সর্বশেষ সংবাদ
◈ মারছে মানুষে মানুষ!- মোঃ: জহিরুল ইসলাম ◈ নাঙ্গলকোট উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদকের নামে ভূয়া আইডি খুলে প্রতারনার ফাঁদ ◈ “কাজী জোড়পুকুরিয়া সমাজকল্যাণ পরিষদ” কমিটি গঠন ◈ ছাত্রদলের সভাপতি পদে জনপ্রিয়তার শীর্ষে বাগেরহাটের ছেলে হাফিজুর রহমান ◈ চৌদ্দগ্রাম থানার ওসির নির্দেশে কবরে রেখে যাওয়া বৃদ্ধ মহিলাকে হাসপাতালে ভর্তি করলো পুলিশ ◈ নাঙ্গলকোটে ইভটিজিংয়ে প্রতিবাদ করায় সন্ত্রাসী হামলা প্রতিবাদে মানববন্ধন ◈ আজ টাইগারদের দায়িত্ব বুঝে নেবেন ডোমিঙ্গো ◈ জাতীয় দিবসগুলো শিক্ষকদের ছুটি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে কেন? ◈ কুমিল্লা মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাড়ছে লাশের সারি; নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮ জনে; পরিচয় মিলেছে সবার ! ◈ কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে ৭ যাত্রী নিহত

তনু তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়

২৬ মার্চ ২০১৬, ১২:০০:৩৫

:: প্রভাষ আমিন ::

tanu__106916

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ নামটি কোথাও দেখলেই আমি উৎসুক হয়ে উঠি। চট করে ফিরে যাই ৩০ বছর আগে। রাণীর দিঘীর পাড়ে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিড়ে আমার অনেক স্মৃতি। আশির দশকের মাঝামাঝিতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে মিছিল-মিটিং-হরতালে কেটেছে আমাদের যৌবন। আমরা যখন পড়তাম, তখন ভিক্টোরিয়া কলেজে মেয়েদের পড়ার সুযোগ ছিল না। কুমিল্লার মেয়েরা পড়তো উইমেন্স কলেজে। তবে আমরা থাকতেই সহশিক্ষা শুরুর আলোচনা হয়। আমরা তখন আফসোস করতাম, আহারে আমাদের সঙ্গে মেয়রা পড়ছে না কেন। আমরা তখন স্বপ্না রায় ম্যাডামের ক্লাশে যেতাম যতটা না পড়ার লোভে, তারচেয়ে বেশি ম্যাডামের রূপে মুগ্ধ হয়ে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, স্বপ্না রায় যেমন রূপসী, তেমন পড়াতেনও অসম্ভব ভালো। এই এতদিন পরও ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রতি ভালোবাসাটা একটুও কমেনি। বরং যত দিন যাচ্ছে, স্মৃতি যেন আরো মধুর হয়ে ফিরে আসছে।

সেদিন পত্রিকায় ছোট্ট একটি নিউজে ‘ভিক্টোরিয়া কলেজ’ দেখে চমকে যাই। কৌতুহল নিয়ে পড়তে গিয়েই ধাক্কা খাই, বুকটা ভেঙ্গে যায়। ভিক্টোরিয়া কলেজের এক ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এমনিতে লাশ উদ্ধার বড় কোনো নিউজ নয়। কিন্তু ছাত্রীটি যখন ভিক্টোরিয়া কলেজের, তখন আমার বেদনা একটু বেশিই হয়। নাম জানি না, চিনি না; তবুও মনে হয় আমার ছোট বোন যেন। তারপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়। সোহাগী জাহান তনু নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি। বাবার সামর্থ্যর সীমাবদ্ধতা থাকলেও আকাঙ্খা ছিল সীমাহীন, মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া। যত গরিবই হোন, সব বাবার কাছে তার মেয়ে রাজকন্যা। সোহাগ করে নাম রেখেছিলেন সোহাগী। বাবার সামর্থর সীমাবদ্ধতাটা জানতেন তনু, জানতেন স্বপ্নটাও। তাই বাবার স্বপ্নপূরণে উজাড় করে দেন নিজেকে। বাবার ওপর চাপ কমাতে টিউশনি করে পড়ার খরচ জোগাতেন তনু। শুধু পড়াশোনায় নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। ছিলেন ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটার-ভিসিটি’র সক্রিয় সদস্য। নাটক, আবৃত্তি, গান কলেজের সব ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সবার আগে হাজির সোহাগী জাহান তনু।

আর হাজির থাকবেন না তনু; কোনো কিছুতেই না। গান, আবৃত্তি, নাটক, বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা, হুল্লোড়, সংগ্রাম, টিউশনি- তনু এখন সবকিছুর উর্ধ্বে। ২০ মার্চ সন্ধ্যায় প্রতিদিনের মত টিউশনিতে যান তনু। যাওয়ার সময় মায়ের কাছে আবদার ছিল, টেইলার থেকে নতুন জামাটা এনে রাখেন। পরদিন নতুন জামা পড়েই কলেজে যেতে চেয়েছিলেন তনু। সব স্বপ্ন দুমড়ে মুচড়ে পড়ে থাকলো কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের পানির ট্যাংক সংলগ্ন কালভার্টের কাছের ঝোপঝাড়ে। অর্ধনগ্ন ক্ষতবিক্ষত লাশের নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল। মোবাইলটিও পড়েছিল পাশে। আহারে। সেনানিবাসের মত সুরক্ষিত এলাকায় কলেজ ছাত্রীর এই মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না।

আমি জানি এখন অনেক প্রতিবাদ হবে, মানববন্ধন হবে, সভা-সমাবেশ হবে। কিন্তু তনুকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। জন্মের মতই মৃত্যুও অমোঘ। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়। তনুর মত প্রতিশ্রুতির এমন নিষ্ঠুর মৃত্যু আমাদের সত্যি অপরাধী করে দেয়। ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক ছাত্র হিসেবে বেদনা হয়তো আমার একটু বেশি। কিন্তু এই দেশের একজন মানুষ হিসেবে, একজন পুরুষ হিসেবে আমার গ্লানি আরো অনেক বেশি। তনুর মৃত্যু একজন মানুষ হিসেবে আমাকে ছোট করে দেয়। সেনাসিবাসের মত একটি সুরক্ষিত এলাকায় যদি তনুর মত একটি মেয়ে নিরাপদ না থাকে, কোথায় তবে আমাদের নিরাপত্তা?

ধর্ষকরা ধর্ষণের যুক্তি হিসেবে মেয়েদের পোশাককে অজুহাত হিসেবে দাড় করায়। ধর্ষণ আসলে একটি পুরুষালি রোগ। ধর্ষকরা অসুস্থ, অপরাধী। কোনো যুক্তিই তাদের অপরাধকে খাটো করতে পারে না। কিন্তু তনুর ক্ষেত্রে তো এই যুক্তিও খাটে না। মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে তোলা তনুর এই ছবিটি প্রমাণ করে আমাদের চারপাশে ঘুরতে থাকা ভয়ঙ্কর অপরাধী ধর্ষকরা বেপরোয়া। ধর্ষকদের ভয়ে তো আমাদের মেয়েরা লেখাপড়া ফেলে ঘরে বসে থাকবে না। আমাদের মেয়েরা ঘরে-বাইরে কাজ করবে, পড়াশোনা করবে, নাটক করবে, আবৃত্তি করবে, গাইবে, নাচবে। আমাদের অবশ্যই ধর্ষকদের খুঁজে বের করে তাদের বন্দী করে রাখতে হবে। যেন আমাদের মেয়েরা নিরাপদে চলতে পারে। তনুর এমন অকাল মৃত্যুই যেন এমন শেষ মৃত্যু হয়।

তনু প্রিয় বোন আমার, তুমি এই অক্ষম ভাইদের ক্ষমা করে দিও। কথা দিচ্ছি, আমরা তোমার ধর্ষককে, তোমার খুনীকে ক্ষমা করবো না।

probhash2000@gmail.com

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: