ইসলামে যাকাত ফরজ | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

ইসলামে যাকাত ফরজ

9 July 2014, 3:36:29

মিজানুর রহমান ফিরোজ:
সমস্ত তারীফ ও প্রশাংসা একমাত্র মহান আল্লাহ্র জন্য। দরুদ ও সালাম রাসুলে করিম (স:) এর জন্য তাঁর বংশ-পরিবার সঙ্গী-সাথী ও তাঁর নিকট থেকে প্রাপ্ত হিদায়তের অনুসরণকারীদের প্রতি দ্বীন ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত। যেমন-কুরআন মজীদে বলা হয়েছে-যদি লোকেরা তওবা করে , নামায কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই হবে। তাই ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ এই কারণে যাকাতের আইন ও বিধি ব্যবস্থা এবং তত্ত্ব ও তথ্যের উপর পরির্পূণ বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য সহকারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যাকাত হচ্ছে ‘বরকত’ পরিমানে বৃদ্ধি পাওয়া, প্রবৃদ্ধি লাভ, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা শুদ্ধতা- সুসংবদ্ধতা। ক্রমবৃদ্ধি ও পবিত্রতা কেবল ধন-সম্পদের মধ্যে সাধিত হয় না। যাকাত দানকারীর মন- মানসিকতা ও ধ্যান-ধারণা পর্যন্ত তা সংক্রমিত হয়।তাই বলা যায়,সব ধর্ম ব্যবস্থায়ই গরীব ও দুর্বল অক্ষমদের প্রতি লক্ষ্য আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম মক্কী স্তর থেকেই এ ব্যাপারে খুব বেশী গুরুত্বসহকারে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। আর মদীনা শরীফে সুনিদিষ্ট ভাবে যাকাতের বিধান কার্যকর হয় এবং তার সাহায্যে সমাজের দরিদ্রদের অভাব পূরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ইসলামের  এই ব্যবস্থা যেমন-অভিনব, তেমনি বিরল, এর পূর্বে কোন ধর্ম বা রাষ্ট্র বিধান এরুপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, তোমার ভাইদের মধ্যে কেউ দরিদ্র হলে, আল্লাহ্ তোমাকে যা দিয়েছে তার প্রতি তোমার মন কঠিন করোনা। তোমার দরিদ্র ভাই থেকে হাত গুটিয়ে নিও না। বরং তার জন্য উম্মুক্ত কর তোমার হস্ত। তাকে যতটা পারো দিয়ে দাও, দেওয়ার সময় মন খারাপ করোনা। কেননা এ কাজের দরুন তোমাকে আল্লাহ্ বরকত দিবেন। কেননা পৃথিবীতে দরিদ্রদের কখন ও হারাবে না, এবং হাত উম্মুক্ত কর তোমার নিজ দেশে।
কুরআন, সুন্নাহ ও  ইজমা ছাড়া নিতান্ত বিবেক- বুদ্ধির বিচারেও যাকাত ফরয প্রমানিত। অবশ্য এ বিবেক- বুদ্ধি ঈমানদার লোকের বেঈমানের নয়। ঈমানদার ব্যক্তিমাত্রই আল্লাহ্র ন্যায় বিচার ও সৃষ্টির প্রতি তাঁর অফুরন্ত রহমতের কথা বিশ্বাস করে। অন্তত তিনটি দিক দিয়ে বিবেচনা করা চলে।
(১) যাকাত দিলে গরীব, মিসকীন, অক্ষমের সাহায্য হয়। তা পেয়ে তারা আল্লাহ্র নেক বান্দার দায়িত্ব পালন করে বেঁচে থাকতে পারে। আল্লাহ্র ধার্যকৃত ফরয আদায় করার যোগ্যতা তাদের হয়।
(২) যাকাত আদায়কারীর মন- অন্তর পবিত্র করে, পাপের গ্লানি ও মলিনতা থেকে পরিচ্ছন্ন করে। তার চরিত্রকে দানশীলতার গুনে বিভুষিত করে। সে কার্পণ্য ও লোভ- লালসা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে। যদি ও মানুষ স্বাভাবগত ভাবেই লোভী ও স্বার্থ পর, যাকাত আদায়ের ফলে তার মধ্যে বদান্যতা ও মহানুভবতা জেগে ওঠে। আমানত সমূহ আদায় করতে অভ্যস্ত হয়। পাওনাদারদের পাওনা ও হকদারদের হক দিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে।
(৩) আল্লাহ্ তা’আলা ধনী লোকদের নিয়ামত দিয়েছেন, নানা ধন সম্পত্তি ও মর্যদায় ভূষিত করেছেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশী ধন- সম্পদ দিয়েছেন।  তা দিয়ে সুখে- সাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করে। এ জন্যে তার শোকর আদায় করা কর্তব্য। যাকাত দিয়ে সে এ শোকর আদায়ের সুযোগ পায় এবং তাদের কাফির হওয়ার কোন সন্দেহ থাকে না।
প্রথমত, কুরআন মজীদ ‘যাকাত’ শব্দটি মুসলিম সমাজে পরিচিত অর্থেই ব্যবহার করেছেন সেই মাক্কী জীবনের প্রাথমিক সময় থেকে, এ পর্যায়ে   সূরা আল- আরাফ এর- ১৫৬ আয়াত, সূরা মরিয়মের ৩১,ও ৫৫ আয়াত, সূরা আল- আম্বিয়ার-৭২ আয়াত,  সূরা আন – নামলের -৩ আয়াত, সূরা আল- মুমিনুনের- ৪ আয়াত, সূরা আর- রুম এর -৩৯ আয়াত, সূরা লুকমানের- ৩ আয়াত, সূরা ফুস্সিলাত এর- ৭ আয়াত দ্রষ্টব্য।
পবিত্র কুরআনে সূরা ফুস্সিলাতে বর্নিত- এ মুশরিকদের জন্যে অভিশাপ বর্ষন করেছেন এবং তাদের প্রধান ও বিশেষ পরিচিতির উল্লেখ করেছেন। সে পরিচিতি হচ্ছে, তারা যাকাত দেয় না এবং পরকাল অবিশ্বাস করে। দু:খ মুশরিকদের জন্যে, যারা যাকাত দেয়না এবং পরকাল অবিশ্বাস করে, স্পষ্ট কথা, নিষ্ঠাবান মু’মিনরা যাকাত দেয়। তারাই পরকালের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়শীল, আর ওরা যাকাত দেয় না ও পরকালের অবিশ্বাসী। মু’মিন ও কাফিরের মধ্যে এটাই বড় পার্থক্য।
নবী করিম (স:) ও সাহাবায়ে কিরাম হতে বর্নিত- বৈধ ও শরীয়াত সম্মত অর্থোপার্জনের বহুবিধ পন্থার মধ্যে ব্যবসা অন্যতম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইয়াতীমের মাল- সম্পদ দ্বারা ব্যবসা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছ্ ে। যেন বার্ষিক যাকাত তাদের মুলধনকে নি:শেষ করে না দেয়।
নবী করিম(স:) স্বয়ং কোন কোন দানা বীজ ও ফল- ফসল যেমন- যব, খেজুর, কিসমিস, মনাক্কা ইত্যাদি থেকে ফিত্রার যাকাত গ্রহণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী আহ্মদ ও তাঁদের সঙ্গীগন সাধারনত বা বেশীর ভাগ খাদ্য হিসাবে গৃহিত জিনিসের উপর ‘কিয়াস’ করেছেন। কৃষি ফসল ও ফল পাকড়ের ক্ষেত্রে ও অনুরুপ ভাবে বেশীর ভাগ ফিকাহ্বিদ অন্যান্য এমন সব দানা বা বীজ সর্ম্পকে কিয়াস করেছেন যে সর্ম্পকে দলীল পাওয়া গেছে এবং তাঁরা কেবল হাদীসে উল্লিখিত – গম, যব, খেজুরও কিসমিসের মধ্যে যাকাতকে সীমাবদ্ধ করে রাখেন নি, হযরত উমর( রা:) ও যাকাত পর্যায়ে কিয়াস প্রয়োগ করেছেন বলে বর্নিত হয়েছে।
শরীয়াতের ভিত্তি  স্থাপিত হয়েছে নিরপেক্ষ সুবিচার ও ন্যায় পরায়নতার উপর। এ দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা তাবেয়ী ইমাম আতা ইবনে বিরাহ্র মতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। তাঁর মত হল ফসল উৎপাদনে যে ব্যয় হয়েছে তা বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট ফসল থেকে যাকাত প্রদান। জমি ভাড়ায় নিয়ে যারা ফসল উৎপাদন করে,তাদেরও উৎপাদন ব্যয় বাদ দেয়ার পরই যাকাতের হিসাব করতে হবে। জমির ভাড়াটাও বাদ পড়বে। ভাড়ার জমির মালিক শুধু দখলের কারণে যে ভাড়া পায় তার উপরও যাকাত ধার্য হবে। তা থেকে ‘ওশর’ কিংবা অর্ধেক ওশর আদায় করা হবে। কেননা সে নিজে চাষাবাদ করলে যা উৎপাদন হত এ ভাড়াটা তারই বিকল্প।
হারাম মালের মালিক শরীয়াতের দৃষ্টিতে ধনী প্রমানিত নয় তা স্তুপাকারে হলেও এবং র্দীঘদিন  ধরে একজনের মালিকানাভুক্ত থাকলেও । ইমাম সারাখ্শীর মতে সে মাল জালিম রাজা বাদশাহ্কেও দিয়ে যেতে পারে। তিনি এদেরকে‘দরিদ্র’ গন্য করেছেন। কেননা তাদের হাতে যে ধন- সম্পদ রয়েছে তা তো মুসলিম জনগনের তাদের নিজেদের নয়। তা যদি ফিরিয়ে দেয়, তাহলে তাদের কাছে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
নবীজি বলেন, আল্লাহ্ যাকে ধন- সম্পদ দিয়েছে, সে দীন, তার সম্পদ থেকে যাকাত আদায় না করে । তাহলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিষধর  অজগর। যার দুই চোখের উপর দুটি কালো চিহ্ন রয়েছে এমন রুপ ধারন করবে। বলবে, আমিই তোমার ধন- সম্পদ আমিই তোমার সঞ্চয়। স্বর্ণ ও রৌপ্যের যে মালিকই তার উপর ধার্য হক আদায় করে দেবে না। কিয়ামতের দিন সে গুলোকে তার পার্শ্বে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দেয়া হবে। পরে তার উপর জাহান্নামের আগুনে তাপ দেয়া হবে সেই উত্তপ্ত  বস্তু দ্বারা তার পার্শ্বে, ললাট ও পৃষ্টে দাগ দেয়া হবে সেই দিন, যার সময়কাল পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান দীর্ঘ। গরু বা ছাগলের মালিক ও যদি তার উপর ধার্য হক আদায় না করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে আসা হবে সে গুলো নিজেদের দু‘ভাগে বিভাক্ত পায়ের খুর দিয়ে মালিককে লাথি মারবে এবং তার শিং দ্বারা তাকে গুঁতোবে যখনই তার উপর অপরটি এসে যাবে, প্রথমটি প্রত্যাহার করা হবে। শেষ পর্যন্ত লোকদের মধ্যে চুড়ান্ত ফয়সালা করা হবে। । পরে তাকে তার পথ দেখানো হবে। হয় জান্নাতের দিকে নতুবা জাহান্নামের দিকে।
শরীয়াতের দৃষ্টিতে কয়েকজন সাহাবী মত প্রকাশ করেছেন। যেমন বলেছেন, স্ত্রীলোকদের ব্যবহার্য অলংকারে যাকাত নেই। কেননা যাকাত প্রবর্তনে শরীয়াতের লক্ষ্য তাঁরা বুঝেছেন ক্রমবৃদ্ধিশীল ধন- সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ অথবা বর্ধন প্রবণতা সম্পন্ন ধন- সম্পদের যাকাত গ্রহন রাসুলে করীম (স:) তাই করেছেন। যেন অতিরিক্ত ও বৃদ্ধি প্রাপ্ত সম্পদ থেকেই সাধারন ভাবে যাকাত গ্রহন করা হয় এবং মূল সম্পদ যেন মালিকের কর্তৃত্বে অবশিষ্ট থেকে যায়। এ দৃষ্টিতে আল্লাহ্ নারীদের জন্যে যে অলংকার ব্যবহার জায়েজ করে দিয়েছেন, তা তো বৃদ্ধিশীল নয়- বৃদ্ধিপ্রবনতা সম্পন্নও নয় বরং তা ক্ষয়িষ্ণু , তা সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধি কারী পোশাক বা ঘরের সরঞ্জাম পর্যায়ের জিনিস।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে , এ কথাটি স্ত্রীলোকদের অলংাকরের উপর কি খাটে? অথচ প্রকৃত পক্ষে তা উর্ধনশীলতার ক্ষেত্রে নয়, বাড়তি বা প্রয়োজনাতিরিক্ত নয় যতক্ষন তা স্বাভাবিক পরিমানের মধ্যে থেকে ব্যবহার হতে থাকবে।
যাকাত সর্ম্পকে আসল কথা হলো, মুসলিম ব্যক্তি তা দেবে সওয়াব পাওয়ার নিয়তের আশায়। সে সওয়াব মহান আল্লাহ্র কাছ থেকেই পাওয়া যাবে, এই দৃঢ় প্রত্যয় পোষন করবে সেই। কেননা সে তো দিয়ে আল্লাহ্র নির্ধারিত হুকুম পালন করছে মাত্র। কাজেই যে যা করবে, সে তার সওয়াব শুভ কর্মফল অবশ্যই পাবে। আল্লাহ্র কাছে তা- ই- তার ইবাদতের চুড়ান্ত প্রতিফল।

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: