূমিকা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩য় পরিচ্ছেদের ৫৯ ও ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদ দুটিতে বর্ণিত স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি)। তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার এটিই প্রাথমিক স্তর। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্য অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে- উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ১,৩৬,৯৫৩ বর্গ কিলোমিটার গ্রাম এলাকা। সর্বমোট প্রায় পাঁচ হাজার ইউনিয়নের অধীনে ৮৭৩৬২টি গ্রাম বিদ্যমান। এসব গ্রামে প্রায় ১০ কোটি লোক বাস করে । বাকি মাত্র ১০,৬১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর-নগর,  বাস করে ৫ কোটি মাত্র । সার্বিক বিবেচনায় তাই ইউনিয়ন পরিষদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। তাই গোড়া থেকে এর বিবর্তনটা জানা দরকার ।

২. ইউনিয়ন পরিষদের ক্রমবিবর্তন

২.১ প্রাক-ব্রিটিশ আমল : বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে স্থানীয় সরকারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দে গ্রাম পরিষদ নামে ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্রের আভাস পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্যে সভা মহাসভা নামে গ্রাম পরিষদের উল্লেখ আছে। এছাড়া মৌর্য (খ্রি.পূ. ৩২৪-১৮৩) বা তারও আগে গ্রাম প্রশাসনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বলা হয়ে থাকে, ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলাদেশের গ্রামগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। গ্রামে পঞ্চায়েত প্রথা প্রচলিত ছিল। পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা থাকতো পাঁচজন। গণমান্য বয়স্ক ব্যক্তিদের দিয়ে পঞ্চায়েত গঠিত হতো। সামাজিক বিষয়াদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া, বিচার কার্য সম্পাদন ও গ্রামে শান্তি-শৃঙখলা বজায় রাখা ছিল তাঁদের দায়িত্ব। দায়িত্ব প্রতিপালনের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত নিজেরাই সম্পদ আহরণ করতো। জনগণের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক প্রয়োজনে স্বাভাবিকভাবেই পঞ্চায়েত প্রথার উদ্ভব ঘটে। এই পঞ্চায়েত বা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার যুগ যুগ ধরে অর্থাৎ গুপ্ত, পাল, সুলতানী ও মোগল আমলে (খ্রি.পূ. ৩২০ থেকে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছে কোনরূপ আইনগত ভিত্তি ছাড়াই।

২.২ ব্রিটিশ রাজত্বকাল (১৭৫৭-১৯৪৭)

২.২.১ চৌকিদারি পঞ্চায়েত ও ইউনিয়ন কমিটি : ব্রিটিশ রাজত্বকালে গ্রামাঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনের আর্থিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে ১৭৯৩ থেকে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৫টি কমিটি বা কমিশন এবং ৮টি স্থানীয় সরকার আইন ও বিধি করা হয়েছে। তবে ১৮৭০ সালে গ্রাম চৌকিদারি আইন পাস হওয়ার ফলে সর্বপ্রথম গ্রামাঞ্চলে আইনগতভাবে স্থানীয় সরকার শুরু হয়। এ আইনের অধীনে গ্রামগুলোকে ইউনিয়নের অধিভূক্ত করা হয়। প্রতি ইউনিয়নের গড় আয়তন ছিল ১০-১২ বর্গমাইল। প্রতি ইউনিয়নে ৫ সদস্যবিশিষ্ট চৌকিদারি পঞ্চায়েত গঠন করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পঞ্চায়েত সদস্যদের ৩ বছরের জন্য নিয়োগ দিতেন। পঞ্চায়েতের দায়িত্ব ছিল শান্তি-শৃংখলা রক্ষা এবং রাজস্ব/খাজনা আদায়ে প্রশাসনকে সহায়তা করা। জনকল্যাণমূলক কাজের দায়িত্ব তাদের ছিল না। এ আইন পরিবর্তন করে ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন প্রবর্তন করা হয়। এ আইনের পাশাপাশি ইউনিয়ন কমিটি, মহকুমার লোকাল বোর্ড এবং জেলা পর্যায়ে জেলা বোর্ড গঠন করা হয়। ইউনিয়ন কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৫ থেকে ৯ জন। সদস্যগণ গ্রামবাসী কর্তৃক নির্বাচিত হতেন। কমিটি রাস্তা তৈরি, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা তত্ত্বাবধান করত। তহবিল গঠন করার ক্ষমতা কমিটির থাকলেও মূলত জেলা বোর্ডের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে ইউনিয়ন কমিটি জেলা বোর্ডের প্রতিনিধি তথা দালাল হিসেবে কাজ করতো।

২.২.২. ইউনিয়ন বোর্ড : আর্থিক দুর্বলতা এবং ইউনিয়ন কমিটি ও চৌকিদারি পঞ্চায়েতের দ্বৈতশাসনের অসুবিধা প্রকটভাবে দেখা দেয়ার ফলে ১৯১৯ সালে বঙ্গীয় পল্লী স্বায়ত্তশাসন আইনের অধীনে পঞ্চায়েত ও ইউনিয়ন কমিটি বিলুপ্ত করে ইউনিয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। মোট সদস্যদের এক-তৃতীয়াংশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক মনোনয়ন দিতেন এবং বাকি সদস্যগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। নির্বাচিত সদস্যগণ তাদের মধ্য থেকে একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতেন। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রধান কাজ ছিল নিরাপত্তা বিধান, রাস্তা ও পুল/কালভার্ট তৈরি, স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান, দাতব্য চিকিৎসালয় ও স্কুল সংরক্ষণ, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা এবং জেলা বোর্ডকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সরবরাহ করা। ইউনিয়ন বোর্ডকে ইউনিয়ন কর আরোপ এবং ছোটখাটো ফৌজদারি অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেয়া হয়। এর মেয়াদ প্রথমে ছিল তিন বছর, ১৯৩৬ সাল থেকে ৪ বছর করা হয় এবং ১৯৪৬ সালে মনোনয়ন প্রথা রদ করা হয়। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রধান সমস্যা ছিল জেলা পরিষদের ওপর আর্থিক নির্ভরতা।

২.৩ পাকিস্তানি আমল (১৯৪৭-’৭১) : ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা/বঙ্গ পাকিস্তানভুক্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত এখানকার স্থানীয় প্রশাসন ব্রিটিশ আমলের অনুরূপ ছিল। পাকিস্তানী শাসনকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার একটি এক সদস্য বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার পুনর্গঠন কমিটি গঠন করে। ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ জারি করে। ওই আদেশবলে ১৯৬০ থেকে ৬৮ সাল পর্যন্ত মোট বিশটি বিধিমালা জারি করে।

২.৩.১. ইউনিয়ন কাউন্সিল : মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ ১৯৫৯-এর অধীন ইউনিয়ন বোর্ডের নামকরণ করা হয় ইউনিয়ন কাউন্সিল (ইউসি) এবং এর গঠন, কার্যাবলী ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বেশ পরিবর্তন ঘটে। গড়ে দশ হাজার লোক বসবাসকারী এলাকা নিয়ে দশ থেকে পনের জন সদস্য সমন্বয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠন করা হয়। ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে আরও কিছু পরিবর্তন করা হয়। ইউনিয়ন কাউন্সিলের কার্যকাল ছিল ৫ বছর। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা ছাড়াও ৩৭টি কার্যাবলী পালনের দায়িত্ব দেয়া হয়। তন্মধ্যে কৃষি উন্নয়ন, পানি সরবরাহ, শিক্ষা, যোগাযোগ, সমাজকল্যাণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সালিশি আদালত গঠনের মাধ্যমে বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা এবং মুসলিম পারিবারিক ও বিবাহ আইনের অধীন মেম্বারদের বিচার করার দায়িত্ব দেয়া হয়। চৌকিদারি ট্যাক্স ও সম্পত্তির ওপর কর নিধারণসহ কিছু কিছু করারোপ ক্ষমতা দেয়া হয়। এছাড়া পল্লীপূর্ত কর্মসূচির অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ইউপি অফিস ভবন বা অন্যান্য কাজের জন্য সরকার থেকে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভাব, চেয়ারম্যান-মেম্বাররা সরকারি দালাল হিসেবে কাজ করায়, আর্থিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির দরুন ইউনিয়ন কাউন্সিলগুলো ঠিকমতো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানি শাসনকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় ছিল নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বারদের রাষ্ট্রপতিসহ কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা গঠনের ক্ষমতা। উল্লেখ্য, তখনকার পাকিস্তানের দুই অংশের মোট ৮০ হাজার নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বার ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ও তার অনুগতদের আইনসভার সদস্য নির্বাচিত করেছিলেন। সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছিল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও তার সরকারের পতনের পর এই প্রথারও বিলুপ্তি ঘটে। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় অনেক বিডি মেম্বার ও চেয়ারম্যান গণপিটুনিরও শিকার হন।

২.৪. স্বাধীন বাংলাদেশে (১৯৭২-)

২.৪.১ মুজিব আমল ও ইউনিয়ন পরিষদ : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ২০০৭ খ্রি. পর্যন্ত মোট ৮টি স্থানীয় সরকার কমিশন বা কমিটি গঠিত হয় এবং ১৬টি আদেশ/অধ্যাদেশ/আইন/বিধিমালা ইত্যাদি জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-৭, ১৯৭২ বলে ইউনিয়ন কাউন্সিল বাতিল করে নাম রাখা হয় ইউনিয়ন পঞ্চায়েত। অনির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয় এবং একজন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরে এ সিদ্ধান্ত বদল করে কমিটি গঠনের ক্ষমতা গণপরিষদের স্থানীয় সদস্যদের ওপর ন্যস্ত করা হয়। সেই থেকে শুরু স্থানীয় সরকারে কেন্দ্রিয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাব সৃষ্টির প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২২, ১৯৭৩ অনুযায়ী আবার নাম বদলে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) রাখা হয়। সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নয়জন সদস্য, একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হতো। তবে ইউপি’র কার্যাবলী ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

২.৪.২. জিয়ার আমল : স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান ও ৯ জন মেম্বার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও দুইজন মহিলা সদস্য ও দুইজন কৃষক প্রতিনিধি সদস্য মনোনয়নের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইউপি’র ওপর ৪০টি কার্যাবলী ন্যস্ত করা হয়। প্রধান কাজগুলো ছিল- জনকল্যাণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব, উন্নয়নমূলক ও বিচার বিভাগীয়। এছাড়া অনির্ধারিত কার্যাবলী ছিল যেমন- জন্ম-মৃত্যু, জাতীয়তা ও চারিত্রিক সনদপত্র প্রদান এবং আদমশুমারিতে সহযোগিতা করা। কিন্তু আর্থিক ব্যবস্থাপনা মৌলিক গণতন্ত্র আইনের অনুরূপই থেকে যায়।

২.৪.৩ এরশাদ আমল : ১৯৮৩ সালে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান, নয়জন সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনে তিনজন মহিলা সদস্য রাখা হয়। ইউপিকে পৌর, রাজস্ব, প্রশাসন, নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক কার্যাদিসহ মোট ১০টি বাধ্যতামূলক ও ৩৮টি ঐচ্ছিক দায়িত্ব দেয়া হয়।

২.৪.৪. স্বনির্ভর গ্রাম সরকার : ১৯৮০ সালে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ১৯৭৬ সংশোধনের মাধ্যমে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে বিধিমালাও জারি করা হয়। গ্রামে গ্রামে সরকারও গঠন করা হয়। স্বনির্ভর গ্রাম সরকারের প্রধান ৪টি কাজ ছিল : অধিক খাদ্য ফলানো, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু এর কোন আর্থিক ক্ষমতা ছিল না। আর্থিক অক্ষমতা ও কর্তৃত্বহীন নেতৃত্বের কারণে সক্রিয় ভূমিকা পালনে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার ব্যর্থ হয় এবং ১৯৮২ সালে বিলুপ্ত হয়। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে গ্রাম সরকার আইন জারি করা হয়। এতে প্রতি ওয়ার্ডের এলাকাভুক্ত মৌজাসমূহ নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের বিধান করা হয়। এই আইনে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও তের জন সদস্যবিশিষ্ট গ্রাম সরকারকে ইউনিয়ন পরিষদের সহায়ক সংগঠন হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রাম সরকারকে মোট ১৬টি কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। ব্যয় নির্বাহের জন্য গ্রাম সরকার তহবিল গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়, যার আয়ের উৎস ইউপি থেকে প্রাপ্ত এবং অন্য কোন উৎস (?) থেকে পাওয়া/সংগৃহীত অর্থ। গ্রাম সরকার গ্রামে গ্রামে গঠন করার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট কর্তৃক ২০০৫ খ্রি. অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০৮ সালে বাতিল করা হয়।

৩. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটির সুপারিশমালা

২০০৭-এ গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রদানের জন্য ৭ সদস্যবিশিষ্ট যে কমিটি গঠন করে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের অনুরূপ অষ্টম কমিটি। সাত সদস্যের মধ্যে ছিলেন একজন প্রাক্তন সচিব, দু’জন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, একজন এনজিও কর্মী, একজন পৌরসভা চেয়ারম্যান, একজন ইউপি চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব। কমিটি পাঁচ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন চার খণ্ডে উপস্থাপন করে। প্রথম খণ্ডে সুপারিশমালার বিস্তারিত বিবরণ এবং দ্বিতীয় খণ্ডে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য প্রযোজ্য অধ্যাদেশের খসড়া রয়েছে। কমিটি প্রতিবেদনের মুখবন্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য রেখেছে, যার সারাংশ নিম্নরূপ-

‘১৯৭২ থেকে আজ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক (মোট ৭টি) কমিশন/কমিটি গঠিত হলেও পরিস্থিতির তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি (কেবল ১৯৮২ সালে প্রণীত সুপারিশের আংশিক বাস্তবায়ন হওয়ার ফলে উপজেলা পদ্ধতির সৃষ্টি হওয়া ছাড়া)। তারপরও নতুন করে কমিটি কেন? কমিটির উত্তরÑ আগের প্রতিবেদনগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তনের অধিক প্রাধান্য ছিল। বর্তমান কমিটি স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার ; স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার; অহেতুক সরকারি নিয়ন্ত্রণের অবসান, সাংসদদের প্রভাবমুক্ত রাখা, আয় বাড়ানো, মহিলাদের অধিকতর ক্ষমতায়ন, কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রার্থীদের অযোগ্যতা ও নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ, আইন ও অধ্যাদেশসমূহ একীভূতকরণ, স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন প্রভৃতি নিয়ে সুপারিশমালা তৈরি করেছেন। এ কাজ করতে গিয়ে কমিটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ এবং আরো অনেক গবেষণাধর্মী প্রকাশন পর্যালোচনা করে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করেছে।’ কমিটির সুপারিশমালার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

৩.১. স্তরবিন্যাস : তিন স্তরবিশিষ্ট নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক স্তরে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি)। অন্য দুটি উপজেলা ও জেলা পরিষদ।

৩.২. নির্বাচন : ৩০০০-৫০০০ জনসংখ্যা নিয়ে ওয়ার্ড এবং ২৭০০০-৪৫০০০ জনসংখ্যা নিয়ে ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি ইউনিয়নে ১৫টি ওয়ার্ড থাকবে এবং নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা হবে ১৫ জন। চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন।

৩.৩. নারী প্রতিনিধিত্ব : সদস্যদের মধ্যে ৪০ শতাংশ আসন নারীদের জন্য তিন টার্মে ঘূর্ণায়মান ভিত্তিতে নির্বাচনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী তিনটি নির্বাচনের পর নির্ধারিত আসন প্রথা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩.৪. প্রতিনিধির যোগ্যতা : একই ব্যক্তি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। প্রার্থীর পেশা, আয়ের উৎস, নিজের এবং নির্ভরশীলদের সম্পদের হিসাব ও দায়দেনার বিবরণ ও অপরাধের (যদি করে থাকেন) ইতিহাস নির্ধারিতকরণের মাধ্যমে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়ের সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করারও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সম্বলিত মোট ৩০টি প্রস্তাব খসড়া অধ্যাদেশে রাখা হয়েছে।

৩.৫ সাংসদ ও স্থানীয় সরকার : সংসদ সদস্যগণ ভবিষ্যতে যাতে আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কাজে নিবিষ্ট হতে পারেন, সে লক্ষ্যে তাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ (ইউপি, উপজেলা, পৌরসভা ইত্যাদি) থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইউনিয়নের উন্নয়নের কাজ ইউপি’র নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও  মেম্বারদের জন্য নির্ধারিত করাই এই সুপারিশের উদ্দেশ্য।

৩.৬. চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দায়বদ্ধতা : প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের জন্য ইউপি’র কাজকর্ম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও অডিট পদ্ধতি শক্তিশালী করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও চেয়ারম্যান, মেম্বার ও স্থানীয় কমিটির সভাপতি/সদস্যগণ পরিষদের নিকট যৌথভাবে দায়বদ্ধ হবেন এবং প্রতি মাসে পরিষদের সভা অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩.৭. আয়ের উৎস ও আয় বাড়ানো : ইউপিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আয়ের উৎস বাড়ানোর জন্য সরকারি অনুদান বাড়ানো, কর আরোপ করার ক্ষমতা ও আদায়ের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আয়ের উৎস আরও সম্প্রসারিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূমি  হস্তান্তর, ভূমি উন্নয়ন, সড়ক ও জনপথ, ফেরি পরিচালনা, বালুঘাট ও পাথরঘাট প্রভৃতি থেকে সংগৃহীত কর ও আয়ের বিদ্যমান অংশের চেয়ে আরও বেশি ইউপিকে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩.৮. সক্ষমতা বাড়ানো : ইউপি তথা নির্বাচিত চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যথাযথ ও অব্যাহতভাবে পরিচালনার জন্য জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটকে (এনআইএলজি) প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল প্রদান, পরিচালনা বোর্ড পুনর্গঠন এবং গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ রাখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩.৯. জনগণের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা : এ লক্ষ্যে ওয়ার্ড সভার প্রস্তাব করা হয়েছে। ওয়ার্ডের প্রত্যেক ভোটার হবে ওয়ার্ড সভার সদস্য। সভা বছরে কমপক্ষে তিনবার অনুষ্ঠিত হবে। সভায় ওয়ার্ডের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচিত হবে, নির্বাচিত সদস্য বার্ষিক প্রতিবেদন অবহিত করবেন, পরিকল্পনা প্রণয়ন, অগ্রাধিকার নির্ণয় এবং সুস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে উপকারভোগী চিহ্নিত করা হবে।

৩.১০. জনসেবা ও তথ্য সরবরাহ : ইউপি জনসেবার লক্ষ্যে প্রতি বছর নাগরিক সনদ প্রকাশ করবে। এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে নির্ভুল ও স্বচ্ছ বিবরণ, মূল্য, যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া, সময়সীমা, নাগরিকদের দায়িত্ব, সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। যে কোন নাগরিক ইউপি সংক্রান্ত যে কোন তথ্য প্রাপ্তি এবং সরবরাহযোগ্য তথ্যের তালিকা প্রকাশের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

৩.১১. জনবল : স্থানীয় পরিষদ চাকরি কাঠামো গঠন, প্রয়োজনভিত্তিক জনবল নিয়োগ নীতি, প্রতি ইউনিয়নে একজন হিসাবরক্ষকের পদ ও কম্পিউটার জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান প্রভৃতি প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩.১২. সরকারি নিয়ন্ত্রণ : ইউপি’র ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। শুধু বেআইনি ও নিয়মবহির্ভূত ক্ষেত্রের স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারকে কারণ দর্শানো সাপেক্ষে নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে সরকারী হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ধারা বিলোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

৩.১৩. আদিবাসীদের আসন সংরক্ষণ : পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য জেলার তথা সমতলে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার প্রয়োজনে ওয়ার্ড নির্ধারণ করতে পারবে মর্মে প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

৩.১৪. গ্রাম আদালত : গ্রাম আদালতের কার্যকারিতা সম্পর্কে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

৩.১৫. গ্রাম প্রতিরক্ষা সার্ভিস : আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরকে বিকেন্দ্রীকরণ করে জেলা ও উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আনসার, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ও গ্রাম পুলিশকে একটি সমন্বিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩.১৬. স্থানীয় সরকার কমিশন : ইউপিসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে গতিশীল, দায়বদ্ধ ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদের তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশন দেওয়ানি আইন ১৯০৮ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪৮০ ও ৪৮২-এর আওতায় কতিপয় ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের ক্ষমতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হবে। কমিশন অধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি, নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অর্থের সঠিক ব্যবহার, ট্যাক্স-ফিস-রেইট-টোল নির্ধারণ, জনবল কাঠামো, উন্নয়ন গবেষণা পরিচালনা ও ফলাফল কার্যকরী প্রভৃতি বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদান করবে। কমিটির নিজস্ব তহবিল থাকবে, যার উৎস হবে সরকারি অনুদান, বিনিয়োগ ইত্যাদি।

৪. পর্যালোচনা

স্থানীয় সরকার প্রশাসনের প্রাথমিক ও সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার সম্পৃক্তির স্তর ইউনিয়ন পরিষদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা এরকমÑ

৪.১ স্থানীয় সরকার ছিল স্বায়ত্তশাসিত: এদেশে স্থানীয় সরকার তথা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রথা সামাজিক প্রয়োজনে স্বাভাবিকভাবেই জনমতের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। এবং তা খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিন হাজার বছর, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছে। তখন ভারত বর্ষের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের গ্রামগুলো মূলত স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন ছিল।

৪.২ ব্রিটিশরা বানায় শোষণের হাতিয়ার: ব্রিটিশ রাজকীয় শাসনের ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্য নিয়ে স্থানীয় শাসনের ওপর গ্রাম চৌকিদারি আইন চাপিয়ে দিয়ে কর আদায় ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ঔপনিবেশিক শোষণকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তার ঘটানো হয়। ব্রিটিশ শাসকরা কেবল শোষণ করেনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনকল্যাণমূলক সংস্কার ও আধুনিকায়নও করেছে। তবে সবকিছুই আরোপিত ছিল। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

৪.৩ ইউনিয়নগুলো কর্তৃপক্ষেরদালালি করতে বাধ্য হতো : ইউনিয়ন কমিটি বা বোর্ডগুলো জেলা বোর্ডের আর্থিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল বিধায় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েও ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের দালালি করতে বাধ্য হতো। এর ফলে কল্যাণ লাভের পরিবর্তে নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হতো জনগণ।

৪.৫ পাকিস্তানি আমলে কেবল নাম পাল্টায় আর কিছুই হয়নি : পাকিস্তানি আমলে নাম পাল্টে ইউনিয়ন কাউন্সিল করা হয়। কাউন্সিলকে অধিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়া হয়। সরকারি খরচে অফিস ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়। বাস্তবে সরকারি কর্মকর্তাদের আধিপত্যে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দ্বারা সরকারের দালাল হিসেবে কাজ করায়। ফলে, দালালি, আর্থিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির জন্য ইউপিগুলো ঠিকমতো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়।

৪.৬ বাংলাদেশ আমলেও হয় দলীয় রাজনীতির শোষণের শিকার : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত নাম বদল হয়েছে দু’বার। বর্তমান পরিচয় ইউনিয়ন পরিষদ। ৩৬ বছরে কমিটি বা কমিশন করা হয় ৮ বার। আইন ও বিধি বদল হয় ১৬ বার। কিন্তু কার্যাবলী ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হয়নি। কর্তৃত্বহীন দায়িত্বভার আরোপিত হয় বারবার। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার কোন মূল্যায়ন কেউ করেনি। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণ ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শোষণের পর স্বাধীন দেশে দলীয় শোষণের শিকারে পরিণত হয়েছে। সমাজতন্ত্রের নামে, গণতন্ত্রের নামে, নতুন বাংলাদেশের নামে অনেক পরিবর্তনই দেখা গেছে কিন্তু যা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে, তা হচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।

৪.৭ গ্রামের মানুষ নতুনত্ব চায় : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক অষ্টম কমিটির ২৭৬ পৃষ্ঠার সুপারিশমালা তুলনামূলকভাবে পূর্ণাঙ্গ বলে প্রতীয়মান হয়। এই কমিটির ভাষায় আগের কমিটিগুলো কাঠামোগত পরিবর্তনের আধিক্যের/প্রাধান্যের পরিবর্তে তারা মোটামুটি সার্বিক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, যা বাস্তবায়িত হলে গ্রামের মানুষ নতুনত্বের স্বাদ পাবেন বলে আশা করা যায়।

৫. মতামত

সব দিক পর্যালোচনাপূর্বক বাংলাদেশের ৪৪৯৮টি ইউনিয়ন পরিষদের ৭১৯৬৮ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি (প্রতি ইউনিয়নে ১৬ জন হিসেবে), কর্তৃক গ্রাম-বাংলার ১০ কোটির অধিক সাধারণ মানুষের জীবনে ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা বিধানের প্রয়োজনে নিম্নোক্ত প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে :

৫.১। ওয়ার্ডের পরিবর্তে গ্রাম হোক স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ইউনিট : কমিটি প্রস্তাব করেছে, ‘তিন  থেকে পাঁচ হাজার জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত হবে ওয়ার্ড এবং ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে হবে ইউনিয়ন’। বৃটিশদের দ্বারা আরোপিত ওয়ার্ড শব্দটি বিমূর্ত। বিস্তীর্ণ বাংলার মানুষের প্রিয় শব্দ গ্রাম। ভূমি জরিপের পরিভাষায় মৌজা। তাই ১৫টি ওয়ার্ডের পরিবর্তে ১৫টি গ্রাম বা মৌজা নিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠিত হতে পারে। প্রতি গ্রামে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০০০ ধরা যেতে পারে। এর চেয়ে বড় গ্রাম হলে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে গ্রামটিকে দুই বা ততোধিক পাড়ায় বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রতি ইউনিয়ন পরিষদে জনগণের সরাসরি ভোটে ১ জন চেয়ারম্যান ও ১৫ জন নির্বাচিত সদস্য থাকবেন। এতে জনগণের অংশগ্রহণ স্বতস্ফুর্ত সহজ ও আন্তরিক হবে বলে আমার বিশ্বাস।

৫.২। নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক পেশাজীবীদের জন্য সংরক্ষিত আসন : কমিটি ৪০% নারী ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব করেছে। তার কারণ, সম্ভবত অনগ্রসর মানুষকে সামনে এগুবার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে দেশকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একই কারণে কৃষি শ্রমিক, বর্গাচাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জেলে, তাঁতি, বেদে ইত্যাদি আদি পেশায় নিয়োজিত পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর প্রান্তিক সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষা ও উন্নয়নে অংশগ্রহণের প্রয়োজনে তাদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

৫.৩। গ্রাম উপদেষ্টা পরিষদ গঠন : ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বারকে সদস্য সচিব করে গ্রাম উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যায়। এই পরিষদে উক্ত গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ যেমন: মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, কাজী, সেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি, পাড়ার সরদার, কৃষি শ্রমিক, বর্গাচাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মহিলা প্রতিনিধি প্রমুখদের নেয়া যায়। এই পরিষদের অন্তর্ভূক্ত সদস্যগণ নির্বাচিত মেম্বার ছাড়া যে কাউকে সভাপতি নির্বাচিত করবেন। গ্রাম উপদেষ্টা পরিষদের কাজ হবে আইন শৃঙ্খলা বজায়, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়, রাস্তা-ঘাট সংস্কার, জল নিস্কাশন, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথা নিবারণ প্রভৃতি কাজে সহযোগিতা করা। এছাড়া, ইউনিয়ন পরিষদের কর্ম ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রামের সমস্যাবলী অন্তর্ভূক্তকরণে উদ্যোগ নেয়া এবং পরিকল্পনা মোতাবেক কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়ন অনুসরণ করা ও ত্রটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে গতিশীল রাখতে সাহায্য করা।

