বহুবিবাহ ও বহুসন্তান ঃ একটি পর্যালোচনা | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ
প্রচ্ছদ / সারাদেশ / বিস্তারিত

বহুবিবাহ ও বহুসন্তান ঃ একটি পর্যালোচনা

19 June 2017, 3:13:28

 

মাহমুদ ইউসুফ

‘হুজুররা বহুবিবাহ করে থাকে’, ‘হুজুরদের পোলাপান বেশি’ এরকম ডায়ালগ নাটকে, ফিল্মে, গানে, বিজ্ঞাপনে, লঞ্চে, গাড়িতে, সড়কে, অফিসে, টিভিতে, টকশোতে, সাক্ষাৎকারে, শ্রেণিকক্ষে হরহামেশা শোনা যায়। এ ধরনের প্রচার প্রোপাগান্ডা যুগ যুগ ধরে চলছে। একটি উৎসাহী মহল এসব বাণী ছড়াতে অধিক মাত্রায় উদগ্রীব। আলেম উলামাদের কুপোকাৎ করতেও তারা এসব প্রচার চালায়। ইমাম, মুয়াযযিনদের দেখলে এ বিষয়ে টিটকারী মারতেও ভুলে যায় না। উপহাসগুলো অহরহ প্রত্যক্ষ করছি। ইসলামের লেবাস দেখলেই তাকে হাসির পাত্র বানাতে হবে। এটা বর্তমানে একটা ট্রাডিশন। হাল ফ্যাশন। মোটকথা ধর্মনিরপেক্ষবাদী কৃষ্টি কালচার মানেই ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ।

কারা বহুবিবাহের প্রবক্তা, কারা বেশি সন্তানের জন্ম দেয় এর সত্যাসত্য নির্ণয় করা খুব কঠিন নয়। এবার আমরা তলিয়ে দেখব এটা সত্য না মিথ্যা, বাস্তব না কাল্পনিক। কারাই বা এগুলো প্রচার করছে। কারাই বা অধিক বিবাহে, অধিক সন্তান জন্মদানে পারদর্শী ?

বাঙালি হিন্দুদের বহুবিবাহ
প্রাচীনকাল থেকেই বৈদিক হিন্দুরা বহুবিবাহে পারদর্শী। বিশেষ করে আঠার-বিশ শতকের বর্ণহিন্দুদের বিয়ে কাহিনি তো প্রবাদতুল্য। ১৮৩৫ সালের ২৩ এপ্রিলের সংখ্যা সমাচার দর্পণে জ্ঞানন্বেশন পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানমূলক তথ্যে দেখা যায়, রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের স্ত্রী ছিলো ৬২ জন এবং নিমাই মুখোপাধ্যায় ও রামকান্ত বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রীর সংখ্যা ছিলো ৬০ জন করে। (তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৩৩) ১৮৬৫ সালে বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন, হুগলি জেলার বিভিন্ন গ্রামে বহু বিবাহকারী কুলিন ব্রাহ্মণেরই ৭০/৮০ জন করে স্ত্রী ছিলো। ৫৫ বছরের ভোলানাথ বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রী ছিলো ৮০ জন। ৬৪ বছর বয়সের ভগবান চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী ছিলো ৭২ জন। ৫০/৬০ জন করে স্ত্রীর মালিক বহু কুলিন ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে হলে একটি বিরাট গ্রন্থের প্রয়োজন। আশুতোষ বন্দোপাধ্যায় ১৮ জন স্ত্রীর মালিক ছিলেন। অপর একজন ১০ বছর বয়সের বালক ছিলেন প্যারি মোহন মুখোপাধ্যায় যার স্ত্রী ছিলো ১৫ জন। (তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৩৭) বর্ণহিন্দুদের এইসব বজ্জাতি ঢাকতেই তাদের ওয়ারিশরা মুসলমানদের গায়ে বদনামের লেবেল লাগাতে বিভিন্ন স্টাইলে অপপ্রচার চালায়।

