বখতিয়ার খলজির ৮১২ তম বঙ্গবিজয় বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ ◈ অনুকূল পরিবেশ হলে এইচএসসি পরীক্ষা ◈ কুমিল্লায় বিপুল ইয়াবাসহ দম্পতি আটক!

বখতিয়ার খলজির ৮১২ তম বঙ্গবিজয় বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

12 June 2017, 2:07:37

মাহমুদ ইউসুফ
বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে ত্রয়োদশ শতকের সূচনাপর্বে। বখতিয়ার খলজির হাত ধরে ইসলাম জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলমানরা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ক্ষমতা লাভ করে। একই সাথে অর্জিত হয় জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা। সূচিত হয় ইসলাম প্রচার-প্রসারে যুগান্তকারী কার্যক্রম। কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ বাস্তবায়নে বখতিয়ার খলজি নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা নির্মাণ, আলেম-উলামা তথা ইসলাম প্রচারকদের আবাসস্থল বা খানকাহ নির্মাণ, তাদের সকল সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বখতিয়ার দৃষ্টি রাখেন। নবগঠিত ইসলামি সা¤্রাজ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অমুসলিমদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ পয়দা, মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রদান ইত্যাদি জনহিতকর কাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করেন মহাবীর বখতিয়ার।

বখতিয়ার খলজি ছিলেন কল্যাণমুখী জীবনধারার প্রবর্তক। এর আগে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় ধারণা ছিলো অনুপস্থিত, গরহাজির। ভারতীয় ঐতিহাসিক শ্রী সুরজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, ‘ইসলাম স্বাতন্ত্র্যে গৌরবান্বিত বাংলার জনসাধারণকে অজ্ঞাত-পূর্ব মুক্তির স্বাদ দিলো। বৌদ্ধ ও নি¤œশ্রেণির তথা শ্রমজীবী জনসাধারণকে দিল ব্রাহ্মণ্য নির্যাতন ও কঠোর অনুশাসনাদি থেকে মুক্তি, প্রতি পদে সামাজিক অপমানের থেকে মুক্তি, পূর্ব-দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্রস্পৃহ জনসাধারণকে দিল ভৌগোলিক বিধিনিষেধের বন্দি দশা থেকে মুক্তি, বহু আয়াসসাধ্য সংস্কৃত ভাষার বন্ধন কেটে জনসাধারণকে দিল মাতৃভাষাতে আত্মপ্রকাশের অধিকার, সাহিত্যের বাহনের মতোই প্রসঙ্গ বা বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও দিল ধর্মীয় বন্ধন থেকে মানসিক প্রসঙ্গে মুক্তি। একই সঙ্গে এত রকম মুক্তির স্বাদ দেয়ার উপরে মুসলমান শাসকরা ষোড়শ শতাব্দির শেষ দশক পর্যন্ত কার্যত রক্ষা করে বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতাকে। অর্থাৎ বাংলার বহু সাধনাত্মক ইতিহাসকে ইসলাম যে ধ্রুবপদে বেঁধে দিল তার নাম স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা। (সুরজিৎ দাশগুপ্ত: ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ ১২২)

প্রখ্যাত স্কলার, জাতীয় বুদ্ধিজীবী, ক্রুসেড গবেষক এবং নাট্যব্যক্তিত্ব ড. আসকার ইবনে শাইখ বলেন, ‘অস্পষ্ট পরিচয় এক তুর্কি সন্তান তখনকার শক্তিস্তম্ভ সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরি বা দিল্লি প্রধান কুতুব উদ্দিনের কোনো রকম সাহায্য ছাড়াই ইসলাম অনুসারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করে যায় এমন এক রাজ্য, গুরুত্বে যা অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে দাঁড়ায় দিল্লি-সালতানাতের ঈর্ষার ব্যাপার। উচ্চতায় খাটো হলেও মুহাম্মাদ বখতিয়ার এমন এক সেনাপতি যাঁর সাহস, উদ্যম ও নেতৃত্বের তুলনা মেলা ভার। রণকৌশলের মত প্রশাসন দক্ষতায়ও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়, রণক্ষেত্রে দুর্জয় ও রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা বিধানে অতুলনীয় এই মর্দে মুজাহিদ রাজ্যবাসীর সর্বরকম কল্যাণ সাধনে ছিলেন তৎপর।’ (আসকার ইবনে শাইখ, মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা, পৃ ৬৫-৬৬)

২০১৭ সালে বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়ের ৮১২ তম বার্ষিকী। ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত সব ঘটনার পয়দা সিয়াম সাধনার মাসে। এই রমযান মাসে সম্পন্ন হয়েছে ইসলামের ইতিহাসের বড় বড় বিজয় মহাবিজয় । বদর যুদ্ধ ১৭ রমযান, মাক্কা বিজয় ২০ রমযান, উমার রা. এর সেনাপতি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের হাতে পারস্য বিজয় ও পারস্য সেনাপতি রুস্তুম নিহত ৬৩৫ সালের রমযান মাসে। জেরুসালেম বিজয় একই সালের ১৩ রমযান। আমর ইবনুল আস মিশরের ব্যাবিলন দুর্গ অধিকার করেন ৬৪১ সালের ২ রমযান। ফলে আলেকজান্দ্রিয়া ও মিশর জয় সম্ভব হয়। তারিক বিন যিয়াদ স্পেন জয় করেন ৭১১ সালের রমযান মাসে। মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু ও মুলতান অধিকার করেন ৭১২ সালের ১৫ রমযান। ২১২ হিজরির রমযান মাসে সেনাপতি জিয়াদ বিন আলগার সাকাল্লিয়া দ্বীপ জয় করেন। ইমামুদ্দিন জেঙ্কি ১১৪৪ সালের রমযান মাসে ক্রুসেডারদের দখল থেকে আলেপ্প, হারবান, হালব, এডিসা পুনরুদ্ধার এবং সিরিয়া থেকে সন্ত্রাসী ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করেন। ক্রুসেড বিজয়ী বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি গই দি লুসিয়ান ও রেজিল্যান্ডের ২০ হাজার ফ্রাঙ্ক সৈন্যকে হটিয়ে জেরুসালেম পুনরুদ্ধার করেন ১১৮৭ সালের রমযান মাসে।
তদ্রুপ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজির ইসলামের অভিযান হিসেবে বঙ্গবিজয়ও সংঘটিত হয় এই রমযানে। বখতিয়ার খলজি ১৭ রমযান ৬০১ হিজরিতে যুদ্ধের স্ট্রাটেজির নিয়মে বিহার থেকে অতি গোপনে জনপথ পরিহার করে ঝাড়খ-ের দুর্গম জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নদিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সৈন্যবাহিনী, ঘোড়া ও যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে পথচলা সত্যিই দুরুহ ব্যাপার। স্বাপদশঙ্কুল বন পেরিয়ে নদীয়া পৌঁছতে তাঁর দুই দিন সময় লাগে। ১২০৫ সালের ১৯ রমযান বখতিয়ার নদীয়া পৌঁছেন। নদীয়া তদানীন্তন বাংলাদেশের রাজধানী। রাজা লক্ষণ সেন তখন রাজধানীর রাজপ্রসাদে। মুসলিম সৈন্যবাহিনীর মূল অংশ তখন পশ্চাতে অরণ্যের পথে। ঘোড়সওয়ারির ছদ্মাবেশে বখতিয়ার মাত্র ১৭ জন মুজাহিদ নিয়ে দুপুরবেলা রাজদরবারে আকস্মিকভাবে প্রবেশ করে। রাজা তখন মধ্যহ্নভোজে রত। হঠাৎ আক্রমণে লক্ষণসেন দিশেহারা হয়ে পিছনের দরজা দিয়ে কিস্তিযোগে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর পলায়ন করেন। একপ্রকার বিনা বাধায় রাজধানী নদিয়া বখতিয়ারের হস্তগত হয়। জনগণ বা সেন-সৈন্যরা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলেনি। কারণ তখন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রজারা ছিলো সেন-সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট। নদিয়ায় তিনদিন অবস্থান করে বখতিয়ার শহরটি ফতেহ সুসম্পন্ন করেন। অত:পর উত্তরদিকে নিকটবর্তী শহর লাখনৌতি ফতেহের মাধ্যমে সেখানে অধিষ্ঠিত হন মুসলিম বাহিনী। নদিয়ার শাসনভার সহকারীর হাতে অর্পণ করে লাখনৌতিতে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন বখতিয়ার খলজি। শুরু হয় নতুন করে পথচলা। বাংলার আকাশে উড্ডীন হলো তাওহিদের শান্তির নিশান-কালিমার পতাকা। কুরআনের শ্লোগান: নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার- এ মুখরিত হতে থাকল বাংলার আকাশ-বাতাস, পথ-প্রান্তর, বন-বাদাড়। পৌত্তলিকতা, শিরক, বেইনসাফি থেকে মুক্তি পেল বাঙালি জাতি। মূর্তিপূজা, প্রকৃতিপূজা, সতিদাহ, নরপূজা, নরবলি, সূর্য উপাসনারত পথভ্রান্ত জাতি ফিরে আসল মহানবি স. প্রদর্শিত জান্নাতের সুপথে।
সেনা আমলে বাংলাদেশ ছিলো বর্ণাশ্রম, কুসংস্কার, বর্বরতায় আচ্ছন্ন। জনগণ ছিলো অশিক্ষিত, মূর্খ, অজ্ঞ, বকলম। বখতিয়ার সরকার প্রধান হয়ে পাড়ায় পাড়ায় বৈষয়িক ও দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ক্রমে ক্রমে মানুষ শিক্ষিত জ্ঞানী হয়ে গড়ে তোলে সোনার বাংলা। সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির শীর্ষ চূড়ায় ওঠে সুবেহ বাঙালাহ। কয়েকশ বছরের মধ্যেই বাংলা হয়ে ওঠে সুপার পাওয়ার। এ ধারা অব্যাহত থাকে সাড়ে পাঁচশ বছর ব্রিটিশ শাসন শোষনের সূচনা সময় পর্যন্ত। ঔপনিবেশিক আমলে সোনার বাংলা হয় শ্মশান বাংলায়। লুটপাট আর শোষণে সমৃদ্ধ হয় লন্ডন আর বাংলা চলে যায় বখতিয়ার পূববর্তী সেনশাসনের যুগের পর্যায়ে। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস।
বখতিয়ারের নদিয়া ফতেহের প্রেক্ষাপটেই পরবর্তী দেড়শ বছরের মধ্যে সোনারগাঁওকেন্দ্রিক স্বাধীন বাঙলা, স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে গড়ে ওঠে বিশ^সভ্যতার বিশ^কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠিত হয় জ্ঞানবিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। এ বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেয়া হতো বিজ্ঞান, দর্শন, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, কুরআন, হাদিস, ফিকাহ প্রভৃতি। এ বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার ছিলেন আল্লামা আবু তাওয়ামা। এখানেই সৃজিত হয় পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পোশাক শিল্প মসলিন। এ সম্পর্কে অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের খ্যাতনামা প-িত ভারতীয় সিভিল সার্ভিস সদস্য এফ বি ব্রাডলী বার্ট বলেছেন, ‘এই সময়ে (সুলতানি আমল ও আফগান আমল) সোনারগাঁও সমৃদ্ধির শীর্ষ-সীমায় উপনীত। বয়ন শিল্পের মান এখানে এতো উচ্চস্তরে পৌঁছেছিল যে, প্রাচ্যের অন্য কোনো বয়নকেন্দ্রই সোনারগাঁওয়ের সমকক্ষতা দাবি করতে পারতো না। বলা বাহুল্য, মসলিন শিল্প বিজয়ী মুসলমানদেরই অবদান। একমাত্র এখানকার কারিগরই অত্যুৎকৃষ্ট মানের মসলিন বস্ত্র উৎপাদন করতে পারত। মসলিনের খ্যাতি ওই সময়ে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছিল। (এফ বি ব্রাডলী বার্ট: প্রাচ্যের রহস্য নগরী, পৃ ১৯) রাজধানী সোনারগাঁয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৩৩৮ সালে। মানব ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ নগর সভ্যতার পতন ঘটে ১৫৭৬ সালে মুঘল সেনাপতির হাতে সুলতান দাউদ খান কররানির পতনের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের পাতায় ঘুমিয়ে আছে সেই রাজধানী।

বখতিয়ার বাংলাদেশে ইসলামের পথিকৃৎ। বখতিয়ার হলেন পরশপাথর তুল্য। যাঁর পরশে লোহা সোনা হয়ে যায়। দুষ্টচক্র থেকে মানুষকে বাঁচাতে তিনি ত্রানকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বাঙালি জাতি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। এ বাংলায় তাঁর আগমন না ঘটলে আজও আমাদের থাকতে হতো মুশরিক বা মূর্তিপূজক পরিচয়ে। ইমানের আলো, ইসলামের শাশ^ত রূপ, আল্লাহর রসুল স. এর সুন্নাহ, কুরআনের সুমহান আদর্শ থেকে বঞ্চিত হতো বাঙালিরা। ব্যক্তিগত স্বার্থের চিন্তায় বখতিয়ার এদেশে আসেননি। আসছেন সাহাবিদের রীতি নীতিতে উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহার হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে। এজন্যই আমরা দেখি বখতিয়ার গদি নিরাপত্তা আইন না করে জননিরাপত্তা আইন করেন। তাঁর চিন্তা চেতনা মনন ছিলো জনগণের কল্যাণ। আর ইসলামের প্রচার প্রসার ও দিগি¦জয়। প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আরিফুল হক বলেন, ‘বাংলার মুসলিম ইতিহাসের সঙ্গে যে নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, যার আগমন না ঘটলে বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না, বাংলা মুল্লুকে ইসলামের প্রসার ঘটতো না, বাংলাদেশের ইতিহাসের সেই বিস্ময়কর পুরুষ, রূপকথার রাজপুত্রের মত তেজোদীপ্ত, অসীম সাহসী, বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পথিকৃত, যাঁর নাম মালিক বখতিয়ার খলজি।—–কিন্তু দু:খের বিষয় এই মহান পথপ্রদর্শকে আমরা বিস্মৃত হয়েছি। বানের পানিতে ভেসে আসা কচুরিপানার মত আমাদের স্বাধীনতার গৌরবের অসংখ্য ভাগিদারদের ভীড়ে বাংলার সমতল ভূমি ছেয়ে গেছে। কেবল অনুচ্চারিত থেকে গেছে সেই মহান পুরুষটির নাম, যার পদার্পণ না ঘটলে এই বাংলার মাটিতে ইসলাম আবাদ হতো না, মুসলমানরা রাষ্ট্রক্ষমতার অধীশ^র হয়ে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচশ বছর দেশ শাসন করতে পারতো না, স্বাধীন বাংলাদেশ নামক এই ভূখ-ের জন্ম হতো না। দু:খের বিষয় আমাদের ইতিহাসের সেই মহান নায়ককে আজ আমরা ভুলে গেছি, হারিয়ে ফেলেছি। সত্য ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে আমাদের বড় অনীহা। আমরা ভুলে যাই, সত্য ইতিহাসই বর্তমানের সাথে অতীতের যোগসূত্র রচনার একমাত্র উপায়। ঐতিহ্যই জাতির প্রত্যাশার রূপ, আকাক্সক্ষার ফসল।’ (আরিফুল হক: বঙ্গবিজয় ও আজকের প্রেক্ষাপট, প্রথম প্রভাত, পৃ ২৭-২৮)

বিহার, বাংলা, কামরূপ, তিব্বত অভিযান সবগুলোর লক্ষ্যই ছিলো একমাত্র ইসলামের উত্থান অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা। তাইতো চিরস্মরণীয় বখতিয়ার। মুসলিম মাত্রই স্মরণ করা উচিত এই মহান সিপাহসালারকে। নিজের পিতৃপুরুষকে ভুলে কেউ উন্নতি অগ্রগতির সোপানে উঠতে পারে না। তাই সাফাল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে হলে, কুরআন সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন করতে হলে পথদিশারী বখতিয়ারকে সামনে নিয়ে আসা সময়ের অপরিহার্য দাবি। চারদিকের এই অপরাজনীতি, দানবীয় প্রবৃত্তি, দুর্নীতিবাজদের উল্মফন রুখতে হলে হৃদয়ে, মননে, করনে, চলনে, বলনে, ধরণে, বরণে বখতিয়ারের আদর্শ লালন করতে হবে। তাহলেই বাঙালি-বাংলাদেশি জাতির মুক্তি সম্ভব।

হদিস:
১। মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম: রমযানের চল্লিশ শিক্ষা, আল বারাকা লাইব্রেরি, বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০, প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ২০০৬
২. ড. আসকার ইবনে শাইখ: মুসলিম আমল বাংলার শাসনকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০০৪
৩. এফ বি ব্রাডলী বার্ট: প্রাচ্যের রহস্য নগরী (তরযমা: রহীম উদ্দীন সিদ্দিকী), নবরাগ প্রকাশনী, দ্বিতীয় মুদ্রণ মে ২০১০, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
৪। প্রথম প্রভাত, বঙ্গবিজয়ের ৭৯৩ তম স্মারক, ধানমন্ডি ঢাকা, জানুয়ারি ১৯৯৭
৫। সুরজিৎ দাশগুপ্ত: ভারতবর্ষ ও ইসলাম, সাহিত্য প্রকাশ, প্রথম বাংলাদেশ মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৮৭ পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা ১০০০

বি: দ্র;
১. বখতিয়ার ১২০৫ সালের ১৯ শে রমযান বাংলাদেশের ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন।
২. ফতেহ আরবি উদ্ভূত বাংলা শব্দ। বাংলাভাষায় ইহা জয় বা বিজয় অর্থে ব্যবহৃত। তবে জয় বা বিজয় মূলত: সংস্কৃত শব্দ।

 

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: