দেশবন্ধুর রাজনীতি পাঠ- এবিএম আহসান উল্লাহ | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

দেশবন্ধুর রাজনীতি পাঠ- এবিএম আহসান উল্লাহ

29 July 2016, 8:31:56

জানতাম যে, আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মতো বাঙালি রাজনীতিবিদদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চিন্তা এবং কর্মের ধারাবাহিক উত্তরাধিকারের ফসল। কিন্তু তাঁর রাজনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত তেমন কিছু জানতাম না। কৌতূহল মেটাতে গিয়ে অবাক হয়েছি যে, তিনি এবং তাঁর রাজনীতি আমাদের জন্য এখনো খুবই প্রাসঙ্গিক। তাঁর রাজনৈতিক অবদান আমাদের চলার পথের পাথেয় হতে পারে। এই ভেবে রচনাটি তৈরি করতে আগ্রহী হই।

১। ব্যক্তিগত জীবন

চিত্তরঞ্জন দাস। বাবা ভূবনমোহন দাস ও মা নিস্তারিণী দেবী। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার তেলিরবাগ গ্রামে। দাদা (পিতামহ) কাশীশ্বর দাস, বাবা ও দুই চাচা ছিলেন নামকরা আইনজীবী। এছাড়া তাঁর পরিবারের তিনজন ছিলেন জজ। সুধীররঞ্জন দাশ ছিলেন তাঁদের পরিবারের একজন, যিনি পরবর্তীতে ভারতের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। পরিবারটি পরোপকার ও দানশীলতার জন্য খ্যাত ছিল।

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর চিত্তরঞ্জন দাসের জন্ম কলকাতায়। বাবা ভুবনমোহন দাস তখন কলকাতা হাইকোর্টে অ্যাটর্নি । চিত্তরঞ্জনের লেখপড়া শুরু হয় সেখানেই। ছাত্র হিসেবে খেয়ালি ছিলেন। ক্লাসে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতেন। ক্লাস ও পাঠ্য বইয়ের চেয়ে প্রিয় ছিল সাহিত্য, বিতর্ক, বক্তৃতা। স্কুলে থাকতে কবিতা লিখতেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে গিয়ে যুক্ত হন ‘স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ সহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়(১) তখন সেটির সভাপতি। চিত্তরঞ্জন অ্যাসোসিয়েশনের সভায় যোগ দিয়ে নিয়মিত বক্তৃতা ও বিতর্কে অংশ নিতেন। ইংরেজী ভাষার ওপর যথেষ্ট দখল ছিলো।

আই.সি.এস হওয়ার জন্য ১৮৯০ সালে চিত্তরঞ্জনকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি বার-অ্যাট-ল ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে ১৮৯৪ সালে হাইকোর্টে যোগ দেন। বিলেতে থাকার সময় রাজনৈতিক ব্যাপারে সক্রিয় ছিলেন। কেমব্রিজে অরবিন্দ ঘোষের(২)সঙ্গে পরিচয় হয়। অরবিন্দ সে সময়ে সেখানকার ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠন ‘মজলিশ’ নিয়ে রাজনীতি করতেন। চিত্তরঞ্জন তাঁর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডের হাউজ অব কমনসে নির্বাচন প্রার্থী দাদাভাই নৌরজির(৩) পক্ষে ভারতীয় ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও কাজ করেন। ভারতীয়দের অভাব-অভিযোগ পার্লামেন্টে যথাযথভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে দাদাভাই সেবার ফিন্জব্যারি কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন।

একই বছরে আরেকটি ঘটনা ঘটে। জেমস ম্যাকলিন নামের পার্লামেন্টের একজন সদস্য তাঁর এক বক্তৃতায় বাঙালীদের সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি (কালা আদমি) করেন। এক জনসভায় তরুণ চিত্তরঞ্জন তীব্র ভাষায় ম্যাকলিনের সমালোচনা করেন। জনসভার মুখ্য বক্তা ছিলেন হারবার্ট গ্লাডস্টোন ও দাদাভাই নৌরজি।

কলকাতায় পেশাগত জীবনের প্রথম দিকে খুব অর্থ সংকটে পড়েন। হাইকোর্টে যথেষ্ট উপার্জন না হওয়ায় কলকাতা পুলিশ কোর্টে ও মফস্বলে ফৌজদারী মামলাও নির্দ্বিধায় নিতেন। সাহিত্যচর্চাও চলে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মালঞ্চ’ বেরোয় ১৮৯৬ সনে। ১৮৯৭সনে বাসন্তী দেবীর(৪) সঙ্গে বিয়ে হয়। চিত্তরঞ্জনের চরিত্রের একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল কোন পরিস্থিতেই বিচলিত না হওয়া। তিনি ছিলেন ধীর স্থির ও শান্ত প্রকৃতির। সকল পরিস্থিতিতে অবিচলিত থেকে কাজ করে যেতেন।

১৯২১ সাল পর্যন্ত ব্যারিস্টারি জীবনে চিত্তরঞ্জন যেসব গুরুত্বপূর্ণ মামলা লড়েছিলেন সেগুলোর মধ্যে দু’টি মামলার কথা উল্লেখ করা দরকার। প্রথমটি ‘বন্দেমাতরম মকদ্দমা’ নামে পরিচিত। ১৯০৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ইংরেজী দৈনিক বন্দেমাতরম পত্রিকায়স্বামী বিবেকানন্দের ভাই ভূপেন্দ্র নাথ দত্তের লেখা রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধ প্রকাশের দায়ে অরবিন্দ ঘোষ, পত্রিকার ম্যানেজার হেমচন্দ্র বাগচি এবং পত্রিকার মুদ্রাকর অপূর্বকৃষ্ণ বসুকে দন্ডবিধির ১২৪/এ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়। ঘটনাচক্রে এর সঙ্গেবিপিনচন্দ্র পাল(৫) জড়িয়ে পড়েন। তাঁকে ২৬ আগস্ট প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে ডাকা হয়। উদ্দেশ্যে এই যে, সম্পাদক হিসেবে অরবিন্দকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর সাক্ষ্য মুল্যবান। চিত্তরঞ্জনের পরামর্শে বিপিনচন্দ্র আদালতের শপথ গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। ফলে আদালত অবমাননার অপরাধে তাঁর ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়। কিন্তু অন্য অভিযুক্তরা মুক্ত হন। এমনটি যে ঘটবে চিত্তরঞ্জন তা আগে থেকেই জানতেন। আসলে এটি ছিল পরিকল্পনামাফিক কাজ। তিনি বিপিনচন্দ্রের কারাদণ্ড মওকুফের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হননি। মামলা পরিচালনায় তিনি কেবল দূরদর্শিতার পরিচয়ই দেননি, সওয়ালের মধ্য দিয়ে তার ভবিষ্যত রাজনৈতিক জীবনের ধ্যান-ধারণা যেন অবচেতনভাবে প্রকাশ করেন।

দ্বিতীয় মামলার নাম ‘আলিপুর বোমা’ মামলা। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮ সালে মোজাফফরপুরে নির্দয় ও স্বেচ্ছাচারী বিচারক কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর(৬) বোমা-নিক্ষেপে দু’জন ইংরেজ মহিলা নিহত হয়। এর দু’দিনের মধ্যে কোলকাতা ও মেদিনীপুরের নানা জায়গা থেকে অনেক বিদ্রোহীকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের পর ৩৮ জনকে সেশন্সে সোপর্দ করা হয়। এর মধ্যে নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী রাজসাক্ষী হয়ে অরবিন্দ ঘোষকে জড়িয়ে সমস্ত অপরাধ স্বীকার করেন। জেলের মধ্যেই নরেন্দ্রনাথকে পিস্তলের গুলিতে হত্যা করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু(৭) ও কানাইলাল দত্ত(৮) বিচারে তাদের ফাঁসি হয়। রাজসাক্ষী নিহত হলেও অরবিন্দের মামলা সহজ ছিল না। মামলাটি যথেষ্ট ব্যয়বহুলও ছিল। অরবিন্দের আত্মীয়রা প্রথমে চিত্তরঞ্জনের মতো জুনিয়র ব্যারিস্টারের কাছে যেতে রাজি হননি। কিন্তু প্রথমদিকে নিযুক্ত ব্যারিস্টাররা মামলাটি ত্যাগ করলে শেষে চিত্তরঞ্জনের কাছে যাওয়া হয়। তিনি প্রায় বিনা ফি-তে আট মাসের বেশী সময় মামলাটি পরিচালনা করেন। এতে তাঁর প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ হয়। যা-ই হোক, তার সুদক্ষ পরিচালনায় অরবিন্দ মুক্তি পান, কিন্তু তাঁর ভাই বারীন্দ্র ঘোষ(৯) ও উল্লাসকর দত্ত(১০)  মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হন। নীরবে ক্রন্দনরত অরবিন্দের কাছে গিয়ে চিত্তরঞ্জন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে ওদেরও তিনি মুক্ত করবেন। সে অঙ্গীকার তিনি রক্ষা করেছিলেন।পরে তাঁদের মৃত্যুদন্ড রহিত হয়ে আন্দামানে দীপান্তর হয়।

আলিপুর বোমা মামলা তাঁকে দেশপ্রেমিক ও দক্ষ ব্যারিস্টার রূপে সারা ভারতে খ্যাতি এনে দেয়। আইন ব্যবসায়ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তখন তাঁর মাসিক আয় দাঁড়িয়েছিল গড়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা। তবে, যেমন ছিলেন দাতা, তেমনি যাপন করতেন বিলাসী জীবন।

১৯১৭ সালে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দেন রাজনীতিতে। গান্ধীর আহবানে ১৯২১ সালে আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করেন। প্রচলিত নজির উপেক্ষা করে ভারত সরকার মিউনিশনস বোর্ডঘটিত বিখ্যাত মামলায় ইংরেজ অ্যাডভোকেট-জেনারেল অপেক্ষা অধিক পারিশ্রমিক দিতে স্বীকৃত হয়ে তাঁকে সরকারী কৌসুলী নিযুক্ত করেন। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করায় তিনি এই লোভনীয় প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এই অসামান্য ত্যাগের ফলে সারা ভারত অনুপ্রাণীত হয় ও বাংলার মানুষ তাকে ‘দেশবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্নেহের ছায়ায় দীর্ঘদিন লালিত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম (বাংলাদেশের জাতীয় কবি), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (কথাসাহিত্যিক), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, সুভাস চন্দ্র বসু (নেতাজী), এ. কে. ফজলুক হক (শের-এ-বাংলা) প্রমুখ ব্যক্তিরা। আইন পেশায় ব্যারিস্টার সি.আর. দাসের সহকারী ছিলেন অ্যাডভোকেট এ. কে. ফজলুক হক (শের-এ-বাংলা) ।

দেশবন্ধু স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সর্বজনপ্রিয় নেতা ছাড়া সাহিত্যানুরাগীও ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত রচনাবলী্ল : কাব্য – 'মালঞ্চ' (১৮৯৬) ; 'মালা' (১৯০২ থেকে ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে রচিত) ; 'সাগর সঙ্গীত' (১৯১০-এ রচিত এবং ১৯১৩-তে প্রকাশিত) ; 'অন্তর্য্যামী (১৯১৪-তে ‘নারায়ণ' পত্রিকায় প্রকাশিত) ; 'কিশোর কিশোরী' (১৯১৫-তে 'নারায়ণে' প্রকাশিত)। শেষ দুটি রচনা পরে গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়। গল্প – ‘ডালিম' (১৯১৪-তে 'নারায়ণে' প্রকাশিত) ; 'প্রাণপ্রতিষ্ঠা' (১৯১৫-তে 'নারায়ণে' প্রকাশিত)। প্রবন্ধ – 'কবিতার কথা' (১৩২১ 'নারায়ণে'র ফাল্গুন সংখ্যা) ; 'বাংলার গীতি কবিতা' (১৩২৩ 'নারায়নে'র পৌষ সংখ্যা) ; 'বিক্রমপুরের কথা' (১৯১৬, বিক্রমপুর সম্মিলনীর সভাপতির ভাষণে পঠিত) ; 'বাঙ্গলার কথা' (১৯১৭ মে, প্রাদেশিক সম্মিলনীর সভাপতির অভিভাষণ) ; 'বাঙ্গলার গীতি কবিতা' (২য় ভাগ) (১৩২৪, অগ্রহায়ণ) ; 'বৈষ্ণব কবিতা' (১৯১৭, উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের ১০ম অধিবেশনে পঠিত, ১৩২৪ পৌষে মুদ্রিত) ; 'স্বাগত' (১৯১৮, ঢাকার বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণ; ১৩২৫ বৈশাখে মুদ্রিত) 'বাঙ্গলার গীতি কবিতা' (৩য় ভাগ) (১৯১৮, গিরিজাশঙ্কর রায় কর্তৃক ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত। প্রবন্ধটির বিশেষ নাম 'শক্তি-সাহিত্য ধারায় রামপ্রসাদ') ; 'বঙ্কিম সাহিত্য' (১৯২৪, কাঁঠালপাড়ার সাহিত্য-সভায় সভাপতির অভিভাষণ)।চিত্তরঞ্জনের সাহিত্য প্রীতি ও তার আর্থিক উদারতার পরিচয় পাওয়া যায় কয়েকটি মাসিক পত্রিকার দুঃসময়ে তার সাহায্য দানে। সানগ্রিকভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের জীবন ছিল অসাধারণ কর্মব্যস্ততা ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার যে বিষয় সম্বন্ধে যা মনে হয়েছে তিনি তা স্পষ্টভাবে বলতে কখনও কুণ্ঠিত হন নি। এ নিয়ে তাকে অনেক নিন্দাবাদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। পরিশেষে সুভাষ চন্দ্র বসুর একটি মন্তব্য দিয়ে দেশবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবনের উপসংহার টানা যায়। সুভাষ বসু বলেছেন -"দেশবন্ধুর জীবনই একখানি মহাকাব্য।"

২।রাজনৈতিক জীবন

চিত্তরঞ্জন দাস রাজনীতি শুরু করেন ১৯১৭ সালে।কলেজ জীবনে স্টুডেন্টস এ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্ক, কেমব্রিজে অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে পরিচয়, বিলেত প্রবাসী ভারতীয়দের ছাত্র-সংগঠনে যোগদান, দাদাভাই নৌরজীর সাথে ইংল্যান্ডের নির্বাচনে কাজ করা প্রভূত তাঁর রাজনীতি-সচেতনতার পরিচয় বহন করে।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, দেশবন্ধু ‘সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন’ এর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাদেরকে কাজেও লাগিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় যে স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় তার প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল। ঐ বছর ১৬ই অক্টোবর দার্জিলিঙে এ বিষয়ে তিনি যে ভাষণ দেন, তাতে স্বদেশের কল্যাণে এই আন্দোলনের গুরুত্বের ওপর তাঁকে যথেষ্ট জোর দিতে দেখা যায়। পরের বছর যে বঙ্গীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয় তিনি ছিলেন তার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। পরে এর সহ সভাপতিও হয়েছিলেন (১৯২১-২৪)। একই বছরে (১৯০৬) আরও দুটি ঘটনা ঘটে। ১৪ এপ্রিল বরিশালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে মূল প্রস্তাবসমূহের খসড়া তিনিই তৈরি করেন। তাছাড়া ব্রটিশের কাছে আবেদন-নিবেদনের হীন মানসিকতা বর্জন করে আত্মশক্তির উপর বিশ্বাস স্থাপনের কথা বলেন। ব্যারিস্টার আব্দুর রসুল(১১) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঔ সম্মেলন পুলিশি হামলার জন্য শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতে পারেনি। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ কোলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। এরপর প্রকাশ্য রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন।

১৯১৭ সালের ২১ এপ্রিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য চিত্তরঞ্জন আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাঁর নাম প্রস্তাবের সময় সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় মন্তব্য করেন: ‘he would soon be one of the most trusted and beloved leaders of India’.  সুরেন্দ্রনাথের এই ভবিষ্যৎবাণী সফল হয়েছিল। কংগ্রেসের সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে দেয়া এই প্রথম ভাষণে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন খোলাখুলিভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। সেই দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘জনগণের জন্য মুক্তি’র ধারণা। তাঁর কাঙ্খিত স্বরাজ সম্পর্কে পরে তিনি যে বলেছিলেন- ‘I want swaraj for the masses and not for the classes. I do not care for the bourgeoisie. How few are they? Swaraj must be for the masses and must be won by the masses.  সে চিন্তার প্রাথমিক উচ্চারণ ঘটেছিলো এই বক্তৃতাতেই।

কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটি ছিল তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক উচ্চারণ। তার অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা বোধ হয় প্রাসঙ্গিক হবে:

‘যাহারা বর্তমান বাঙ্গালার চারি কোটি ষাট লাখের মধ্যে চারি কোটি, যাহারা দেশের সার বস্তু, যাহারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া মাটি কর্ষণ করিয়া আমাদের জন্য শস্য উৎপাদন করে, যাহারা ঘোর দারিদ্রের মধ্যেও মরিতে মরিতে বাঙ্গালার নিজের সভ্যতা ও সাধনাকে সজাগ রাখিয়াছে…. তাহারা বড় না কি আমরা বড়? সাবধান! ওঠ! জাগ! মিথ্যা অভিমানকে বর্জন কর। ঐ যে বাঙ্গালার কৃষক সমস্ত দিন বাঙ্গালার মাঠে মাঠে আপনাদের কাজ ও আমাদের কাজ শেষ করিয়া দিবা অবসানে ঘর্মাক্ত কলেবরে বাঙ্গালার কুটিরে কুটিরে বাঙ্গালার গান গাহিতে গাহিতে ফিরিতেছে, উহারা মুসলমান হউক, শূদ্র হউক, চন্ডাল হউক, উহারা প্রত্যেকেই যে সাক্ষাৎ নারায়ণ! ডাক, ডাক, সবাইকে ডাক! প্রাণের ডাক শুনিলে কেহ কি না আসিয়া থাকিতে পারে?’

 

চিত্তরঞ্জন দাসের এই আবেগময় বক্তৃতায় বাংলার বাস্তব অবস্থা এবং তাঁর আন্তরিকতার চিত্র ফুটে ওঠে। ভাষণের এই ক্ষুদ্রাংশে যে সত্য স্পষ্ট হয়েছে তার নাম মানবিকতা বোধ; বিশেষ করে সভ্যতার যারা নির্মাতা ও রক্ষক, সেই কৃষক-শ্রমিকের মানবমূল্যের অকুন্ঠ স্বীকৃতি দান। চিত্তরঞ্জনের স্বল্পকালীন রাজনীতিক জীবনে এরই প্রকাশ লক্ষ্যনীয়।

একদিকে বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা এবং অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারকে বিব্রত করে তোলে। এমতাবস্থায়, ভারত-শাসনে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভারত-সচিব মন্টেগু ও ভাইসরয় চেমসফোর্ড যৌথভাবে শাসন-সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট তৈরি করে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার কাছে পাঠায়। তাতে বলা হয়, ভারতবাসীকে অধিকতর রাজনৈতিক অধিকার দেয়া হবে এবং ক্রমে এই অধিকার বাড়িয়ে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। অথচ এর অল্প কদিন আগে স্বায়ত্তশাসনের দায়িত্বে আন্দোলনরতঅ্যানি ব্যাসান্তকে(১২) অন্তরীণ করা হয়। যাহোক, জাতীয় কংগ্রেস মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার রিপোর্টকে নৈরাশ্য জনক বলে অভিহিত করেন। অ্যানি ব্যাসান্ত একে ‘দাসত্বের এক নতুন অধ্যায়’ রূপে বর্ণনা করেন। গোটা দেশ উত্তেজনায় ভরে যায়। কলকাতার ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন হলের প্রতিবাদসভায় অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে চিত্তরঞ্জন বলেনঃ  ‘I do not think the God of humanity was crucified only once. Tyrants and oppressors have crucified humanity again and again. Every outrage on humanity is a fresh nail driven through his scared flesh.’

এরপর চিত্তরঞ্জন ন্যাশনালিস্ট দলের হোম রুল লীগে(১৩) যোগ দেন। ডিসেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে অ্যানি ব্যাসান্তকে সভাপতি নির্বাচনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ময়মনসিংহ, ঢাকা ও বরিশাল সহসবখানে গিয়ে স্বায়ত্ত্ব শাসন বা হোম রুল সম্পর্কে বক্তৃতা করেন। কলকাতায় এক বক্তৃতায় মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর অভ্যন্তরীণ ও স্বায়ত্ত্ব শাসন সম্পর্কে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের আচরণের তিনি তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেন।

১৯১৮ সালে দু’বার কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। প্রথমবার বিশেষ অধিবেশন হয় মুম্বাইয়ে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। চিত্তরঞ্জনের বিশেষ ভূমিকায় সভাপতি নির্বাচিত হন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি হাসান ইমাম। দ্বিতীয় অধিবেশন হয় ডিসেম্বরে দিল্লীতে। এই অধিবেশনে ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ও রাউলাট কমিটির রিপোর্টের প্রতিবাদে চিত্তরঞ্জন কিছু প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবে তিনি শাসন-সংস্কারকে  অসম্মানজনক ও দ্বৈতশাসন অগ্রহণীয় মন্তব্য করেন। তিনি প্রাদেশিক সরকারকে তখনই স্বায়ত্ত্বশাসন দেওয়ার দাবী তোলেন। দ্বিতীয় দিনের প্রকাশ্য সভা ভেঙ্গে যাওয়ার পর বসে বিষয় নির্ধারণী কমিটির বৈঠক। প্রচন্ড বাকবিতন্ডায় রাত গভীর হয়। বিষয় সেই একই, শাসন-সংস্কার সমর্থন, না প্রতিরোধ করা উচিত? এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে ছিলেন সবাই। রাত বারোটার পর নিজের বক্তব্যের সমর্থনে চিত্তরঞ্জন একের পর এক যুক্তি দেখাতে লাগলেন। তাঁর বলা যখন শেষ হলো তখন দেখা গেল সভা তাঁর সঙ্গেই একমত।

১৯১৯ সালের সালের মার্চে ‘রাউলাট আইন’(১৪) নামের এক কুখ্যাত দমনমূলক আইন বিধিবদ্ধ করা হয়। ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে সমবেত জনতার উপর ব্রিটিশ সেনানায়ক ডায়ারের নির্দেশে সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ৪০০ মানুষ নিহত ও ২৫০০ আহত হয়। এর প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী সত্যাগ্রহের(১৫) ডাক দেন। চিত্তরঞ্জন সর্বান্তঃকরণে তাকে সমর্থন দেন। ভারতব্যাপী হরতাল পালিত হয়। এপ্রিলের গোড়ায় সরকার গান্ধীকে গ্রেফতার করে। অমৃতসরে ডা. সাইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপালকে গুম করা হয়। সরকার আহমেদাবাদ ও পাঞ্জাবে সামরিক আইন জারি করে। রাউলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগের নিদারুণ হত্যাকান্ডের তদন্তের জন্য কংগ্রেস রয়াল কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সরকার সে প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে হান্টার কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে কংগ্রেস গঠন করে অনুসন্ধান কমিটি। এই কমিটির সদস্য হিসেবে চিত্তরঞ্জন নিজের আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে মাসের পর মাস কাজ করেছিলেন।

মন্টেগু-চেমসফোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী ‘ভারত-শাসন আইন’(১৬)পাস করে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। এই আইন অনুযায়ী ভারতের প্রত্যেক প্রদেশে দ্বৈত-শাসনব্যবস্থা ((Dyarchy)(১৭) চালু করা হয়। তবে এই আইনে দায়িত্বশীল ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের বিধান রাখা হয়নি। ভারত-শাসন আইন বিধিবদ্ধ হওয়ার দুদিন পর ২৫ ডিসেম্বর অমৃতসরে কংগ্রেসের এক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ইতিমধ্যে কংগ্রেস তদন্ত কমিটির রিপোর্টের মাধ্যমে পাঞ্জাবে নৃশংসতার কাহিনী দেশবাসী জেনে গেছে। এত কিছুর পরও অমৃতসরের অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী সরকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব তোলেন। চিত্তরঞ্জন পাল্টা প্রস্তাবে সম্পূর্ণ প্রতিরোধমূলক অসহযোগিতার (Total obstruction) কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত লোকমান্য তিলকের(১৮) মধ্যস্থতায় এই মর্মে আপোস হয় যে সরকারের যেসব ব্যবস্থা স্বরাজ লাভের সহায়ক বলে বিবেচিত হবে সেগুলো সমর্থন করা হবে, আর যেগুলো বাধার সৃষ্টি করবে সেগুলোর সঙ্গে অসহযোগিতা করা হবে।

১৯২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অধিবেশনে গান্ধী ভারতে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে পূর্ণ অসহযোগিতার প্রস্তাব দেন। খেলাফত কমিটিও(১৯) অসহযোগ প্রস্তাব নেয়। চিত্তরঞ্জন গান্ধীর প্রস্তাব পুরোপুরি মানেনওনি বর্জনও করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল অসহযোগের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি দরকার। তার আগে এমন কঠিন পরীক্ষায় নামা ঠিক হবে না। স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতার স্মৃতি তিনি ভোলেননি। বিদেশী শিক্ষা, আদালত, আইন পরিষদ(লেজিসলেটিভ কাউন্সিল) ইত্যাদি বর্জন করার আগে সমান্তরাল স্বদেশী প্রতিষ্ঠান স্থাপনের আবশ্যকতার বাস্তববোধ তাঁর মধ্যে কাজ করছিলো। আইন পরিষদে যাওয়ার পক্ষে তাঁর বক্তব্য ছিল ভেতর থেকে অসহযোগিতা করার পথ গ্রহণ করার কৌশল। আসলে অন্য অনেকের মতো তিনি তাড়াহুড়ো করে আন্দোলন করতে চাননি। গান্ধী ছোঁড়েন তাঁর পরীক্ষিত শেষ অস্ত্র- ‘কংগ্রেস যদি অসহযোগ প্রস্তাব গ্রহণ না করে তবে তিনি কংগ্রেসের বাইরে গিয়ে অসহযোগ আন্দোলন(২০) করবেন।’ শেষ পর্যন্ত ৩০ ডিসেম্বর নাগপুর অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং তা পাস হয়। কিন্তু ব্যাপারটি সহজে হয়নি। মহম্মদ আলী জিন্নাহর চেষ্টায় আগের দিন এক বৈঠকে মিলিত হন গান্ধী, মোতিলাল নেহরু, চিত্তরঞ্জন ও মহম্মদ আলি নিজে। স্থির হয়, লক্ষ্যের ব্যাপারে চিত্তরঞ্জন গান্ধীকে সমর্থন করবেন কিন্তু কার্যক্রমের ব্যাপারে তাঁর মতামত শুনতে হবে। এই সহযোগিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গান্ধী বলেন, ‘ভারতবর্ষের অগ্রগতিতে সাহায্য করলে ব্রিটেনের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন করা হবে না। কিন্তু ভারতের আত্মসম্মানে বাধলে তা নির্দ্বিধায় ছিন্ন করা হবে।’ এতে বোঝা যায় নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম ভারতীয় রাজনীতিতে চিত্তরঞ্জনের জন্য একটি সম্মানজনক জায়গা তৈরি করেছে। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে চিত্তরঞ্জন আইন পেশাছাড়লেন। তাঁর দেখাদেখি আরও কেউ কেউ সে পথ অনুসরণ করলেন। শুরু হলো তাঁর সার্বক্ষণিক রাজনীতিক জীবন। সেই সাথে কৃচ্ছতাপূর্ণ জীবনযাপন। বিলাসী চিত্তরঞ্জন হলেন সন্ন্যাসীসদৃশ দেশবন্ধু।

১৯২১ সালের মে মাসে আসামের চা বাগানের নিপীড়িত ও শোষিত কুলিদেরকে কেন্দ্র করে এক নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে। বেশ কিছু কুলি পদ্মা পাড়ি দিয়ে নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট থেকে পালিয়ে পায়ে হেঁটে চাঁদপুর স্টিমার ঘাটে আসে। ২২ মে রাতে গোর্খাবাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। পূর্ববঙ্গে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের(২১) নেতৃত্বে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করে। শিগগির তা পদ্মার সব স্টিমার ঘাটেও ছড়িয়ে পড়ে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কুলিদের মধ্যে কলেরা দেখা দেয়। সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। চিত্তরঞ্জন গোয়ালন্দ যান। চিত্তরঞ্জন কুলিদের টিকিটের ব্যবস্থা করতে চাঁদা তোলেন, ধর্মঘটও চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কুলিদের গোয়ালন্দে আনা হয়। দেশবন্ধু, যতীন্দ্রমোহন, যোসেফ অ্যানড্রুজ (কবিগুরু ও মহাত্মার বন্ধু) ও স্বেচ্ছাসেবীদের সাহায্য ও কুলিদের দুঃখভোগ ধনতন্ত্রের কুৎসিত রূপ উন্মোচন করে দেয়।অথচ মহাত্মা গান্ধী ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় (২৫ জুন) ‘আসামের শিক্ষা’ নামে এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘আমরা ধন বা ধনিকদের ধ্বংস করতে চাই না, ধনিক ও শ্রমিকদের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। সহানুভূতি দেখানোর জন্য ধর্মঘট চালানোটা মূর্খতা হবে।’ এ ঘটনা থেকে মহাত্মা ও দেশবন্ধুর রাজনৈতিক-দর্শনে মৌল পার্থক্য বোঝা যায়।

১৯২১ সালে ব্রিটিশ রাজকুমারের ভারত সফর উপলক্ষে সারা দেশে অস্থিরতা দেখা দেয়। ৩/৪ দিন ধরে মুম্বাইতে দাঙ্গা হাঙ্গামা চলে। এতে ৫৩ জন মারা যায় ও প্রায় ৪০০ আহত হয়। কলকাতার হরতালে শাসককুল ভীত হয়ে পড়ে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটি ২৭ নভেম্বরের সভায় অসহযোগিতা পরিচালনার সকল ক্ষমতা চিত্তরঞ্জনের উপর ছেড়ে দেয়। সিদ্ধান্ত হয় ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে রাস্তায়-রাস্তায় খাদি বিক্রী করা হবে। রাজকুমারের কলকাতা আসার আগের দিন ২৪ ডিসেম্বর হরতাল ঘোষিত হয়। অসহযোগিতা ও খাদি বিক্রীর সঙ্গে যুক্ত থাকায় ৬ ডিসেম্বর দেশবন্ধুর পুত্র চিররঞ্জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং নির্যাতন করা হয়। পরদিন দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তি দেবী ও ভগিনী উর্মিলা দেবী স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন। ১০ ডিসেম্বর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলকে(২২) গ্রেফতার করা হয় ।

২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে দেশবন্ধুকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু কারারুদ্ধ থাকায় তাঁর অংশ গ্রহণ সম্ভব হয়নি। তাঁর লিখিত ভাষণটি গান্ধীর নির্দেশে অধিবেশনে পাঠ করা হয়। হেকিম আজমল খাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ভাষণটি পড়েছিলেন সরোজিনী নাইডু(২৩)।

১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারী সিভিল জেলে দেশবন্ধুর গোপন বিচার শুরু হয়। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি। একতরফা বিচারে ৬ মাস বিনাশ্রম জেল হয়। তাঁকে দমদম সেন্ট্রাল জেলে আনা হলে ইউরোপীয় বন্দীদের মতো বিশেষ সুবিধা না চেয়েদেশীয়দের মতো সাধারণ শ্রেণীতেই থাকতে চান।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ফেব্রুয়ারীর ৫ তারিখে যুক্তপ্রদেশের গোরখপুর জেলায় চৌরিচৌরাতে বিক্ষুদ্ধ জনতা থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ২২ জন পুলিশ আগুনে পুড়ে মারা যায়। আন্দোলন সহিংস হওয়ায় গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। ক্ষতিগ্রস্থ হয় খেলাফত আন্দোলনও(২৪) হিন্দু-মুসলমান সু-সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়ে। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন(২৫) মাথা চাড়া দেয়। চৌরিচৌরার ঘটনার পর আন্দোলন স্থগিত রাখার ব্যাপারে গান্ধীর একতরফা সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের প্রায় সব সিনিয়র নেতাই অসন্তুষ্ট হন। তরুণেরা অসন্তুষ্ট হন আরো বেশি। জেল থেকে দেশবন্ধুও ক্ষুদ্ধ হন। গান্ধীর চাপানো একক সিদ্ধান্ত তিনি মানতে পারেননি, আর জনগণও হতাশ হয়।

১৯২২ সালের ১৫ ও ১৬ এপ্রিল চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক সম্মেলন ছিল যথেষ্ট গুরুত্ববাহী। কেননা সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও সম্মেলনের সভাপতি বাসন্তী দেবী দুজনই চিত্তরঞ্জনের হয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁরা বঙ্গীয়আইন পরিষদে প্রবেশকে অসহযোগের অঙ্গরূপে ঘোষণা করেন। সবাই অবাক হয়েছিলেন এই ভেবে যে এ তো কেবল গান্ধীর প্রস্তাবের বিরোধীতা নয়, দেশবন্ধু নিজেও তো এমন কথা বলেননি। আসলে তারা ভেতরের কথা জানতেন না। দেশবন্ধুর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘রিমফর্মড কাউন্সিল’ ভেঙ্গে দেয়া, যা ছিল অসহযোগ আন্দোলনেরই আরেক রূপ।এই সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন কলকাতা থেকে কয়েকজন চরমপন্থী নেতা। চট্টগ্রামের চরমপন্থীদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা স্থাপিত হয় আর এর মাধ্যমেই চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবী তৎপরতার পথ প্রশস্ত হয়। মাস্টারদা সূর্য সেন(২৬) পুরোদমে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুরু করে দেন নিজের বাসস্থান ‘সাম্যাশ্রমে’ বসে।

কারা মেয়াদ শেষে ১০ আগস্ট দেশবন্ধু মুক্তি পান। সে সময়ে আইন পরিষদে প্রবেশ নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে। দেশবন্ধু দেশের নানাস্থানে এ বিষয়ে বক্তৃতা রাখেন। কংগ্রেস কী ধরণের সরকার চায় তা দেশবাসীকে জানানো কর্তব্য বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও মনে করেন আমলাতন্ত্র রিমফর্মড কাউন্সিল বা দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার মুখোশ পরে বসে আছে। এই মুখোশ ছিঁড়ে ফেলা দরকার। আর সেজন্য প্রয়োজন আইন পরিষদে যাওয়া। ডিসেম্বরে গয়া কংগ্রেস অধিবেশনেও তাঁর মূল বক্তব্য ছিল এটিই। এই অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন তিনি নিজে। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। পরাজিত হওয়ার পর এই সভাতেই দৃঢ় প্রত্যয়ে তিনি বলেছিলেন, Although today I differ from the majority of the members, I have not given up the hope that a day will come when I shall get the majority on my side. তাঁর আশা ফলতে দেরি হয়নি।

চিত্তরঞ্জন মতিলাল নেহরুকে সঙ্গে নিয়ে ১ জানুয়ারি গয়াতেই ‘স্বরাজ দল’(২৭) গঠন করেন। প্রথমে এর নাম ছিল ‘কংগ্রেস-খিলাফত-স্বরাজ দল’, পরে শুধু ‘স্বরাজ দল’। এটি ছিল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত ভিন্ন চিন্তার একটি সহযোগী অংশ। দল গঠনকালে সভাপতি হিসেবে তিনি বলেন কংগ্রেস যে পথে চলেছে তাতে স্বরাজ লাভ বহুদূরে। চরকা ও গঠনমূলক কাজ যেমন আবশ্যক, তেমনি আইন পরিষদে প্রবেশ করে আমলাতন্ত্র ধ্বংস করা কর্তব্য। কংগ্রেসে থেকেই এই পথেই দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

‘স্বরাজ’ শব্দটি সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। স্বরাজ হচ্ছে আত্মআনুগত্য (self-obedience), অন্যের আনুগত্য নয়। এর সঙ্গে বিবেক, নৈতিকতা, মর্যাদাবোধ, মোহহীনতা, সাহসিকতা ইত্যাদি মাঙ্গলিক গুণসমূহ গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সহজ করে বলা যায় স্বরাজ এসব গুণের একীভূত বহিঃপ্রকাশ। দেশবন্ধুর নিজের ভাষায়, “স্বরাজ অর্থ কোন বিশেষ-রকমের শাসন-তন্ত্র নহে। দেশবাসীর পক্ষে নিজেদের শাসনপ্রণালী নিজেরাই স্থির করিয়া লইবার যে-অধিকার—তাহাই স্বরাজ। এই অধিকার আয়ত্ত করিতে পারিলে, দেশের শাসণপ্রণালী আমরা অনায়াসেই নির্ণয় করিয়া লইতে পারিব : তাহার জন্য এখন হইতে মাথা ঘামাইবার বিশেষ কোন প্রয়োজন নাই। এক-কথায় আমরা চাই,— সম্পূর্ণরূপ নিজেদের কর্তৃত্ব এবং ঐটাই স্বরাজের প্রধান ভিত্তি ।”

দেশবন্ধুর এই ধারণার সঙ্গে গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের ভাবনার মিল আছে। গান্ধীর স্বপ্নের দেশের সঙ্গে দেশবন্ধুর বাঞ্চিত দেশের মিল থাকলেও একটা মৌল তফাতও আছে। সেটা এই যে গান্ধী তাঁর দেশের স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে তাঁকে বলেন ‘রামরাজ্য’- যা প্রত্যক্ষভাবে হিন্দু ধর্মসম্পৃক্ত। সেজন্য অন্য ধর্মালম্বীদের, বিশেষত মুসলমানদের কাছে তা ছিল অগ্রহনীয়। দেশবন্ধুর স্বরাজ-ভাবনার মূল কথা হচ্ছে, তাঁর ভাষায়, ‘স্বরাজ অর্থ হিন্দু-মুসলমান মিলে যে নবীন জাতি গড়ে উঠেছে, তাদের শুদ্ধ মনের সম্মিলিত ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত যে জীবন প্রণালী’। ওই ‘জীবন প্রণালী’ গড়ে উঠলে ব্রিটিশ ভারত না ছেড়ে দিশা পাবে না- এমন একটি বিশ্বাস তাঁর মনের মধ্যে ছিল। ওখানেই থেমে থাকেননি তিনি, তার জন্য প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আন্দোলনও করেছেন।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯২৩ সালে সংগঠিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তা্র একটি হচ্ছে, প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনে স্বরাজ দলের জয়লাভ এবং অন্যটি ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ প্রণয়ন। সেপ্টেম্বরে দিল্লীতে কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে স্বরাজ দলের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ ও ভেতর থেকে শাসন-সংস্কার বানচালের অনুমতি দেয়া হয়। ১১৪টি আসনের মধ্যে স্বরাজ দল পায় ৪২ টি এবং কংগ্রেস, স্বতন্ত্র ও ইউরোপীয় দল পায় যথাক্রমে ২৯, ২৫ ও ১৮টি আসন। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল নভেম্বরের শেষে ও ডিসেম্বরের গোড়ায়। ক’দিন পর(১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর) কংগ্রেসের কোকনদ সেশনে স্বরাজ পরিষদ দলের সভায় প্রবল বাধা স্বত্ত্বেও ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ এর শর্তাবলি গৃহীত হয়। বিরোধীরা ‘বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেল’ (Delete the Bengal Pact) বলে চীৎকার করেন। দেশবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “যারা চিৎকার করে বলে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেল’তাদের যুক্তি আমি বুঝতে পারি না। বাংলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ন্যায্য অধিকারকে কি তোমরা অস্বীকার করবে? বাংলা কি অস্পৃশ্য? এ রকম শিষ্টাচারহীন রীতিতে বাংলাকে মুছে ফেলা যাবে না। যদি তোমরা তাই কর, তবে বাংলা তার নিজের ব্যবস্থা নিজেই গ্রহণ করতে পারবে। তোমরা বাংলার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করার মতামত দিতে পার না।”

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন বাস্তববাদী ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি আন্তরিকভাবে মমত্ববোধসম্পন্ন; যা সর্বভারতীয় নেতাদের মধ্যে খুব দুর্লভ ছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন হিন্দু-মুলমানের মিলিত শক্তি ছাড়া ব্রিটিশকে হটানো সম্ভব নয়। আত্মকলহে লিপ্ত থেকে ইংরেজদের সুবিধা করে দেওয়া তিনি কোনভাবেই মানতে পারেননি। তাছাড়া বাংলার নিজস্ব সমস্যা তিনি ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি ঠিকই ধরেছিলেন যে এখানকার হিন্দু-মুসলিম বিরোধের মুল কারণ অর্থনীতিক। এটা আসলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্তের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব। আগে দরকার সেটা নিরসন হওয়া। সেজন্যই ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ (Bengal Pact) দরকার। চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ:

‘সিদ্ধান্ত করা যাইতেছে যে, বাংলাদেশে যাহাতে স্বায়ত্তশাসনের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে সেজন্য প্রদেশের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি চুক্তি অত্যাবশ্যক; যখন স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন এই চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ অধিকার পাইবে। লোকসংখ্যার অনুপাতে ও স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথায় বাংলাদেশ ব্যাপস্থাপক পরিষদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হইবে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রত্যেক জিলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় ৬০% আসন পাইবে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ৪০% আসন পাইবে। সরকারি দফতরে মুসলমানদের জন্য ৫৫% চাকুরী সংরক্ষিত থাকিবে এবং যে পর্যন্ত তাহারা এই সংরক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছে সে পর্যন্ত তাহাদের মধ্য হইতে ৮০%কে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ করা হইবে। যে পর্যন্ত চাকুরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের হার উপরোক্ত পর্যায়ে না আসে সে পর্যন্ত তাহাদেরকে ন্যূনতম যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হইবে, ইহার পর মুসলমানগণ চাকুরির ৫৫% ও অমুসলমানেরা  ৪৫% পাইবে, মধ্যবর্তীকালে হিন্দুগণ ২০% চাকুরী পাইবে। কোন সম্প্রদায়ের ধর্ম সম্পর্কীয় কোন আইন ব্যাবস্থাপক পরিষদের পাশ করিতে হইলে সে সম্প্রদায়ের আইন সভায় নির্বাচিত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের সমর্থন থাকিতে হইবে। মসজিদের সম্মুখে গান বাজনা সহকারে মিছিল করা হইবে না। এবং গরু জবেহ করার ব্যাপারেও কোনরূপ হস্তক্ষেপ করা হইবেনা।’

চুক্তিটি প্রচারিত হওয়ার পরপরই বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে এ চুক্তির প্রবল বিরোধিতা করে। হিন্দু নেতাদের মধ্যে চুক্তি-বিরোধীদের অন্যতম ছিলেন এস.এন ব্যানার্জী ও বি.সি. পাল। তাঁদের ভাষায় এই চুক্তি ছিল এক-তরফা। চুক্তির বিরুদ্ধে হিন্দুদের মধ্যে জনমত গড়ে তোলার ব্যাপারে বাংলার হিন্দু গণমাধ্যমগুলো সমালোচনামুখর হয়ে উঠে। সি.আর দাসের নিজ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা তাঁকে সুবিধাবাদী ও মুসলিম পক্ষপাতদোষে দুষ্ট বলে দোষারোপ করেন। তিনি কিন্তু সকল বিরোধিতার মুখেও অটল থাকেন। চুক্তিটির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া স্বরাজ অসম্ভব। তিনি বাংলার বেশ কিছু কংগ্রেস নেতার সমর্থন লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যেযতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, সুভাষচন্দ্র বসু (২৮), কিরণশংকর রায়(২৯), অনিলবরণ রায়(৩০), বীরেন্দ্র শাসমল এবং প্রতাপচন্দ্র গুহ (৩১) উল্লেখযোগ্য। তাঁর পরিকল্পনার প্রতি বাংলার অধিকাংশ মুসলমানের প্রাণঢালা সমর্থন ছিল। তাঁরা চুক্তিটিকে স্বাগত জানান। বাংলার মুসলমানগণ অনুধাবন করেছিলেন যে, চুক্তিটির বাস্তবায়ন সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের মূলে আঘাত হানবে। মুসলিম গণমাধ্যমগুলি তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ পূরণ করার মতো ঔদার্য প্রদর্শন করায় হিন্দুনেতাদের ধন্যবাদ জানায়। তবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরের কোকোনদ অধিবেশনে চুক্তিটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এতে মুসলমানগণ অত্যন্ত হতাশ বোধ করেন। কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অদূরদর্শী ও অতি স্বার্থপর বলে আখ্যায়িত হয়।হিন্দু-মুস্লিম ঐক্যে ফাটল ধরে।‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’(৩২)এবং ভারত ভাগ-এর বীজ এখানেই রোপিত হয়।

ভারতীয় কংগ্রেস প্রত্যাখ্যান করলেও দেশবন্ধু তাঁর শক্তি ও উদ্দেশ্যের সততার বলে ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে চুক্তিটির বিধানসমূহের অনুমোদন লাভের আপ্রাণ চেষ্টা চালান। দুর্ভাগ্যবশত ১৯২৫ সালে তাঁর অকাল মৃত্যুতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কয়েকজন অনুসারীও চুক্তিটি বর্জন করেন। অনেক বাঙালি মুসলমান রাজনৈতিক নেতা মর্মাহত হন এবং তাঁরা কংগ্রেস ও স্বরাজ উভয় দল থেকেই দূরে সরতে থাকেন। মুসলমানদের দলত্যাগের ফলে প্রদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু মুসলমান নেতা- মৌলভী আব্দুল করিম(৩৩), মওলানা আব্দুর রউফ(৩৪), খান বাহাদুর আজিজুল হক(৩৫), আব্দুল্লা-হিল-বাকী(৩৬), মৌলভী আশরাফউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী(৩৭), ড. এ সুরাওয়ার্দী(৩৮), এ.কে ফজলুল হক(৩৯) প্রমুখের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি’ গড়ে ওঠে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (৪০) সাময়িকভাবে এ দলের সম্পাদক হন। বস্ত্ততপক্ষে, এর পর থেকেই বাংলার রাজনীতিতে বাংলার মুসলমানদের কিরূপ ভূমিকা থাকা উচিত সে সম্বন্ধে নতুন করে ভাবনা সৃষ্টি হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯২৬-এর দিকে বাংলা প্রদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরাবির্ভাব ঘটে। 

‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ চুক্তিটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যায় মুসলমানদের সঙ্গে সম্প্রীতি রক্ষা ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য কতটা ছাড় দিতে হয়েছিল চিত্তরঞ্জনকে। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তাঁর দল (স্বরাজ) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গভর্নর লর্ড লিটন মন্ত্রিসভা গঠনের আহবান জানান। চিত্তরঞ্জন তাতে সম্মত হননি। কারণ তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল অসহযোগ করা। কিন্তু এ কে ফজলুল হক মন্ত্রিত্ব নিতে চাইলেন। ৮ জন অনুসারী নিয়ে ফজলুল হক স্বরাজ দল থেকে সরে পড়লেন এবং শিক্ষামন্ত্রী হলেন। মন্ত্রী হলেন এ.কে. গজনবীও(৪১)।ফলে দেশবন্ধুর সাথে ফজলুল হকের মতভেদ ঘটলো। চিত্তরঞ্জন তাঁর লক্ষ্যে স্থির রইলেন।

২৪ জানুয়ারি আইন পরিষদের প্রথম অধিবেশন থেকেই স্বরাজ দল ক্রমান্বয়ে বন্দীমুক্তি প্রস্তাব, দমনমূলক আইন প্রত্যাহার, মন্ত্রীদের বেতন মঞ্জুর করতে না দেয়া, বাজেট অনুমোদনের বিরোধিতা ইত্যাদি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের কাজে বিঘ্নঘটানো অব্যাহত রাখে। ফলে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দেশবন্ধু ও তাঁর দলের নীতি ফলপ্রসূ হয়। এ থেকে ধারণা করা যায় স্বরাজ দলের নীতি সর্বভারতীয় পর্যায়ে গৃহীত হলে ভারত-শাসন বিষয়ে সরকারের পক্ষে ভিন্ন চিন্তা না করে উপায় থাকত না। কিন্তু আগেই দেখা গেছে গান্ধী আইন পরিষদে প্রবেশের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে এই নীতি অসহযোগ-নীতির পরিপন্থী। এমনকি ফেব্রুয়ারী মাসে কারাবাস থেকে মুক্তি পেয়ে জুনে অনুষ্ঠিত আহমেদাবাদ অধিবেশনে যারা কংগ্রেস দফতর-নির্বাহী পদ থেকে কাউন্সিলে প্রবেশ করেছেন তিনি তাঁদের অপসারণের প্রস্তাব তোলেন, যদিও তাতে সফল হননি।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কলকাতা করপোরেশন নির্বাচনে স্বরাজ দল নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। দেশবন্ধু মেয়র, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ডেপুটি মেয়র ও সুভাষ চন্দ্র বসু চিফ অফিসার নিযুক্ত হন। এই তিন নেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টায় শহরের গরীব মানুষের জীবন পরিবর্তন, প্রথমিক শিক্ষার বিস্তার, স্বল্প মূল্যে দুধ সরবরাহ, চিকিৎসার উন্নয়ন, বস্তির জীবন যাত্রার উন্নয়ন, অবৈতনিক পাঠশালা স্থাপন ইত্যাদি কল্যাণমূলক কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন হতে থাকে। অধিকাংশ ঠিকাদারি কাজও (কণ্ট্রাক্ট) ভারতীয়দের দেয়া হয়। এ সব কাজের ফলে ইউরোপীয় গোষ্ঠি অখুশি হয়। কেননা করপোরেশন এতদিন তাদের স্বার্থসিদ্ধির একটা ক্ষেত্র ছিল। এ নিয়ে সরকারের সাথে বাদানুবাদ শুরু হয়। সরকার স্বরাজীদের বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ ও ঘুষ নেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ তোলে। তবে মহাত্মা গান্ধী হিসাবপত্র পরীক্ষা করে তাদের সততার সার্টিফিকেট দেন।

স্বরাজীদের বিরুদ্ধে কিছু করতে না পেরে সরকার ভিন্ন পথ ধরে। অক্টোবরে জারি করা হয় বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স। বলা হয়, দেশকে উদ্ধার করার জন্যই এই অর্ডিন্যান্স। কেবল কর্পোরেশন নয়, প্রাদেশিক পরিষদে দেশবন্ধু ও তাঁর দলের প্রচন্ড সরকার-বিরোধী ভূমিকা এবং সিরাজগঞ্জ প্রাদেশিক সম্মেলনে ইংরেজ হত্যাকারী গোপীনাথ সাহার(৪২) দেশপ্রেমের প্রশংসা ইত্যাদির প্রতিশোধ গ্রহণই ছিল অর্ডিন্যান্সের মূল উদ্দেশ্য। সরকার প্রকৃত পক্ষে স্বরাজ দলকে পর্যুদস্ত করে দিতে চেয়েছিল। তাতে অনেকটা সফলও হয়েছিল। বিশেষ করে সুভাষ চন্দ্র বসুকে গ্রেফতার করে সরকার দেশবন্ধুর ডান হাতটা ভেঙ্গে দিয়েছিল।

১৯২৪ সনের জুনে অনুষ্ঠিত সিরাজগঞ্জ প্রাদেশিক সম্মেলনে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ অনুমোদিত হয়। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। কারণ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী সম্মেলনটাই বানচাল করার চেষ্টা করেছিল। দুই সম্প্রদায়েরই কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি ভূমিকা গ্রহণের ফলে তা সফল হয়নি ।

মহাত্মা গান্ধী অনেক ক্ষেত্রেই ছিলেন আপোষমুখী। বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স তাঁর কাছে হটকারী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছিল। বাংলা কংগ্রেসের সম্পাদক অনিলবরণ রায়, স্বরাজ দলের সম্পাদক সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, করপোরেশনের প্রধান কর্মকর্তা সুভাষ বসু ও আরও অনেক রাজনীতিককে গ্রেফতারে সরকারী উদ্দেশ্যেরই প্রতিফলন ঘটেছিল। গান্ধী স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দেশবন্ধুর বাড়ীতে আসেন। নভেম্বরের গোড়ায় স্বরাজ দলের সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে ‘কংগ্রেস সংগঠনের অখন্ড অংশ’ হিসেবে তিনি তাদের কাউন্সিলের মধ্যে কাজ করাকে স্বীকার করে নেন। বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে দেশবন্ধু তাঁর স্বরাজ দলকে কংগ্রেসের দ্বারা অনুমোদন করিয়ে নিলেন।

১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে আবার বঙ্গীয় আইনসভার অধিবেশন ডাকা হয়। দেশবন্ধু অসুস্থ অবস্থায় সভায় যোগ দেন। গভর্নর বেঙ্গল অর্ডিন্যান্সে সংশোধনী এনে Criminal Law Amendment Bill পাশ করানোর উদ্যোগ নিলে দেশবাসী এর বিরুদ্ধে জোরালো মত দেয়। এ কে ফজলুল হকও এই বিলের বিপক্ষে মত দেন। ভোটাভুটি হলে বিলের বিপক্ষে ৬৯ ও পক্ষে ৬৬ টি ভোট পড়ে। অসন্তুষ্ট গভর্নর আইন সভার অধিবেশন আবারো মুলতবি ঘোষণা করেন।

১৯২৫-এর মে মাসের গোড়ায় ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন। সভাপতি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। এই সম্মেলনেই তিনি জীবনের শেষ ভাষণ দান। এই ভাষণেও তিনি স্বরাজ লাভের ওপর গুরুত্ব দেন, কিন্তু ব্রিটেনকে অনুরোধ জানানডোমিনিয়ান স্ট্যাটাস(৪৩) দেয়ার জন্য। এতে তাঁর সমর্থক বিপ্লবীরা তীব্র আপত্তি তোলেন। বাংলার অস্থায়ী ছোটলাট কের (Kerr) লেখেন, ‘চিত্তরঞ্জনের দল প্রায় দু’ভাগ হয়ে গেছে। তিনি  গোলমাল এড়াতে দার্জিলিঙ চলে গেছেন।’ কের-এর দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল অসত্য। দেশবন্ধু তখন সত্যিই গুরুতর অসুস্থ। তিনি দার্জিলিঙ গিয়েছিলেন বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যোদ্ধারের আশায়। কতটা অসুস্থ ছিলেন ১৬ জুন তাঁর মৃত্যুই এর প্রমাণ দেয়।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের রাজনৈতিক জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, মাত্র ৮ বছর। তাঁর মৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির একটি প্রত্যাশিত সম্ভাবনা নষ্ট করে দিয়েছে। সেই প্রত্যাশাটি হচ্ছে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব-বিবাদের প্রজ্বলন্ত সমস্যার নিরসন। সমস্যাটি তিনি যেভাবে অনুধাবন করেছিলেন, আর কোন বড় মাপের নেতা তেমন চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে হয় না। খুবই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রথমে নিজের প্রদেশে সমস্যাটি নিরসনের পদক্ষেপ (বেঙ্গল প্যাক্ট) নিয়েছিলেন। আবুল কালাম আজাদ দৃঢ়তার সঙ্গে এই বিশ্বাস ব্যক্ত করেছিলেন যে দেশবন্ধুর অকালমৃত্যু না হলে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা আবহ তৈরি হতো।

দেশবন্ধুর অকালমৃত্যুর পর বেঙ্গল প্যাক্টেরও অপমৃত্যু ঘটে। কারণ বাধা ছিল কংগ্রেসের ভেতর থেকে এবং স্বরাজ দলের মধ্যেও। এ ব্যাপারে কেবল সাম্প্রদায়িক স্বার্থই কাজ করেনি, শ্রেণীস্বার্থও ছিল প্রবলভাবে সক্রিয়। করপোরেশনের মুসলমানদের বেশী সংখ্যায় চাকুরী দেওয়ায় ঘনশ্যাম দাস বিড়লা পর্যন্ত গান্ধীর কাছে নালিশ জানিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য যে বেঙ্গল প্যাক্টের মতো স্বরাজ দলেরও প্রায় অকালমৃত্যু ঘটে।

অতুলনীয় দেশপ্রেম, ত্যাগ, সংগঠনশক্তি, গণ-আবেদন সবই তাঁর ছিল। সহযোদ্ধারাও ছিলেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতী এবং নিবেদিত। তবু কেন এমন হলো? বাইরে থেকে বাংলা স্বরাজ দলের কর্মসমিতি গুণীজনের সমাহার মনে হলেও তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বই দুর্বলতার অন্যতম কারণ। তাঁর মৃত্যুর পর করপোরেশন ও দলের কর্তৃত্ব নিয়ে লজ্জাজনক কলহ তার প্রমাণ। কলহের মুল কারণ- বিভেদপ্রবণতা ও উচ্চাকাঙ্খা। রাজনৈতিক জীবনে সুবিধাবাদী নেতাদের দেখে আক্ষেপ করে দেশবন্ধু বলতেন- ‘বারো বৎসর ক্রিমিনাল প্র্যাকটিস করে মানব চরিত্রের উপর যে বিশ্বাস আমার ছিল, আট বৎসর রাজনীতি করে সে বিশ্বাস আমি হারিয়ে ফেলেছি।’

সন্ন্যাসীসুলভ কৃচ্ছ্বতাসাধন, কারাবাস ও অত্যধিক পরিশ্রমে চিত্তরঞ্জন দাসের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। ১৬ জুন ১৯২৫ সালে দার্জিলিঙে তিনি মাত্র ৫৫ বছরে অকালে মারা যান। মৃত্যুর আগে পৈতৃক বসতবাড়ী জনসাধারণকে দান করে যান। বর্তমানে সেখানে ‘চিত্তরঞ্জন সেবাসদন’ প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’।

সামগ্রিকভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের যে পরিচয় পাওয়া যায় তাতে বিস্ময়ে ও শ্রদ্ধায় তাঁর প্রতি মাথা নত হয়। দেশের স্বাধীনতা লাভ ও দেশবাসীর কল্যাণ আকাঙ্খায় যে উচ্চতম আদর্শবাদিতার স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন, উপমহাদেশের বিভক্ত তিন অংশেরই রাজনীতিকদের তা থেকে শিক্ষালাভের অনেক কিছু রয়েছে। বিশেষ করে, দেশবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ও সংগ্রামী ঐতিহ্য ধারণ করে তাঁর পরবর্তি বাঙালি রাজনৈতিক ও কবি-সাহিত্যিক  প্রজন্মের (এ. কে. ফজলুক হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তি) আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বৃহৎ বাংলার একাংশ ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীনতা পেলেও জনগণের মুক্তি আজো অর্জিত হয়নি। তাই, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের রাজনীতির পাঠে তিনি হতে পারেন আমাদের কাছে একজন যথার্থ শিক্ষক।

নোটঃ ক্রমিক  নম্বর ১-৪৩ পর্যন্ত চিহ্নিত বিষয়গুলোর ওপর পর্যায়ক্রমে  আলোকপাত করা হবে।

***

 

কৃতজ্ঞতাঃ

হাবিব আর রহমান-  চিত্তরঞ্জন দাসের রাজনীতি, নতুন দিগন্ত, ১৪শবর্ষ, এপ্রিল-জুন সংখ্যা, ২০১৬।

তথ্যসূত্র / আরো জানা যাবেঃ

১। অগ্নিযুগে বোমা ষড়যন্ত্রে অরবিন্দ- চিন্ময় চৌধুরী, পুনশ্চ প্রকাশনী, কলকাতা, প্রকাশকাল ১৯৯৯।

২। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ জীবন ও কর্ম- রচনা সম্পাদনা, অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী, মনির হোসাইন মনি, নাসিমা খাতুন, জান্নাতুল ফেরদৌসি স্নিগ্ধা, প্রকাশক- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গবেষণা পরিষদ, প্রকাশকাল নভেম্বর ২০০০।

৩। স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকা- সুধাংশু দাশগুপ্ত, প্রকাশকাল ১৯৯০, কলকাতা।

৪। আমি সুভাষ বলছি- শ্রীশৈলেশ দে, রবীন্দ্র লাইব্রেরি, কলকাতা, প্রকাশকাল: রথযাত্রা-  প্রথম খণ্ড ১৩৮১, রথযাত্রা- দ্বিতীয় খণ্ড ১৩৮৪, রথযাত্রা- তৃতীয় খণ্ড ১৩৮৯।

৫। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মনীষীর কথা- সম্পাদনা-মাহফুজ উল্লাহ, প্রভাত প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রকাশকাল ১৯৯৭।

৬। স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকা- সুধাংশু দাশগুপ্ত, ন্যাশনাল বুকস এজেন্সি কলকাতা, প্রকাশকাল ২০০৯।

৭। বারীন্দ্র কুমার ঘোষ. কারাজীবনী / উল্লাসকর দত্ত ; সংকলন ও সম্পাদনা, সুপ্রিয় ভট্টাচার্য.,কলিকাতা : সাগ্নিক বুকস।

৮।ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের জীবনকথা: তপন কুমার দে। জাগৃতি প্রকাশনী, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহাবাগ, ঢাকা। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারী ২০০৫।

৯। অগ্নিযুগের ইতিহাস: ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন। প্রকাশক: মুক্তধারা। প্রকাশকাল; ডিসেম্বর ১৯৭৯।

১০। বাংলার বিপ্লব প্রচেষ্টা: হেমচন্দ্র কানুনগো। চিরায়ত প্রকাশনী, কলকাতা। প্রকাশকাল: জুন, ১৯২৮।

১১। স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকা: সুধাংশু দাশগুপ্ত, ন্যাশনাল বুকস এজেন্সি কলকাতা।

১২। বাংলার মুক্তি সন্ধানী: সব্যসাচী চট্টপাধ্যায় ও রাখী চট্টপাধ্যায়। প্রকাশকাল ২০০৫, কলকাতা।

১৩। সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৬০-৪৬১, ISBN 978-81-7955-135-6

১৪। ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, জেলে ত্রিশ বছর, পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ধ্রুপদ সাহিত্যাঙ্গন, ঢাকা, ঢাকা বইমেলা ২০০৪, পৃষ্ঠা ৭৯।

 

 

 

এবিএম আহসান

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য:

x