শ্রী খোসালচন্দ্র রায় তার হিস্টরি অব বাকেরগঞ্জ শীর্ষক কিতাবে লিখেছেন, ‘কলসকাঠি নিবাসী ঈশ^রচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নামক জনৈক কুলীন ব্রাহ্মণ ১০৬টি বিবাহ করেন। ইহাতেও তাহার সাধ পূর্ণ হইয়াছিল না।’ (বৃহত্তর বাকরগঞ্জের ইতিহাস, পৃ ৩১৮) রামমোহন রায় ঢালাওভাবে বলেছিলেন কোনো কোনো কুলিন ব্রাহ্মণ পুরুষ ২০০-৩০০ এর অধিক বিয়ে করে থাকেন। যারা গুণে দেখেছিলেন, তাদের মতে ৩৬০টির বেশি বিবাহ করেছেন এমন পুরুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। (তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৩৫) ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে ঢাকার জেলার মুন্সিগঞ্জ জেলার ব্রজযোগনী গ্রামবাসী কৃষ্ণসুন্দর বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রীর সংখ্যা ছিলো ২৮৪টি। —–৭০/৮০ জন স্ত্রী ছিলো এ ধরনের বহু কুলিন ব্রাহ্মণের নাম ধাম ঠিকানা পাওয়া যায়। (তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৩৬)

ঐতিহাসিক শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘যে গ্রামে আমার জন্ম সেখানে এক বাড়িতে দুই কুলীন ভাই ছিলেন। বাল্যকালে তাদের একজনের ছেলে গ্রামের বিদ্যালয়ে আমার সঙ্গে পড়ত বলে তাদের বাড়ি যেতাম। এভাবে তাদের অনেক খবর শুনেছিলাম। দুই ভাইয়েরই ৫০/৬০টি করে স্ত্রী ছিলো। কয়েকজন তাদের সঙ্গে থাকত। সম্ভবত পালাক্রমে নতুন নতুন বধূর দল আসত আর যেত। আমার মনে আছে গ্রামের নাম ধরে তাদের ডাকা হতো। অমুক গ্রামের বউ। অমুক গ্রামের মা, খুরী, জেঠী ইত্যাদি। তখনকার দিনে গল্প শুনতাম কুলীন ব্রাহ্মণ স্ত্রীর পিত্রালয়ে কোনো গ্রামে গিয়ে শ^শুর বাড়ি চিনতে পারতেন না। কিন্তু খাতায় শ^শুরের নাম লেখা ছিলো, তার নাম করে নদীর ঘাটে একটি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, মা অমুকের বাড়ি কোন্ দিকে? পরে জানতে পারলেন ওই মহিলা তার স্ত্রী।—-’(উদ্ধৃতি: তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৩৩) তিনি আরও বলেছেন, —- স্ত্রীর প্রতি এরূপ অশ্রদ্ধার চিত্র বোধ হয় পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও দেখা যায় না। নানা দেশের ইতিহাস পড়ে পড়ে আজ পর্যন্ত আমার মনে সে ধারণাই জন্মে আছে।’ (ওই, পৃ ৩৪) রাজা রামমোহন রায় বলেন, ‘স্বর্গের প্রলোভনে নারী যদি সহমরণে না যায়, তখন হিন্দু পিতৃতন্ত্র কী করে? জোর করে পুড়িয়ে মারে- এটা দস্যুবৃত্তি।’ (কুমার সুশান্ত সরকার: হিন্দুদের গরু খাওয়া বৈধ ও বিবিধ সমালোচনা, প্রথম ফ্লাপে বর্ণিত বাণী) ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেছেন, ‘হে অবলাগণ! তোমরা কী পাপে, ভারতবর্ষে আসিয়া জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি না! নারীর জন্যে নিষ্ঠুরতম ভূ-ভাগের নাম ভারতবর্ষ, নিষ্ঠুরতম ব্যবস্থার নাম হিন্দু পিতৃতন্ত্র।’ (ওই)

কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. অতুল সুর বলেন, ‘বঙ্গদেশের কুলীন ব্রাহ্মণরা বস্তা বেঁধে বিবাহ করতেন। এরূপ শোনা যায় যে, এক একজন ২০০/৩০০ পর্যন্ত বিবাহ করতেন। (ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, পৃ ৬১) প্রখ্যাত লেখক, গবেষক তপন কুমার দে বলেন,—পাপ মুক্তির দোহাই দিয়ে কুলিন ব্রাহ্মণরা অনেকজনে কয়েকশত বিবাহ করে অন্যের স্বর্গবাসের পথ করে দিতেন। শুধু কয়েকশত বিবাহই নয় অশিতিপর বৃদ্ধের সঙ্গে শিশু কন্যাকে বিবাহ দিতে হতো। এমনকী একই ব্যক্তির সঙ্গে একই পরিবারের ৫ বছরের শিশুকন্যা হতে ৫০/৬০ বছর বয়সের অনুঢ়া কন্যাকে বিবাহ দেয়া হতো। এমন হাস্যকর ঘটনাও আছে এই বহু বিবাহের নামে ভাইঝি, পিসি, মাসি, বোনঝি এমন সম্পর্কীয় কয়েকজন মহিলা একই ব্রাহ্মণের সঙ্গে বিবাহ হতো। হোক সে কুলিন ব্রাহ্মণ শত বছরের বৃদ্ধ। আর ওই মেয়েদের মধ্যে থাক না ৩ বছরের কন্যা। তবুও স্বর্গ লাভের আশায় দিতে হবে বিয়ে। (তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৩২-৩৩)

দেব-দেবীর বহুবিবাহ ও বহুসন্তান
হিন্দুসমাজ দেব-দেবী বিশ^াস নির্ভর। তাদের সামগ্রিক তাহযিব-তামাদ্দুন দেবদেবতার জীবনাচারের বুনিয়াদের ওপর গড়ে উঠেছে। ব্যতীক্রম ছাড়া শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বকলম, শিশু, বৃদ্ধ, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী সকল শ্রেণির হিন্দু নাগরিকরাই দেবকাহিনির আলোকে জীবন গড়ার প্রত্যাশী। আবার কেউ কেউ মনে করেন এগুলো সব কাল্পনিক, বানোয়াট কেচ্ছা কাহিনি। তবে আমরা মনে করি এসব দেব-দেবীরা অতীতে আর্য হিন্দু ঋষি, পুরোহিত, অবতার, ধর্মযাচক, প-িত, নেতা, যোদ্ধা, রাজা, মহারাজা ছিলেন। যেমন হিন্দুদের প্রধান দেবতা ইন্দ্র ছিলেন মূলত: আর্য নেতা। এ সম্পর্কে শ্রীহিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় ঋগে¦দের ভূমিকায় বলেন, ‘‘সম্ভবত ইন্দ্র একজন ঐতিহাসিক মানুষ ছিলেন এবং আর্যদের বিজয় অভিযানে তিনিই মূল ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁকে দেবত্বের পদে উন্নীত করা হয়েছিল।’ (ঋগে¦দ-সংহিতা-প্রথম খ-, পৃ ৪৭) অতএব যাদের ওপর দেবত্ব আরোপ করা হয় তারা সকলেই আমাদের মতই মাটির পয়দায়েশে সাধারণ মানুষ।

কৃষ্ণ রুক্সিণীকে স্বয়ংবরসভা হতে অপহরণ করে এনে বিবাহ করেন। প্রদ্যুম্ম তারই গর্ভজ পুত্র। এরপরে স্যমন্তক মনিহরণ উপলক্ষে জাম্ববতী ও সত্যভামার সাথে তার বিবাহ হয়। ক্রমে ক্রমে তিনি ১৬ হাজার ১০ মহিলার পাণিগ্রহণ করেন। (কল্পনা ভৌমিক: কবীন্দ্র মহাভারত প্রথম খ-, পৃ ৯৭০) এছাড়া সপ্ত ঋষির অন্যতম কশ্যপ দক্ষের দিতি, অদিতি প্রভৃতি ১৭ জন (সপ্তদশ) কন্যাকে বিয়ে করেন। (কল্পনা ভৌমিক: কবীন্দ্র মহাভারত প্রথম খ-, পৃ ৯৬৮) দক্ষ প্রজাপতির ৬০ জন কন্যা ছিলো। (সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান, পৃ ৭৮) মহাভারত মতে দক্ষ ব্রহ্মার বাম অঙ্গুষ্ঠ হতে এবং তাঁর স্ত্রী ব্রহ্মার বাম অঙ্গুষ্ঠ উৎপন্ন হয়। দক্ষের স্ত্রী ৫০টি কন্যাকে প্রসব করেন। এই সকল কন্যার মধ্যে ধর্মকে ১০টি, কশ্যপকে ১৩টি এবং চন্দ্রকে ২৭টি প্রদান করেন (বিয়ে দেন)। (সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান, পৃ ১৬৫) এখানে বহুসন্তানের পাশাপাশি ভাইবোনের বিবাহও লক্ষ্যণীয়।

গান্ধার রাজ সুবলের কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের মহিষী গান্ধারী ১০০ পুত্র ১ কন্যা দুঃশলা জন্ম দেন। (কল্পনা ভৌমিক: কবীন্দ্র মহাভারত প্রথম খ-, পৃ ৯৭১-৯৭২) প্রাচীন ভারতীয় ইক্ষ¦াকু বংশীয় রাজা সগর এর ৬০ হাজার পুত্র ছিলো। সকল পুত্রই কুপিল মুনির অভিশাপে ভস্মিভূত হয়। পরে ভগীরথ তাদেরকে পুনরায় উদ্ধার করেন। (কল্পনা ভৌমিক: কবীন্দ্র মহাভারত প্রথম খ-, পৃ ৯৯৫) মহাভারতে উল্লিখিত হয়েছে যে, রাজা সোমকের ১০০ স্ত্রী ছিলো। (ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, পৃ ৩২-৩৩) দক্ষ রাজার ১৩টি মেয়ের বিবাহ হয় ধর্মের সঙ্গে। (ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, পৃ ৩৩)

ব্রহ্মার মানসপুত্র অত্রিমুনির সন্তান হলো চন্দ্র। দক্ষের ভরণী, কৃত্তিকা, আর্দ্রা, অশ্লেষা, মঘা, উত্তরফাল্গুনী, বিশাখা, উত্তরাষাঢ়া, রোহিনী প্রভৃতি নামক ২৭টি কন্যাকে চন্দ্র বিয়ে করেন। এদের মধ্যে রোহিণীই চন্দ্রের সর্বাপেক্ষা প্রিয়তমা হওয়ায় অন্য কন্যারা দক্ষের কাছে পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। জামাতার মত পরিবর্তনে অসমর্থ হয়ে দক্ষ অভিশাপ দেন যে, চন্দ্র পুত্রকন্যাহীন ও যক্ষ্মারোগগ্রস্ত হবেন। (সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান, পৃ ১৩১)

একদিন চন্দ্র দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে হরণ করেন। বৃহস্পতি চন্দ্রের এই কুকীর্তি ও ঋষিরা তারাকে প্রত্যার্পণ করার জন্য চন্দ্রকে অনুরোধ করেন। চন্দ্র তাদের উপেক্ষা করলে রুদ্রদেব বৃহস্পতির পক্ষ অবলম্বন করে চন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অবতীর্ণ হলেন। এই উপলক্ষে দুই দলে তুমুল যুদ্ধ হয়। তখন ব্রহ্মা এই বিপদে শঙ্কিত হয়ে রুদ্রকে নিবৃত্ত করেন ও চন্দ্রের কাছ হতে তারাকে উদ্ধার করে বৃহস্পতিকে প্রত্যার্পণ করেন। এই সময় তারা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তারা বুধ নামে একটি পরম সুন্দর পুত্র সন্তান জন্মলাভ করেন। এই পুত্র চন্দ্রের ঔরসজাত। (সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান, ২৮৬) নিজের ২৭ স্ত্রী বর্তমান থাকা সত্ত্বেও অন্যের স্ত্রীকে অপহরণ করে ধর্ষন বা ব্যাভিচার করা কোন ধরনের ধর্মীয় কালচার। এই হলো হিন্দু মুনি-ঋষিদের নৈতিকতা!

বৃটিশ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসংখ্য পতœী, উপপতœী, রক্ষিতা ছিলো। অসংখ্য চাকরবাকরসহ আয়েশী জীবন ছিলো তাদের কাম্য। কোনো কোনো ইংরেজ কর্মচারীর দুই-তিন শ’ চাকর থাকার কথাও শোনা যায়। ১৮৪০ সালের দিকে দিল্লিতে নিযুক্ত বৃটিশ রেসিডেন্ট (দূত) স্যার ডেভিড ওচটারলনি তার ১৩ জন ভারতীয় স্ত্রীকে নিজ নিজ হাতির পিঠে চড়িয়ে নিয়ে প্রতিদিন বিকেলে রাজধানীতে হাওয়া খেতে বের হতেন। (মাাসিক অন্য এক দিগন্ত, পৃ ১৩২-১৩৩)

হিন্দু নারীরাও বহু বিবাহের মালিক
হিন্দুধর্মে শুধু পুরুষরাই একাধিক বিবাহ করেনা। মহিলারাও একাধিক পুরুষকে জীবনসঙ্গী করতে পারে। প্রাচীন ভারতে এক নারীর একাধিক স্বামী বা বহুপতি প্রথা ছিলো খুবই সাধারণ একটি বিষয়। যেমন- মহাভারতের আদিপর্বে উদ্দালক পুত্র শে^তকেতুর কাহিনি: একদিন শে^তকেতু যখন পিতামাতার কাছে বসেছিলেন সেইসময় এক ব্রাহ্মণ এসে তার মায়ের সঙ্গে যৌনমিলন কামনা করে তাকে কক্ষান্তরে নিয়ে যায়। শে^তকেতু এতে ক্রুদ্ধ হয় কিন্তু পিতা উদ্দালক বলেন, ‘‘স্ত্রীলোক গাভীদের মত স্বাধীন। সহ¯্র পুরুষে আসক্ত হলেও তাদের অধর্ম হয় না- ইহাই সনাতন ধর্ম।’’ (ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, পৃ ১০৫) পঞ্চপা-ব ও দ্রৌপদীর কাহিনি তো সবারই জানা। দ্রৌপদীর বিবাহকালে ব্যাস বলেছিলেন, ‘স্ত্রীলোকের পক্ষে বহুপতি গ্রহণই সনাতনধর্ম’’। ধর্মসূত্রসমূহেও এর উল্লেখ আছে। আপস্তম্ভ ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে, ‘কন্যাকে কোনো বিশেষ ভ্রাতার হাতে দেয়া হয় না, ভ্রাতৃবর্গের হাতে দেয়া হয়।’ (ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, পৃ ৩৩) আজও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে দেখা যায়, পরিবারের সব ভাই সব মিলে এক নারীকে বিয়ে করেন। ওইসব পরিবারে একমাত্র বড়ভাই বিয়ে করে থাকেন। কনের দেবররাও তার স্বামী হিসেবে সমমর্যাদা প্রাপ্য।

বহুসন্তান
হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা।’’ অর্থাৎ পুত্র উৎপাদনের জন্যই ভার্যাগ্রহণ করা হয়। সেজন্য স্ত্রী পুরুষ উভয়েরই চরম আকাক্সক্ষা থাকত সন্তান লাভ করা। জরৎকারুমুনি যখন বহু বছর তপস্যায় নিযুক্ত থেকে ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন, তখন তাঁর সামনে তার পূর্বপুরুষরা আবির্ভূত হয়ে তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘‘বৎস, ব্রহ্মচর্য পরিহার কর। বিবাহ করে সন্তান উৎপাদন কর। তাতে আমাদের অশেষ মঙ্গল হবে।’’ এ কারণে বহুপুত্র লাভই সকলের পরম আকাক্সক্ষা হত। অগস্ত্য যখন বিদর্ভরাজকন্যা লোপামুদ্রাকে বিবাহ করেছিলেন তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘‘প্রিয়ে! তোমার অভিলাষ বল, তুমি আমার দ্বারা কতগুলো সন্তানের জননী হতে চাও, একটি, না একশত, না এক সহ¯্র ?’’ (ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, পৃ ৩৩)

আধুনিক ভারতে বহুসন্তান
ভারতে হিন্দুদের বেশি বেশি সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করতে ২০১৫ সালে পুরস্কারের ঘোষণা দেয় চরমপন্থী হিন্দুদের জঙ্গিবাদী সংগঠন শিবসেনা। সংগঠন ৫ সন্তান জন্ম দিলে হিন্দু পরিবার প্রতি ২ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। আগ্রার শিবসেনা ইউনিটের জেলা প্রধান ভিনু লাভানিয়া এ ঘোষণা দেন। ভিনু লাভানিয়া বলেন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যেসব হিন্দু পরিবার পাঁচ সন্তানের জন্ম দিয়েছে তাদের ২ লাখ রূপি করে দেয়া হবে। আর এ জন্য এসব পরিবারকে মিউনসিপ্যাল কর্পোরেশন থেকে জন্ম নিবন্ধন সংগ্রহ করতে হবে। শিবসেনার পক্ষ থেকে মুসলমান জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনটি একই সঙ্গে মুসলমান পুরুষদের বহু বিবাহ বন্ধে আইন করার আহ্বান জানায়। (দৈনিক ভোরের কাগজ, ঢাকা, রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০১৫)

ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ। এই একটি মাত্র দেশে জনসংখ্যা প্রায় দেড়শ কোটি। অন্যদিকে ৫৭টি মুসলিম দেশের লোকসংখ্যাও প্রায় দেড়শ কোটি। আয়তনে মুসলিম দেশসমূহ ভারতের চেয়ে প্রায় ১১ গুণ বড়। আয়তনের দিক বিবেচনা করলে ভারতের তুলনায় মুসলিম বিশে^র জনসংখ্যা হওয়া উচিত ছিলো দেড় হাজার কোটির ওপরে। অথচ তা হয়নি। হিন্দু ভারতের তুলনায় মুসলিমদেশসমূহে জনসংখ্যা অনেক কম। তারপরও বিজাতি-বিধর্মীরা প্রচার করে ‘হুজুররা, মুসলমানরা বেশি সন্তান নেয়’। মিথ্যাচারই তাদের বেসাতি।

হদিস:
১. ড. অতুল সুর: ভারতের বিবাহের ইতিহাস, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলিকাতা ৯, দ্বিতীয় মুদ্রণ পৌষ ১৪০২
২. কল্পনা ভৌমিক: কবীন্দ্র মহাভারত প্রথম খ-, বাংলা একাডেমী ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জুলাই ১৯৯৯
৩. বৃহত্তর বাকরগঞ্জের ইতিহাস, সংগ্রহ ও সম্পাদনায়: তপংকর চক্রবর্তী ও সিকদার আবুল বাশার, আনন্দধারা, প্রথম প্রকাশ, ১লা জানুয়ারি ২০০৪, বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০
৪. তপন কুমার দে: হিন্দু নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস, কথামেলা, একুশে বইমেলা ২০০৮, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০
৫। সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান, এমসি সরকার অ্যান্ড সন্স প্রা.লি. ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭৩, দশম সংস্করণ: বৈশাখ ১৪১৫
৬। ঋগে¦দ-সংহিতা [ প্রথম খ-], হরফ প্রকাশনী, এ-১২৬ কলেজ স্ট্রিট মার্কেট, কলকাতা ৭, পরিমার্জিত সংস্করণ ২০০৪
৭। হাসান শরীফ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, মাসিক অন্য এক দিগন্ত, মে ২০১৭, বর্ষ ১১, সংখ্যা-১
৮। কুমার সুশান্ত সরকার: হিন্দুদের গরু খাওয়া বৈধ ও বিবিধ সমালোচনা, নৃ-প্রকাশ, বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০, অষ্টম সংস্করণ: একুশে বইমেলা ২০১২

 

 

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: