বাবা হওয়ার অনুভূতি ও জুনিয়র বাপ্পির জন্মদিন | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

বাবা হওয়ার অনুভূতি ও জুনিয়র বাপ্পির জন্মদিন

15 March 2019, 11:04:57

বাপ্পি মজুমদার ইউনুস
গত বছরের আজকের এই দিনে মহান আল্লাহতালার ইচ্ছায় আমাদের ঘরকে আলোকিত করার জন্য এসেছেন প্রিয় সন্তান। বিশাল কষ্ট এবং আনন্দের মাঝে তাকে বরণ করে নেওয়া। কান্নার আওয়াজ যখন কানে আসে তখন হৃদয়ের ভিতর কি কম্পন সৃষ্টি হয়েছে তা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। আযানের ধ্বনিতে তাকে শুভেচ্ছা জানানো এবং মহান আল্লাহতালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

১৫ ই মার্চ, ২০১৮, সকাল ১১ টা ৫৫ মিনিট। আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনে আমি প্রথম বাবা হলাম। বাবা হওয়ার অনুভূতিটা আসলে লিখে ব্যক্ত করার মত নয়। এটা একটা অদ্ভুত স্বর্গীয় অনুভূতি। তারপরও এই অনুভূতিগুলো সবার সাথে শেয়ার করারও একটা আনন্দ আছে, সেই ইচ্ছা থেকেই এই লেখার অবতারণা। স্বর্গীয় অনুভূতি নিয়ে দু’চারটি কথা বলা আমার জন্য সৌভাগ্য।

জুলাই মাসের ২১ তারিখ রোজ শুক্রবার সড়ক দুর্ঘটনায় আমি প্রচন্ডভাবে আহত হই। ভেবেছিলাম আর কখনো হাটতে পারবো না কারণ আমার পা ভেঙ্গে আলাদা হয়ে যায়, শুধুমাত্র মাংসপেশিতে পা ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। পায়ের দুটি হাড় চরমভাবে ভেঙ্গে যায়। একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে এই ঘটনার সম্মুখীন হই। আমার শশুর শাশুড়ি এসে আমার পাশে দাঁড়ান, তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্সে করে সোনাইমুড়ী পপুলার হসপিটাল এ জরুরি বিভাগে ভর্তি করানো হয়। ডাক্তার মোস্তফা বানী আল রিক্কনের তত্ত্বাবধানে ছিলাম। জরুরী ভিত্তিক অপারেশন করানোর জন্য পরের দিন সকালে কুমিল্লা ট্রমা সেন্টার স্থানান্তর করা হয়। চারদিক অন্ধকার বিভীষিকাময়, মায়ের কান্না সহধর্মিণীর চোখের জল, শ্বশুর শাশুড়ির অনিশ্চিত চাহনি। সধ্য বিবাহিত জীবন চলছে আমাদের, পাঁচ মাস অতিবাহিত হল। একমাত্র আমার সহধর্মিনী তার দৃঢ় মনোবল সৃষ্টি করায় আমি একটু আশার মুখ দেখি কিন্তু রক্তের ব্যবস্থা না হওয়া এবং পায়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না আসায় বারবার অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসা। কি নিদারুণ কষ্ট। কিভাবে বুঝাবো। ২৫ শে জুলাইয়ের দিকে যখন ডাক্তারের কাছ থেকে নিশ্চিত হলাম যে আমি বাবা হতে যাচ্ছি, তখন প্রচন্ড রকম এক উত্তেজনা কাজ করছিল মনের মধ্যে। এত হাজারো কষ্টের মাঝেও এই সংবাদটি আমাকে আনন্দ দেয়। পৃথিবীতে সন্তানের আগমন হচ্ছে, সে আনন্দে আমি আত্মহারা অথচ বিছানায় পড়ে থাকা অসহায় মানুষটি আবেগ প্রকাশের মাধ্যম ভুলে গেছে। সন্তানের আগমনে স্বামী স্ত্রী দুজনেই খুবই আনন্দ থাকে এবং স্বামীর উপর দায়িত্ব বেড়ে যায় কিন্তু এ কঠিন সময়ে স্ত্রী পাশে থাকতে পারেনি। যেখানে তার সেবা-শুশ্রূষার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করার কথা, সেখানে প্রতিনিয়ত আমার জন্য কষ্ট করে যাচ্ছে আমার সহধর্মিনী।

দীর্ঘ নয় মাস আমার সহধর্মিনীর চোখে ঘুম ছিল না। সারারাত আমি যন্ত্রণায় কাতর থাকি এবং স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পাশে থাকেন। পরিচিত জনেরা অতিথির মত আসে আবার চলে যায় কিন্তু আমাদের এই অসহায় সময়ে দীর্ঘস্থায়ী পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। অর্থনৈতিক কষাঘাত, চিন্তা গ্রস্থ, ঘুমহীন রাত। সকল যন্ত্রনা মাঝেও একটি সুখ ছিল, আনন্দ ছিল, আশার প্রদীপ ভেসে ওঠে বারবার, আগত সন্তানকে বুকে ধারণ করার প্রচেষ্টা হৃদয় কে জাগিয়ে তুলেছে। শত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা মাঝেও এই শক্তি আমাদের একমাত্র বন্ধু ছিল। অনেক রাত নীরবে কেঁদেছে, আমি সব বুঝি কিছুই করার ছিল না আমার। জীবনের এই পথে এসে কখনোই এত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন আমি হইনি। এত কিছুর পরও মহান রব্বুল আলামীনের প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস এবং ভালোবাসা সমুন্নত রয়েছে। দুঃখ কষ্ট লাঞ্ছনা-গঞ্জনার পরেই সুখের পালা তা বিশ্বাস করতাম অকপটেই।

তার পর থেকেই আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব আমি আমার স্ত্রীর দিকে খেয়াল রাখতাম যেন গর্ভাবস্থায় তার যত্নের কোন ত্রুটি না হয়, একজন স্বামী হিসেবে সবারই এমন করা উচিৎ, কারণ এই সময়টায় মেয়েরা সবচেয়ে বেশী ফিল করে তার স্বামীর সাহচর্য। স্বামীর সঙ্গ মেয়েদের এই সময়টায় তার এবং তার গর্ভের সন্তানের মানসিক বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। মহান আল্লাহ তালার আশ্চর্য সৃষ্টি, সন্তান গর্ভে আসার পর শ্রবণ শক্তি পায়, তখন আমাদের আচার-আচরণ গুলো শুনতে পায়। এসময়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুন্দর বোঝাপড়া এবং মহান আল্লাহতালা বিধি বিধান অনুসারে চললে সন্তান সে ধারাগুলো অবলোকন করে। দ্বীনের প্রতি মনোনিবেশকারী এ ফল ভোগ করতে পারে। মহান আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মুসলিমকে দ্বীনের প্রতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তৌফিক দান করুক।

যাই হোক, এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। ডাক্তারের পরীক্ষামতে আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসার সময় ছিল ২১শে মার্চ, যা আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর ঠিক ১৮ দিন পরেই। তাই বিবাহ বার্ষিকী আসার পর থেকেই আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণ গণনা শুরু করেছিলাম। অবশেষে বিবাহ বার্ষিকীর ১২ দিন পর গত ১৫ই মার্চ পৃথিবীতে আগমন করে। সন্তান গর্ভে থাকাকালীন কয়েকজন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হয়। সর্বশেষ ডাক্তার ডাক্তার নুরুন নাহার এর তত্ত্বাবধানে থাকে। আমার অসুস্থতার কারণে নিয়মিত ডাক্তারি চেকআপ করানো যায়নি। তার জন্য আমি অনেক হতাশায় ছিলাম। আমাকে বাসায় একা রেখে কোথাও যেতে রাজি হয়নি। অনেক প্রতিবন্ধকতার পরেও মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ভালো রেখেছে এবং সন্তান সুস্থ ছিলেন।

১৫ই মার্চ গভীর রাতে স্ত্রীর ব্যথা অনুভব হতে থাকে এবং রাত সাড়ে তিনটায় ব্যথা বেড়ে যায়। এর পরপরই আমার কাছে ফোন আসে, তখন আমি কুমিল্লায় ছিলাম। ক্র্যাচারের মাধ্যমে একটু হাঁটাচলা করতে পারি। দেড় মাস হল বিছানা ছেড়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছে। ভোর রাতে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা শুনে বসে থাকতে পারেনি। পায়ের প্রচন্ড যন্ত্রণা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি, কোথাও কোনো যানবাহন নেই। আস্তে আস্তে হেঁটে কান্দিরপাড় পর্যন্ত এসে পৌঁছে, একটা রিকশা সাহায্যে বিশ্বরোড পর্যন্ত আসে তারপর একটা সিএনজি নিয়ে শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তারপরেও স্ত্রী পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পেরেছি তার জন্য ব্যথা ভুলে গিয়েছি। দুজন ধাত্রীর তত্ত্বাবধায়ন, ডাক্তার আব্দুল কাইয়ুম সহ উপস্থিত ছিল। এদিকে হসপিটাল নেওয়ার জন্য এম্বুলেন্সকে বলে রাখা হয়েছে। মহান আল্লাহতালার নিকট কোটি শুকর, কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই নরমাল ডেলিভারি হয়। যাই হোক সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আমাদের ছেলে প্রথম এই পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে। যখন প্রথম কান্নার আওয়াজ শুনলাম, আমার প্রথম প্রশ্নটা ছিল ডাক্তারের কাছে, “বাচ্চার মা সুস্থ আছে তো?” ডাক্তার যখন “হ্যাঁ” বললেন, তখন আনন্দের আতিশয্যে আমার দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরছিলো। এটা একটা অসাধারণ অনুভূতি যা শুধু ঐ ব্যক্তির পক্ষেই বোঝা সম্ভব যিনি নিজে এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যান, লিখে বা মুখে বর্ণনা করে এই অভিজ্ঞতা কাউকে বোঝানো সম্ভব না। আমাদের বাবুটা হওয়ার পর যখন পরিচিত সবাইকে ফোন করে জানাচ্ছিলাম খবরটা, তখন অনেকের সাথেই আমি কান্নার কারণে ঠিকমত কথা বলতে পারিনি। আমার বাবা-মা কে ফোন দিয়ে বললাম, আম্মা আব্বা আমি বাবা হয়েছি। একটু পরেই আজানের ধ্বনিতে মুখরিত হয় পুরো বাড়ি। স্ত্রী সন্তান দুজনেই সুস্থ ছিল। আলহামদুলিল্লাহ।

বাবু পৃথিবীর আসার আগেই পরিচিত জনেরা জানতে চাইত, আমাদের কি সন্তান হবে ছেলে না মেয়ে। আমি তো বলেছি আল্লাহই ভালো জানেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম করানোর আগে ডাক্তারকে বলে দিতাম আমার ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা জানার আগ্রহ আমাদের নেই। কথামতো ডাক্তারি বিষয় নিয়ে আমাদেরকে কোনো কিছু জানাতে না।

দুপুর বেলায় যখন সন্তানকে আমার কোলে তুলে দেওয়া হয়, সন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি আমার পায়ে ছিল না। বসে সন্তানকে খুলে নিলাম এবং তার কানে মহান আল্লাহতালার বানী প্রবেশ করালাম। সন্তানকে বুকে নেওয়ার পরেই আমার দেহে কোন ব্যথা ছিল না, আমি সম্পূর্ণ নিজেকে সুস্থ ভাবার চিন্তায় মগ্ন।

আমার সন্তান হওয়ার এই অল্প কিছুদিনের মধ্যে যে ধকলটা গেল আমার এবং আমার স্ত্রীর ওপর দিয়ে, তাতে করে আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি মা-বাবা হওয়া কতটা কষ্ট, কতটা চ্যালেঞ্জিং! মায়ের কষ্টের কাছে বাবার কষ্টগুলো কিছুই না, তারপরও বিভিন্ন প্রয়োজনে বাবাকে এই সময় যতটা ছোটাছুটি করতে হয়, সেটাও একেবারে ফেলনা নয়। এখন তো মাত্র ছেলেটা জন্ম নিল, সামনে আরো কত চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আমাদের দু’জনের জন্য! সবাই আমার ছেলে, আমার স্ত্রী এবং আমাদের পুরো পরিবারটির জন্য দোয়া করবেন যেন আমরা সব চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে পারি।

পাঁচ মাস বয়সে আমার সন্তান রোটা ভাইরাস আক্রান্ত হয়। প্রথমে ডাক্তারেরা রোগ নির্ণয় করতে পারেনি এবং সন্তানের উপর অনেক নিপীড়ন চালানো হয়। কটি হসপিটাল ট্রান্সফার করার পর, অবশেষে চাঁদপুর মতলব থানায় আই সি ডি ডি আর বি তে নেওয়ার পর আল্লাহর রহমতে সে সুস্থ হয়ে যায়। মতলব যাওয়ার আগে, আমার সন্তান যে কষ্টগুলো পেয়েছি তা বলে বোঝানো আমার পক্ষে সম্ভব না।

হাটি হাটি পা পা করে আজ প্রথম জন্মদিনে পদার্পণ করল আমার সন্তান। আপনাদের সকলের নিকট আমার সন্তানের জন্য দোয়া প্রার্থনা করছি।

নোট: আজকের এই পারিবারিক অনুষ্ঠানের অতিথি ছিল পাড়ার সকল ছোট্ট শিশুমনিরা।

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য:

x