৫.৪। প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা উচিত : ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠির মধ্যে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা বাঞ্ছনীয়। তাঁদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ইউনিয়নের সচিব এবং প্রস্তাবিত হিসাবরক্ষক পদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার চেয়ে যেন কম না হয়। ইউপিকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হলে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে বিবেচনা করা একান্ত জরুরি। কারণ শিক্ষিত লোক চোর-বাটপার-টাউট-সন্ত্রাসী হবার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসী, সৎসাহসী ও দৃঢ়চেতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী ছেলেমেয়েরা যাতে স্থানীয় সরকারে নেতৃত্বে দেয়ার জন্য অনুপ্রেরণা ও সুযোগ পায়, তারও ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। স্থানীয় শিক্ষিত মেধাবী লোকজন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি হিসেবে এলে এবং তার সঙ্গে আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিকভাবে গতিশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও চাকুরীর পেছনে না ঘুরে জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রতি ঝুঁকবে।

৫.৫। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আর্থিক সম্মানী সম্মানজনক হওয়া উচিত : ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের আর্থিক সম্মানীর পরিমাণ সত্যিকার অর্থেই সম্মানজনক হওয়া প্রয়োজন। এতে তারা ব্যক্তিগত জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য কোন উপায়ের দিকে না ঝুঁকে স্বাচ্ছন্দ্যে জনসেবার দিকে মনোনিবেশ করতে পারবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক সম্মানীর পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, আগের চেয়ে ভালো তবে এখনও সম্মানজনক নয়।

৫.৬। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চাই : প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে এবং পূর্বের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্দেশিকায় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের যে নির্বাহী ক্ষমতা, বিচারিক ক্ষমতা, আর্থিক ক্ষমতা ও সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য আরোপ করা হয়েছে, সে তুলনায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আলোকে তেমন উল্লেখযোগ্য মর্যাদা দেয়া হয়নি। বিচারক ক্ষমতা সম্পাদন করার জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাপ্রাপ্ত হন চেয়ারম্যান কিন্তু মেম্বারগণ তেমন উল্লেখযোগ্য মর্যাদা পান না। বর্তমানে বাংলাদেশের ৮৭৩৬২ গ্রামে বসবাসকারী ১০ কোটি মানুষের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিগণ মর্যাদাহীন। এটা ন্যায্য ব্যবস্থা নয়। বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয়, গ্রামের মানুষগুলো এবং তাদের নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিগণ স্বাধীন দেশে আজও তথাকথিত নেটিভ এবং অবহেলিত। এ মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণের প্রয়োজনেই রাষ্ট্রীয় ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন।

৫.৭। দুর্নাম ঘোচাতে হবে : বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থানুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর করের অংশ, হাটবাজার ইজারা ও ইউনিয়ন পরিষদ সহায়তা তহবিল থেকে বরাদ্দ মিলে ৯/১০ লক্ষ টাকা ব্যয়ের ক্ষমতা ইউনিয়ন পরিষদের হাতে দেয়া হয়ে থাকে। পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিব যৌথ স্বাক্ষরে ব্যাংকে এই তহবিল পরিচালনা করেন। উক্ত অর্থ গৃহীত প্রকল্পের বিপরীতে ব্যয়ের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ব্যয়ের স্বচ্ছতা না থাকায় অসাধু সরকারি আমলাদের সহায়তায় ইউপি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ লুটপাটের ঘটনাই বেশি ঘটে বলে ব্যাপক দুর্নাম(?) রয়েছে। এই অব্যবস্থা প্রতিরোধকল্পে অভিজ্ঞজনদের মতামত হচ্ছে, (১) ট্যাক্স ও অনুদানের অর্থ বাজেট গ্রহণের সময় জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে; (২) এলাকার রাস্তাঘাট, পুল বা সেতু-কালভার্ট ইত্যাদি সংস্কারের চাহিদা প্রস্তাব জনগণ থেকে সরাসরি নিতে হবে এবং (৩) ট্যাক্স দেবো, উন্নয়নেও শরিক থাকবো- এ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

৫.৮। ইউনিয়ন পরিষদ হোক গ্রামের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু : ইউনিয়নের উন্নয়ন, বিচার, প্রশাসন, কারিগরি, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, শিক্ষা, পরিসংখ্যান, আইন-শৃঙ্খলা, রাস্তাঘাট, খেলাধুলা, যোগাযোগ, বিদ্যুতায়ন, অনাময় ব্যবস্থা (ঝধহরঃধঃরড়হ), পানীয় জল, সাধারণ ও বিশেষ চিকিৎসা, শিশুসদন বা এতিমখানা, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, হাটবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি, বাৎসরিক বাজেট, স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যসূচি প্রণয়ন ও গ্রহণ, কৃষি, সার, খামার, বয়স্ক ও বেকার ভাতা, আপৎকালীন সহায়তাদান, ন্যায্য সুযোগের ভিত্তিতে সব মানুষের সব ধরনের ক্ষমতায়ন, সমবায়-ক্লাব-সমিতি, গণপাঠাগার, পরিকল্পিত আবাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা-জলাবদ্ধতা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, মহামারী, প্রতিবন্ধী, মেলা-উৎসব, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশে কর্মসংস্থান, নিজস্ব আয়বর্ধক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সামাজিক, ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতি, বৃক্ষায়ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ, কর নির্ধারণ ও সংগ্রহকরণ ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনা, যুক্তিতর্ক, গবেষণা, সমাধানমূলক উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন, বিধি-প্রবিধি-নীতিমালা প্রণয়ন করার ক্ষমতা প্রতিটি ইউনিয়নের থাকবে। এককথায় ইউনিয়ন পরিষদ হবে গ্রাম ও ইউনিয়ন বিষয়ক সকল কর্মকাণ্ডের বৃদ্ধিবৃত্তিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রবিন্দু।

৫.৯। ইউপি হোক দল নিরপেক্ষ সংগঠন : আইন বিধি নির্দেশনা সুপারিশমালা লিখিতভাবে যত স্বচ্ছ-সুন্দর ও যুগোপযোগীই হোক না কেন, তা যদি কার্যকর না হয় বা যে যখন ক্ষমতায় আসে, সে-ই যদি তার ইচ্ছেমতো কেবল নিয়ম বদলায়, তার কোন মূল্য নেই বা থাকে না। তাই আইনগতভাবে স্থানীয় সরকার তথা ইউপি দলীয় রাজনীতি-নিরপেক্ষ সংগঠন হওয়া উচিত। দলীয় লোকজন ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতাসীন হলেও উন্নয়নের নীতিমালা ও কার্যক্রম যেন সুনির্দিষ্টকালব্যাপী অপরিবর্তনীয় থাকে।

৫.১০। সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন : বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় পরিচ্ছেদের ‘স্থানীয় শাসন’ এর পরিবর্তে ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান’ এবং ৫৯নং অনুচ্ছেদে স্বশাসিত স্থানীয় সরকারের হাতে ক্ষমতার নিম্নাভিমুখী পরিবর্তনের পক্ষে নির্দেশনামূলক বিবরণ পরিবর্তন করে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এজন্য রাজনীতিবিদদের, বিশেষ করে নির্বাচিত এম.পিদের সচেতন সহযোগিতা প্রয়োজন।

৬. শেষকথা

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা যদি পনের কোটি হয়, তন্মধ্যে দশ কোটি মানুষ ইউনিয়ন পরিষদের আওতায়  কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী থাকে। ফলে, ক্ষমতা ও প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের অভাবে রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে এই দশ কোটি মানুষের আন্তরিক সম্পর্ক আজও গড়ে ওঠেনি। নিজেদের সম্পর্কে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এরা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলতে চাই, আমাদের লক্ষ্য হোক, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী হবে। বাংলাদেশকে মাত্র পাঁচ কোটি মানুষের শহর-নগরে আবদ্ধ না রেখে বাকি ১০ কোটি গ্রামের মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে দেয়া হোক। কেবল রাজধানী নয়, বিভাগীয় বা জেলা শহর নয়, প্রতিটি গ্রামই হোক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু। গ্রামের প্রতিটি মানুষকে ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ দেয়া হোক যে তিনিও এদেশের মালিক এবং দেশ চালাতে সক্ষম। তবেই একটি সত্যিকার স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ পাব। এই আশায় বুক বেঁধে রইলাম।

 

তথ্যসূত্র :

১। একে শামসুল হক ও অন্যান্য সম্পাদিত ইউনিয়ন পরিষদ প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল, জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট, ঢাকা-২০০৩ ইং।

২। ড. এএমএম শওকত আলী ও অন্যান্য; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি প্রতিবেদন, নভেম্বর ২০০৭; জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট (এনআইএলজি) ঢাকা।

৩। এমএ গোফরান, (প্রাঃএমপি) প্রকাশিত; বাংলাদেশ প্রাক্তন জাতীয় সংসদ সদস্য পরিষদের প্রচারপত্র, জানু ২০০৮।

৪। আবু তালেব; গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন সরকারের রূপরেখা)।

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: