টোকাই -মুকুল মজুমদার | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ ◈ অনুকূল পরিবেশ হলে এইচএসসি পরীক্ষা ◈ কুমিল্লায় বিপুল ইয়াবাসহ দম্পতি আটক!

টোকাই -মুকুল মজুমদার

25 November 2016, 10:05:07

কুমিলা ধর্মসাগর পাড় একটি পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটকের আনা-গোনা থাকে। প্রত্যেকের মত আমিও এখানে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসি। অন্য দিনের মত সেদিনও সাগর পাড়ের পশ্চিম পাড়ে বসে গল্প কছিলাম। আমার এক ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে। ঠিক তখনই টোকাই এসে বললো- ভাইজান দুইটা টাকা দেন।
আমি ওরদিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হাত চেপে ধরে বললাম-
তোমার নাম কী?
আমার নাম টেকাই, বললো সে।
কোথায় থাকো?
ধর্মপুর বস্তিতে।
আর কে থাকে?
আমার খালা থাকে।
তোমার বাবা মা কোথায়?
মারা গেছে।
কথাটা বলেই টোকাই আমার হাত থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করল। তার সাথে আমার আরো কিছু কথা আছে বলে আমি তাকে বললাম-
তুমি কি খাবে?
না, কিছু খাব না।
ফুচকা খাবে?
আচ্ছা ঠিক আছে (খুব ছোট করে বললো টোকাই)
আমি তাকে আমার হাত দিয়ে ফুচকা এনে দিলাম। আদর করে পাশে বসালাম। আশেপাশের কিছু লোক বিষয়টা প্রত্যক্ষ করছিল। কয়েকটি মেয়ে দূর থেকে বসে বসে মজা দেখছে। আমার এই টোকাই নামের ছেলেটিকে আদর যতœ করার ভান-ভঙ্গিমা দেখে কেউ কেউ হাসছে। আমি বিষয়টা মাথায় না নিয়ে নিজের কাজ করে চললাম। আমার সাথে থাকা ছোট ভাইকে ইঙ্গিত করলাম কিছু তথ্য নোট করার জন্য। ছেলেটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম-
আমাকে তোমার ভালো লাগছে?
(প্রিতম মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর করলো)।
তোমার নামটা কে রেখেছে?
জানি না।
তা হলে তুমি কি ভাবে জানো তোমার নাম “টোকাই”।
সবাই আমাকে দেখলেই বলে টোকাই, তাই।
তোমার বাবা মা কবে মায়া গেছে।
আমি জানি না।
কবর দিয়েছে কোথায় জানো?
না, আমি জানি না, আমার খালা জানে।
তোমার খালা কোথায়?
এখন কোথায় জানি না।
তোমার সাথে কখন দেখা হবে?
রাতে শুইতে গেলে।
তুমি সারাদিন কি কর?
এখানেই থাকি।
দুপুরে খাও না?
খাইতো!
কি খাও?
মানুষে যা খাওয়ায়।
ভাত খাও না?
খাই।
কখন খাও?
কোন দিন রাতে খাই। আর কোন দিন একেবারেই খাই না।
আমি যদি তোমার সুন্দর একটা নাম দিই তা হলে কেমন হবে?
ভালো হবে।
তা হলে আজ থেকে তোমার নাম টোকাই না। তোমার নাম হবে প্রিতম। কি পছন্দ হয়েছে?
হু, অনেক পছন্দ হয়েছে।
তা হলে এখন থেকে কেউ নাম জানতে চাইলে কি বলবে?
বলবো আমার নাম ‘প্রিতম’।
তোমার জন্মদিন কবে জানো?
নাতো!
ঠিক আছে আজ তোমার জন্মদিন। এখন থেকে প্রতি বছর আজকের এই দিনে তোমার জন্মদিন পালন করা হবে। তুমি খুশি না?
হু অনেক খুশি।
জন্মদিন কাকে বলে তুমি জানো?
হু, জানি জন্মদিনে ইয়া বড় বড় কেক খাওয়া হয়। আমার জন্মদিনেও কি কেক খাওয়া হবে?
হ্যাঁ, এখন থেকে প্রতিবছর তোমার জন্মদিনেও কেক খাওয়া হবে। আজ রবিবার, ৩ আগষ্ট তোমার জন্মদিন। অবশ্যই আজ একটি বিশেষ দিন। তুমি কি সেটা জানো।
নাতো।
আজ বন্ধু দিবস। প্রতি বছর আগষ্ট মাসের প্রথম রবিার বন্ধু দিবস। এখন থেকে প্রতিবছর আগষ্ট মাসের প্রথম রবিবার তোমার জন্মদিন পালন করা হবে। ভালো হবে না?
আমি আপনাকে কোথায় পাবো?
পাবে পাবে এখন থেকে তুমি আমাকে সব সময় পাবে । আর তুমি এখন কোথায় যাবে?
এখন কোথাও যাবো না।
কি করবে?
আপনার সাথে গল্প করবো।
আমার তো কাজ আছে। আমিতো এখন চলে যাবো?
আপনি আর আসবেন না?
আসবো এখন থেকে আমি সব সময় আসবো, এখানে তোমার সাথে দেখা করার জন্য।
আমি প্রিতম থেকে থেকে অনেক অনুনয় বিনুনয় করে বিদায় নিলাম। যে ছেলেটি কিছুক্ষণ আগে আমার সাথে কথা বলতে চাইছিল না। সে এখন আমার চলে যাওয়ার পথ চেয়ে আছে। আমার ধারণা সে আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।
কাজের ব্যস্ততার কারণে অনেকদিন আর ধর্মসাগর পাড়ে যাওয়া হয়নি। তারপর হঠাৎ একদিন ধর্মসাগর পাড়ে প্রবেশ করলাম। গিয়ে দেখি সেদিন আমি যেখানে প্রিতমের সাথে বসে কথা বলেছি ঠিক সেখানেই বসে আছে প্রিতম। তার হাতে একটা বড় ফেস্টুনের মত কাগজে লেখা আছে ‘আমি টোকাই না, আমার নাম প্রিতম’। আগষ্ট মাসের প্রথম রবিবার আমার জন্মদিন। আমাকে দেখেই প্রিতম এসে জড়িয়ে ধরে বললো-
ভাইয়া, আপনি এত দিন আসেননি কেন?
আমি বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার কারনে আসতে পারিনি।
আমি প্রতিদিন আপনার আসার অপেক্ষায় ছিলাম। আমি সবাইকে আমার নাম বলি প্রিতম।
ভালো করেছ। চলো কিছু খাব।
আমি প্রিতমকে নিয়ে হাটতে শুরু করলাম। অনেকেই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বিষয়টা হয়তো কেউ অনুমান করতে পারছে না। কারন সেদিন তো আজকের লোকগুলো ছিল না। প্রিতমকে নাস্তা খাওয়ানোর পর বিদায় নিলাম। তার প্রতি আমার আরো একটু আঙ্খাকা জন্মালো। তার পিতা-মাতার খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য। তাই প্রিতমের দেওয়া ঠিকানা মত ধর্মপুর বস্তিতে গেলাম সন্ধ্যার পর। সেখানে প্রিতমের আমেনা খালা নামের মানুষটিকে পাওয়া গেল। তার কাছ থেকে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল প্রিতমের মা প্রিতমকে এক বছর বয়সে ফেলে রেখে হঠাৎ একদিন উদাও হয়ে গেছে। তার পর আর ফিরে আসেনি। প্রিতমের বাবা নাকী তারও আগে কাউকে কিছু না বলে হাওয়া হয়ে গেছে। মূলত তারা কেউ কি জীবিত আছে নাকী মারা গেছে তার কোন হদিস নাই। প্রিতমের দাদার বাড়ী নাকি ভোলা জেলায়। সেখান থেকে সে বছর তার বাবা-মা নদী ভাঙ্গার কবল থেকে রক্ষা পেয়ে এই শহরে এসে উঠে। তার পর ধর্মপুর বস্তিতে একটা রুম মাসে ১ হাজার টাকা ভাড়া করে থাকতো। মাঝে মাঝে তাদের নাকি ঝগড়াও হতো। এই ঘটনাগুলো আরো ৬ বছর আগের। তার পর প্রিতম খেয়ে না খেয়েই ঐ আমেনা খালার ঘরে এত বড় হলো। সেই আমেনা খালাও এখন আর তার দেখাশুনার দায়িত্ব নিতে রাজি না। আমেনা খালারও ৬ ছেলে মেয়ের সংসার। স্বামী রিক্সা চালায়। আর তাদের অভাবের সংসারে আরো একটি উপর ঝামেলা পোহানো সম্ভব না। এই কারনেই প্রিতম সারাদিন ধর্মসাগরের পাড়ে পাড়ে কাটায়। দিনের বেলা হাত পেতে যা পায় তাতেই তার খাবার। আর রাতে মাথা গোজার ঠাই হিসেবে এখনও ঐ আমেনা খালার ঠিকানাটাই আছে। আর তাই খালা দয়া করে মাঝে মধ্যে ওর রাতের দু’লোকমা ভাত দিলে খাওয়া হয়। না দিলে জোর খাটায় না সে। বাবা মা মারা যাওয়ার বিষয়টা প্রিতমের কানে রটিয়েছে এই আমেনা খালাই।
রাতে বাসায় ফিরে প্রিতমের জীবনের অতিত ভবিষ্যতটা ভাবলাম কিছুক্ষণ। ওর জন্য এই মুুহুর্তে আমি সর্বোচ্চ কি করতে পানি তাই নিয়ে ভাবলাম। ভাবছি ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবো। আমার সাথে থাকবে। আমার ছোট ভাই হিসেবে বড় হবে। ওর পরিচয় হবে সে আমার ছোট ভাই। আবার ভাবছি ওকে একটা আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেবো। দিনে পড়া লেখা করবে আর রাতে হোস্টেলে ঘুমাবে। আমি প্রতি মাসে ওর জন্য কিছু টাকা পয়সা দিয়ে আসবো। আবার মাথায় ঢুকলো অন্য চিন্তা। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে অনেক মানুষ আছে যাদের ছেলে সন্তান নেই, কখনো হবেও না। এমন একটা সংসারে যদি ওর স্থায়ী ঠিকানা করে দেওয়া যায় তবে ভালো হয় না। কুমিলা শহরে এমন অসংখ্য শিশু আছে যাদের ঠিকানা নেই। আমি কয়জনের জন্য করবো। এই শহরের পথশিশুদের কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যে আমার ঘুম চলে এল আমি বুঝতেই পারলাম না। #

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: