সর্বশেষ সংবাদ
◈ প্রধান মন্ত্রীর আস্থাভাজন খুলনা ১এর কর্নধর শেখ সোহেল দাকোপ বটিয়াঘাটায় ত্রান ও ঈদ উপহার বিতরণ করেন ◈ ‘আব্দুল গফুর ভূইয়া’রা সমাজের মহৎ হৃদয়ের মানুষ ‘ ◈ কুমিল্লাবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আ.লীগ নেতা আবদুছ ছালাম বেগ ◈ নাঙ্গলকোটে এবার ১৬ স্বাস্থ্য কর্মীসহ সহ করোনা আক্রান্ত ২৫ ◈ প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহারের তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও আত্মীকরনের অভিযোগ! ◈ কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে কর্মক্ষম পুরুষহীন পরিবারের মাঝে ইচ্ছেঘুড়ির মাছ মাংস বিতরণ ◈ নাঙ্গলকোটে ঈদ উপহার সামগ্রী নিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে আলিয়ারার আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ ◈ করোনা থেকে মুক্তি চাই – মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন ◈ শিকল পায়ে সাম্য –মোঃ এম.রহমান ◈ নাঙ্গলকোটের পেরিয়া ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আইনজীবীর বাড়িতে হামলার অভিযোগ:শিশুসহ আহত ৩

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকের শীর্ষে ইয়াবাঃ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই!

28 January 2018, 10:21:52

রাসেল আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ঃ
খুলনা সহ ৯ উপজেলায় মাদকের শীর্ষ চাহিদা তালিকায় রয়েছে সর্বনাশা নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ জেনে, আবার কেউ না জেনেই বিপন্ন করছেন নিজের জীবন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এমন কোন পেশা নেই যেখানে ইয়াবা আসক্ত নেই। বিশেষ করে তরুণ সমাজ বেশি আসক্ত। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছেন অনেকে। ছাত্র সংগঠনগুলোতে তো অভাব নেই ইয়াবাসেবীর। শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে ইয়াবা ব্যবহার ও বেচাকেনা চলছে। এমন কি পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিকরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশার বাণিজ্যে। ফলে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকের ব্যবহার কমে গেলেও ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

নগরীর একাধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসকরা জানান, ইয়াবা ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। আর এ কারণে সমাজে নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ বাড়ছে। ইয়াবা আসক্তরা জন্মদাতা বাবা-মাকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। ইয়াবা খেতে খেতে তারা একেকজন ‘মানববোমা’য় পরিণত হয়। যার বিস্ফোরণে সমাজ কুলষিত হচ্ছে। রাজধানীর চামেলীবাগে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী ইয়াবা আসক্ত ঐশী’র মতোই পুলিশ ইন্সপেক্টর পিতা ও মাকে খুনের পর খুন কিংবা অপরাধ করলেও এনিয়ে তাদের ভিতরে কোন অনুশোচনা হয় না। কারণ ইয়াবা সেবনকারীর পুরো মানসিক পরিবর্তন ঘটে যায়। বিষন্নতা চরম আকার ধারণ করে। ভিতর ভিতর চরম নিষ্ঠুরতার সৃষ্টি হয়। কোমলমতি মেধাবী ছাত্রী ঐশীর সেই পরিবর্তন ঘটায় সে তার পিতা-মাতাকে হত্যা করে। এখনোই ইয়াবা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এধরণের নিষ্ঠুতার পুনাবৃত্তি ঘটতেই পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।

খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সেখ আকতার উজ জামান বলেন, ইয়াবা আসক্তদের ‘নার্ভ সিস্টেম’ পুরোটাই ‘ড্যামেজ’ করে ফেলে। তারা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে। নিজেরা আত্মহত্যা করে এবং অন্যদের খুন করতে পারে। এটি সেবনে উচ্চরক্ত চাপ ও হৃদরোগ বৃদ্ধি, হজমশক্তি নষ্ট হওয়া ও শরীর দুর্বল হয়ে পড়া, পিঠে ব্যাথা, ফুসফুস ও কিডনি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইয়াবা আসক্তদের অনেকেই স্থায়ীভাবে যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। তাদের চিকিৎসা দিয়ে তেমন কোন লাভ হবে না। তাদের মধ্যে নানা মানসিক পরিবর্তন ঘটে, ফলে তারা নিষ্ঠুর আচরণ করে বলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান।

ভয়াবহ বিস্তার ঃ ইয়াবা নেই খুলনাতে এমন কোন এলাকা নেই। শহরের বাইরে উপজেলা সদর ছাড়াও গ্রাম-গঞ্জে ইয়াবা বেচাকেনা চলছে। এটি গ্রামে ‘বাবা’ হিসাবে খ্যাত। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, ইয়াবার ব্যবহার সমাজে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যা অধিদফতরের একার পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যেখানে অধিদফতরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা, পুলিশসহ নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাদক ব্যবসায় জড়িত এবং নিয়মিত ব্যবহারকারী, সেখানে ইয়াবা প্রতিরোধে ফলাফল শূন্যই হবে বলে ওই কর্মকর্তারা জানান। তারা ইয়াবা প্রতিরোধে সকল পেশার লোকজনকে এগিয়ে আসার এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর আহবান জানান।

ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট তালিকা নেই ? খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উপ-আ লিক কার্যালয়ের সুত্র জানা গেছে, নগরীর টুটপাড়া, বানিয়াখামার, নিরালা, গল্লামারী, নতুনবাজার, লবণচরা, খালিশপুর, দৌলতপুর ও ফুলবাড়ীগেট এলাকাসহ নগরীর অধিকাংশ আবাসিক হোটেলে ১০ থেকে ১২ জন পাইকারী বিক্রেতা নিয়মিত ইয়াবা বিক্রি করছে। একই সাথে প্রায় ২৫/৩০ জন খুচরা বিক্রেতা সরাসরি সেবীদের কাছে সরবরাহ করছে। প্রতি মাসে গড়ে খুলনায় ৫ হাজার পিচ ইয়াবা বিকিকিনি হয়। এ পরিসংখ্যান বছরখানেক আগের। সেই তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ও খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। তবে খুলনার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে ইয়াবা’র বেচাকেনা চলছে বলে সুত্রটি জানিয়েছে। তুলনামুলকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে ইয়াবার চাহিদা বেশি। মাদক ব্যবসায়ীরা আড়াই শ’ তেকে সাড়ে ৩০০ টাকা হারে প্রতি পিচ ট্যাবলেট বিক্রি করছে বলে পুলিশের সুত্র জানিয়েছে।

ইয়াবার বড় চালান প্রবেশ ঃ গত ১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে রূপসা ব্রীজের পশ্চিমপাড় এলাকা থেকে ১ হাজার ২০০পিচ ইয়াবাসহ মোঃ ইকবাল হোসেন (৩২) নামের একজন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের মাতসাইল গ্রামের মোঃ মোসলেম মিয়ার ছেলে ইকবাল হোসেন পুলিশকে জানায়, সে চট্টগ্রাম থেকে খুলনায় ইয়াবার চালান পৌঁছানোর দায়িত্বে ছিলেন। ইয়াবা বিক্রির সাথে জড়িত নয় দাবী করে পুলিশের কাছে খুলনা মহানগরীর কতিপয় রাজনৈতিকের ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তির নাম প্রকাশ করে সে। গত ৫-৬ সেপ্টেম্বর লবনচরা থানায় দু’দিনের রিমান্ডে সে পুলিশকে জানায়, প্রায় প্রতি রাতেই খুলনাতে ইয়াবা’র চালান আসে। তার শুধু দায়িত্ব ছিল পার্টির কাছে পৌঁছে দেয়া। সে এই চক্রের কয়েকজনের নাম প্রকাশ করলে সুত্রটি তা জানাতে রাজি হননি। তবে খুলনার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কতিপয় ব্যক্তি ইয়াবা বিক্রির হোতা বলে জানিয়েছে সুত্রটি।

ইয়াবা রোধে যৌথ অভিযান ঃ সর্বশেষ গত ৯ নভেম্বর রাতে নতুন বাজার ওয়াবদা বেড়ীবাঁধ এলাকার বাসিন্দা গোলাম মোস্তফার দুই মেয়ে সানজিদা স্বপ্না (১৯) ও আয়শা খাতুন (১৮) কে ৫ পিচ ইয়াবা ও ২০ পুরিয়া হেরোইনসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। এরআগে ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরী কেডিএ এভিনিউ রোডের জীবন বীমা ভবনের সামনে থেকে ১০পিচ ইয়াবাসহ ৩৮নং ইব্রাহিম রোডের বাসিন্দা মৃত আলমগীর হোসেনের ছেলে মোঃ মেহেদী হাসানকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এছাড়া চলতি বছরে শতাধিক ব্যক্তিকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সুত্র জানিয়েছে।

মূল হোতারা অধরা ঃ বিজিবি, পুলিশ, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সকল আইন প্রযোগকারী সংস্থা ইয়াবা উদ্ধারে তৎপর থাকলেও এখনও অধরাই রয়ে গেছে শীর্ষ ইয়াবা গডফাদাররা। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী ইয়াবার পাইকারী বিক্রেতাদের নাম-পরিচয় জানার পরও তাদের গ্রেফতার করতে পারে না প্রশাসন। আবার সাংবাদিকদের কাছে তাদের নাম প্রকাশ করা হয় না; পরবর্তীতে অভিযান চালানো হবে এমন প্রত্যাশায়। খুচরা বিক্রেতাদের মাঝে-মধ্যে হাতে-নাতে গ্রেফতার করলেও আইনের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে রেবিয়ে আসছে তারাও।

খুলনা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’র উপ-আ লিক পরিচালক পারভীন আক্তার বলেন, প্রতিমাসে খুলনায় প্রায় শ’খানেক মামলা হচ্ছে। মোবাইল কোর্টে সাজা না দিয়ে মামলা দায়ের হলে ৫/৬ বছর লেগে যায় নিষ্পত্তিতে। তখন অনেক অপরাধী প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। ফলে সমাজকে জীবন বিধ্বংসী ইয়াবা’র ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রচার-প্রচারণা এবং পারিবারিক অনুশাসনই ইয়াবা প্রতিরোধ করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: