যুবসমাজ-এর প্রতি খোলা চিঠি | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

যুবসমাজ-এর প্রতি খোলা চিঠি

1 July 2014, 5:45:09

 স্কো. লি. আহসান উল্লাহ (অব.)

 

প্রাণপ্রিয় যুবসমাজ,

 আমি এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক।’৬৯-এর গণ-অভ্যূত্থান ও ’৭০ এর নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং ’৭১এর মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল।‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’-এর সদস্য হওয়ার সুবাদে আমার জন্মস্থানে আমিই প্রথম মানচিত্র-খচিত জাতীয় পতাকা ওড়ানো স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পেয়েছিলাম। এটা ভাবলে ভালো লাগে! জীবনের শ্রেষ্ঠ বয়সটা  মুক্তিবাহিনী এবং বিমান বাহিনীতে কাজ করার মাধ্যমে দেশকে উৎসর্গ করে অবসর পেয়েছি। বর্তমান বয়স ষাটের বেশি। এখন হাতে কলম তুলে নিয়েছি। আমার প্রত্যাশা এবং এ সময়ের ভাবনাগুলো আপনাদের কাছে পেশ করার তীব্র ইচ্ছা অনুভব করছি। একটু ধৈর্য্য নিয়ে পড়বেন আশা করি।

(১)

যুগে যুগে বিশ্বের দেশে দেশে যত পরিবর্তন, সংস্কার ও বিপ্লব সাধিত  হয়েছে, তার প্রতি ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে সে দেশের যুবসমাজ। নেতৃত্ব এসেছে যুবকদের কাছ থেকে। পারস্যের সাইরাস দ্য গ্রেট, য়ুরোপের চার্লস দ্য গ্রেট, আফগানিস্তানের আহমাদ শাহ আবদালী, ল্যাটিন আমেরিকার সাইমন বলিভার, মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ফ্র্যাংকলিন থেকে হ্যামিল্টন, লিবিয়ার ওমর-আল-মোখতার, ভুটানের নগুয়াং নাগিয়াল, নেপালের পৃথ্বী নারায়ণ, ফিলিপাইনের জোসে রিজাল, ব্রিটেনের উইংফিল্ড ও চার্চিল, রাশিয়ার লেনিন, ট্রটস্কি ও বরিস ইয়েলৎসিন, চীনের সানইয়াতসেন ও মাও সেডং, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও চে-গুয়েভারা, ভিয়েতনামের হো চি মিন, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ইন্দোনেশিয়ার আহমেদ সুকার্নো, মিয়ানমারের অং সান, ভারতের এম কে গান্ধী, মালয়েশিয়ার টুংকু আবদুল রহমান, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির আলেন্দে, ফিলিস্তিনের ইয়াসীর আরাফাত, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যন্ডেলা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ যৌবনকালেই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন।

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসও যুবসমাজের গৌরবজনক ত্যাগে সমৃদ্ধ। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় টিপু পাগলা, হাজী শরীয়তুল্লাহ, তীতুমীর, ফকির মজনুশাহ, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সুর্যসেন, দেশবন্ধু সি.আর দাস, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রী অরবিন্দ, বিপিন পাল, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, এইচ. এম. সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, মওলানা ভাসানী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ যুব বয়সেই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। হাজার বছরের পরাধীনতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পাশাপাশি ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ বা ‘নিউক্লিয়াস’, বিএলএফ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন প্রভৃতি সংগঠনের ছাত্র ও যুবনেতাগন, যেমনÑ সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আসম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দস মাখন, কমরেড ফরহাদ, কমরেড সাইফুদ্দিন, কমরেড সিরাজ শিকদার ও কাজী জাফর আহমদ প্রমুখ সহÑ এদেশের যুবসমাজই নেতৃত্ব দানে ও ত্যাগে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

()

আমাদের সত্যিকারের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য এখনও ঔপনিবেশিকতার পর্দায় ঢাকা। যুব সমাজকে সেই পর্দা সরিয়ে, আমাদের ঐতিহ্যকে সম্যকভাবে জেনে উপলব্ধি করতে হবে। ব্রিটিশ শাসনামলের মধ্যভাগে বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের রাজনীতিতে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ব্রিটিশ আদলে আধুনিক রাজনীতি শুরু হয়। তখন থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারাও সঞ্চারিত হতে থাকে; যেমন: ব্রিটিশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক, ক্লাসিক্যাল সমাজতান্ত্রিক, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক  ও দেশজ ধারা। সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:

সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারা পাশ্চাত্যের উদার রাজনৈতিক চিন্তা এবং বৃটিশ উদারপন্থি সমাজ ও রাজনীতির সংস্পর্শে এসে উপমহাদেশের অভিজাত সম্প্রদায়ের (নবাব, জমিদার, আমলা, বণিক) এক গ্রুপ পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী ব্রিটিশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তারা এই রাজনীতি চর্চার মাধ্যমে স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতায় স্বপ্নাচারী হয়ে ওঠেন। গড়ে তোলেন ‘নিখিল ভারত কংগ্রেস’ (১৮৮৫ খৃ.) এবং ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ (১৯০৬ খৃ.)। এ দু’দলের নেতারা ছিলেন ইংল্যাণ্ডের অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ বা লিংকন্স ইন প্রভৃতি এবং ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তণ ছাত্র, যথাক্রমে: দাদাভাই নওরোজী, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, আনন্দ মোহন বসু, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, এম.কে.গান্ধী, ফিরোজ শাহ মেহতা, জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, সরোজীনী নাইডু, বাল গঙ্গাধর তিলক, এবং সৈয়দ আমীর আলী, মিয়া মোহাম্মদ শফি, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, চৌধুরী রহমত আলী, লিয়াকত আলী খান, প্রমুখ।

বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন (আওয়ামী লীগ) ও বিরোধী (বি.এন.পি) উভয় দল তারই উত্তরাধিকার বহন করে। তারা বৃটিশ সংসদীয় রাজনীতির ‘হাউস অব কমন্স’কে নকল করে এক ধরণের অদ্ভুত ব্যবস্থা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, যা এদেশের প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সামাজিক চাহিদার অনুপযোগী । গণতান্ত্রিক রাজনীতির ন্যূনতম সৌজন্য এবং মূল্যবোধও তারা দেখাতে পারছেন না। তাই আমাদের জাতীয় সংসদের  স্পিকারকে দুঃখ করে বলতে হয়Ñ সংসদ ‘মাছের বাজার’এবং ‘দুর্নীতির আড্ডাখানা’। যার ফলে বাংলাদেশের মাটি স্বাধীন হলেও সাধারণ মানুষ এখনো বৃটিশ উত্তরাধিকারী দলীয় রাজনীতির যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট তথা ‘অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার’ হাতে বন্দী এবং পরাধীন।

ক্লাসিক্যাল সমাজতান্ত্রিক ধারা ব্রিটিশ উদারবাদী রাজনীতির সুযোগে এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবে ভারতীয় অভিজাত সম্প্রদায়ের আরেক গ্রুপ মার্ক্স ও এঙ্গেলস- এর ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ অনুসারে  ‘ক্লাসিক্যাল সমাজতন্ত্রের ধারা’র অনুসরণে ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তারা তাসখন্দে ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে’ বসে গঠন করেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-সিপিআই’ (১৯২০/১৯২৫ খৃ.)। এ দলে ছিলেন মানবেন্দ্র নাথ রায়, ইভলিন রায়, অবণীনাথ মুখার্জী, আহমেদ হাসান, শফিক সিদ্দিকী, মন্দয় পার্থসারথী, তিরুমল আচার্য্য, মুজাফফর আহমেদ, শ্রীপাদ অমৃত ডাংগে, সিঙ্গারভেলু শেট্টিয়া, শওকত উসমানী, গোলাম হোসেন, নলিনী গুপ্তা, আরসি শর্মা, জ্যোতিবসু প্রমুখ। তারা এ উপমহাদেশে ক্লাসিক্যাল সমাজতন্ত্রকে জনপ্রিয় করেছেন সত্য কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বরং তাদের রাজনীতি মাঝে মাঝে গণবিরোধী ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ও ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে, তখনকার সিপিআই-এর ভূমিকা এবং ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের একাংশের (আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন, টিপু বিশ্বাস প্রমুখ) ভূমিকা ছিল সময় ও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে। তবে ক্লাসিক্যাল সমাজতান্ত্রিক ধারা সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বর্তমান বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ও বাম রাজনীতির ধারক-বাহকরাও এ ধারারই উত্তরাধিকার বহন করছেন। বাংলাদেশে এ ধারার রাজনীতি এখনও প্রবল তবে ক্ষয়িষ্ণু। রাজনৈতিক তাত্ত্বিকগণ ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্র এবং ক্লাসিক্যাল সমাজতন্ত্রের অনুকরণ করাকে বলেছেন ‘প্রথম ধারা’র রাজনীতি ।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ধারা ধর্মভিত্তিক (মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ প্রভৃতি) উগ্র সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণু একটি ধারাও উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। এরা কট্টর ধর্মীয় শাসন ও ধর্মভিত্তিক ‘তালেবানী’ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী। এ কারণে, আজও মাঝে মাঝে ভারতে (হিন্দু-মুসলিমও শিখ), পাকিস্তানে (সুন্নী-শিয়া ও অন্যান্য), মিয়ানমারে (বৌদ্ধ-মুসলিম) এবং শ্রীলংকায় (বৌদ্ধ-হিন্দু ও মুসলিম) সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এ ধারার উত্তরাধিকার বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতিতে বিদ্যমান। এরা মানুষের রক্তের উত্তরাধিকার, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা এবং জনগণের সামাজিক চাহিদার তোয়াক্কা না করে ধর্মের নামে রাজনীতি চর্চা করে। ফলে, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সব সময় দেশ, জাতি ও জনগণের বিরুদ্ধে যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ’৪৭ এর ভারত-পাকিস্তান-এর স্বাধীনতা এবং’৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এদের ভূমিকা ছিল গণ-বিরোধী। বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এখনো একই রকম বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ।

দেশজ ধারা বাস্বাধীনতা সংগ্রাম এসব রাজনীতির সমান্তরালে আরেকটি ধারা বিভিন্ন আদলে ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তর বাংলা, পাঞ্জাব, কাশ্মির, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তাঞ্চল (পাখতুনিস্তান), মিজোরাম, নাগাল্যাণ্ড প্রভৃতি প্রদেশে বিকাশ লাভ করে। এটা ছিল মূলত: দেশজ সংস্কৃতি, বিপ্লবাত্মক গোপন কর্মকাণ্ড এবং উপমহাদেশের তৎকালীন গণমুখী কর্মকাণ্ডের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা রাজনীতি। দেশীয়রা একে বলতেন ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’। বৃটিশরা বলতো: “বিদ্রোহ, সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ, নৈরাজ্যবাদ, উগ্রপন্থা, অনিয়ম” ইত্যাদি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, বাংলাদেশে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, মুসলিম তাঁতীদের বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, চাকমা-সাঁওতাল-চোয়াড়-খাসিয়া বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা আন্দোলন, ‘বঙ্গভঙ্গ’ বিরোধী ‘স্বদেশী-আন্দোলন’, ‘তেভাগা আন্দোলন’ প্রভৃতি ঔপনিবেশিকতা বিরোধী দেশজ ধারার রাজনীতি। তন্মধ্যে ‘অনুশীলন’ এবং ‘যুগান্তর’ নামের দু’টি গোপন বিপ্লবী সংগঠন উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্ষুদিরাম-সূর্যসেন-প্রীতিলতার সর্বোচ্চ ত্যাগ দেশীয় ধারার রাজনীতির প্রতি যুবসমাজের মধ্যে নতুন পথের দিশা দেয়। দেশবন্ধুর ‘স্বরাজ পার্টি’র কর্মকৌশল; ১৯৩৭ এর ‘বঙ্গীয় পরিষদ’ নির্বাচনে শেরে বাংলার ‘কৃষক-প্রজা পার্টি’র বিজয়; ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্নে রাসবিহারী বসু ও নেতাজীর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ (INA) গঠন; এবং ১৯৪০ সালে শেরে বাংলার ‘লাহোর প্রস্তাব’ ভিত্তিক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ‘বঙ্গদেশ’ গঠনের প্রস্তাব এই ধারার রাজনীতির ধারাবাহিকতার দৃষ্টান্ত। এ ধারারই উত্তরাধীকার ’৭১এর মুক্তিযুদ্ধ এবং তার প্রেক্ষাপট। এই দেশজ রাজনৈতিক ধারাকে তাত্ত্বিকগণ  বলেছেন, ‘দ্বিতীয় ধারা’র রাজনীতি ।

()

একই সময় বৃহত্তর বাংলায় অসাম্প্রদায়িক, সহনশীল ও মিশ্র সংস্কৃতির মূল ধারাকে পাল্টে দিয়ে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের চিন্তা-চেতনায় ব্রিটিশের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ কৌশলের  সাম্প্র্রদায়িকতার বীজ রোপিত হয়। সে সময় একদিকে হিন্দু নেতৃত্ব প্রধান সংকীর্ণতাপূর্ণ ‘কংগ্রেস’, অন্যদিকে মুসলিম নেতাদের নেতৃত্বে ‘মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে কার্যত: ‘কংগ্রেস’ হিন্দু ও ‘মুসলিম লীগ’ মুসলমান সম্প্রদায়ের দল রূপে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফলে সমাজের ভেতরে সৃষ্টি হয় হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ। ১৯০৯ সালে ‘মর্লি-মিন্টো’ সংস্কারের মাধ্যমে পৃথক ‘নির্বাচনী ব্যবস্থা’ (separate electorate) প্রবর্তিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের মানুষ পায় ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ এবং ’৪৭ এর ভারত বিভক্তি। জন্ম নেয় কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারত বা হিন্দুস্তান। এ বিভক্তি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উস্কে দেয় এবং দেশ ছাড়া করে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে। বিশেষ করে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে বাঙালির দেশজ বা  ‘দ্বিতীয় ধারা’র রাজনীতি তথা ‘জাতি-রাষ্ট্র’ অর্জনের আন্দোলন পিছিয়ে যায় আরো দু’যুগ।

’৪৭ এর তথাকথিত স্বাধীনতা ও অকার্যকর রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টি দেশজ ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে’র রাজনৈতিক ধারাকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও ‘৪৮Ñ’৫২’র ভাষা আন্দোলন সেই বাধা অতিক্রম করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার থেকে জাতীয় স্বাধীনতা লাভের চিন্তাকে জাগ্রত করে।’৫৭ সনে কাগমারি সম্মেলনে মাওলানা ভাসানীর ‘আস্সালামু আলাইকুম’ বলে পাকিস্তানকে বিদায় ঘোষণা এবং ’৬১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্তৃক পূর্ববাংলাকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে গোপন সংগঠন ‘পূর্ব বাংলা মুক্তিফ্রন্ট’ গঠন; চিত্ত রঞ্জন সূতার ও রুহুল কুদ্দুসকে নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টা; এ লক্ষ্যে ’৬২ সালে বঙ্গবন্ধুর আগরতলা গমন; সেখান থেকে ব্যর্থ হয়ে বাড়ী ফিরেই তিনঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার হওয়া; পরে এই সূত্র ধরেই তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানো, প্রভৃতি কাজ ও ঘটনা তখনকার যুবসমাজকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা যোগায়।

()

অতীতের ব্যর্থতার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, তারই ধারাবাহিকতায় সিরাজুল আলম খানের উদ্যোগে ১৯৬২ সালে গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ বা  ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ এবং পরবর্তীতে ‘বিএলএফ’ ও ‘জয়বাংলা বাহিনী’ গঠিত হয়। স্বাধীনতা অর্জনকে মাথায় রেখে ’৬২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত সকল আন্দোলন এবং সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করার কর্ম-উদ্যোগ দ্বিতীয় ধারার রাজনীতিকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।’৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনের দীর্ঘ গোপন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয় এবং ‘ব্যতিক্রম হিসেবে সফলতা অর্জন করে’। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ  ৯২২ বছরের (১১৫০-১৯৭১খৃ.) মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ অর্জন। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনা-নৌ-বিমান বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও ‘ইউওটিসি’র সদস্যগণ, বেসামরিক কর্মচারী, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও যুবসমাজ এবং সহযোগিতাকারী আপামর জনতার প্রতিটি ব্যক্তিই দেশজ বা ‘দ্বিতীয় ধার’র অনুসারী। এরা দেশে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ‘প্রথম ধারা’র মত শক্তিশালী কোন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন এদের মধ্যে আজও গড়ে উঠেনি। এ কারণে রাজনৈতিক শক্তি রূপেও দানা বাঁধেনি। তাই দেশ এখনও চলছে ব্রিটিশ-পাকিস্তানী নিয়ম-নীতির আদলে।

সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা ব্রিটিশ-পাকিস্তানী নিয়মনীতি বলবৎ রেখে স্বাধীন দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের আত্মদানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলছে। সমাজে উন্নয়নধর্মী কাজের চেয়ে অসামাজিক কাজ যেমনÑ গুপ্তহত্যা, খুন, গুম, দখলদারী, চাঁদাবাজী, ছিনতাই, ধর্ষণ ঘটছে বেশি। দেশের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ সংঘাতময় পরিস্থিতি বিদ্যমান।  আদর্শ ও নীতিবোধের দোহাই দিয়ে কোন অসামাজিক কাজকেই রোধ করা যাচ্ছে না।  বিচার ব্যবস্থাও এসব অনৈতিক কাজের জন্য নামমাত্র শাস্তি প্রদান করেই দায়িত্ব শেষ করছে। দলীয় রাজনীতির নামে সর্বত্র অপরাজনীতি ও দলবাজি চলছে। যে দল যখন সরকারে আসে সে দলই তখন লুটপাট, জবরদখল ও দলবাজিতে মেতে উঠে। দেশের রাজনীতির এ রুগ্নতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন ওষুধ প্রয়োগে কাজ হবে না, অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে পচন ধরা জিনিসগুলো কেটে ফেলতে হবে। বিশেষ করে যারা দেশে লুটপাটের রাজনীতি কায়েম করেছে তাদের দেশের রাজনীতি থেকে ছেঁটে ফেলতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে বর্তমানে দেশে যা চলছে তা দিয়ে আর যাই হোক দেশের কোনো ধরনের কল্যাণ সম্ভব নয়। ফলে দেশটি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বদলে বিশাল প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। এমতাবস্থায়, একটা স্বাধীন দেশের কল্যাণের জন্য দরকার স্বাধীন দেশের উপযোগী শাসন কাঠামো এবং যুগোপযোগী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। যার আঙ্গিকে স্বাধীন দেশটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়।

()

বর্তমানে বাংলাদেশে সাড়ে সাত কোটি কিশোর-যুবসমাজ রয়েছে, যার অধিকাংশই বেকার এবং হতাশাগ্রস্ত। ২০২১ সালে হবে ৮ কোটি ১৫ লাখ, ২০৩০ সালে হবে আরো বেশি। অর্থাৎ আগামী দশ-বারো বছরে আট কোটি লোকের কর্মসংস্থান জরুরী হয়ে পড়বে। এই বিশাল যুবসমাজকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা বড় দলগুলোর কারো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কর্মসূচীতে নেই। এমতাবস্থায়, আমাদের যুবসমাজ অভিভাবকহীন। এই অভিভাবকহীন যুবসমাজকেই বুঝতে হবে যে, টিকে থাকার স্বার্থে স্বাধীন দেশটিকে গড়ে তোলার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজেদেরকে পরিচালিত হতে হবে। যুবশক্তি হিসেবে দেশকে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র কাঠামো, শাসনপদ্ধতি এবং উন্নত সমাজ নির্মাণের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে আপনাদেরও কর্মসংস্থান হবে। এজন্য প্রয়োজন একটি সঠিক রাজনৈতিক তত্ত্ব এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে দেশ ও সমাজ উন্নয়নের কর্মসূচি নির্ধারণ করা। বর্তমান হতাশাজনক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের গড়ে তোলার বিষয়টি জরুরি বিবেচনায় এনে এ বিশাল দায়িত্ব প্রিয় যুবসমাজ, আপনাদেরকেই নিতে হবে।

আপনাদের সামনে বর্তমানে যে দু’টো ধারা বিদ্যমান তার কোন্টি আপনারা বেছে নেবেন: প্রথম না কি দ্বিতীয় ধারা; পাশ্চাত্যের নকলবাজী, না কি অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা মুক্ত সত্যিকার স্বাধীনতাকামী দেশজ ধারা? এটি সঠিকভাবে বাছাই করে একটি যথার্থ সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন গড়ে তুলে তার ভিত্তিতে সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে সক্রিয় হতে হবে এবং সোচ্চার আন্দোলন ও সংগ্রাম করে বর্তমান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে।

এটা প্রত্যাশিত যে, আপনারা স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় ধারার রাজনীতির সফল উত্তরসূরী হতে চাইবেন।  আপনাদের পূর্বসূরী ’৬০-এর দশকের যুবসমাজ ও যুব-নেতৃত্ব স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ এনেছেন। এর ফলে পৃথিবীতে আজ আমরা বাঙালি ও বাংলাদেশী হিসেবে মাথা উঁচু করে চলি। এখন, বর্তমান যুব সমাজ, আপনাদের  দায়িত্ব হলো স্বাধীন দেশটাকে আপনাদের ও আপনাদের পরের প্রজন্মের বাসযোগ্য করা। সে লক্ষ্যে স্বাধীন দেশের উপযোগী রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা; জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণে একটি আধুনিক রাষ্ট্র, উন্নত সংস্কৃতি, উন্নত জীবন গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা। যুবসমাজকে জনশক্তিতে পরিণত করার জন্য উপযুক্ত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারকে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা। নিজেদেরকে আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে এবং বিশ্ব নাগরিক হওয়ার যোগ্য করে গড়ে তোলা। আগামী দশক নাগাদ আপনাদের প্রত্যেকে যেন স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করার মতো আয়-রোজগারের সুযোগ পান। দেশ, জনগণ ও জাতির উন্নয়নই যেন আপনাদের চিন্তায় প্রাধান্য পায়।  আপনাদের প্রত্যেকেই যেন আত্মকর্ম সংস্থানে উদ্যোগী (বহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎ) হতে পারেন এবং বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে পারেন। সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে শাসন-শোষণের পরিবর্তে নিজেদের কাতারভুক্ত করার মনোভাব পোষণ করে, সে লক্ষ্যে নিজেদের পরিচালিত হতে হবে।

’৫২,’৬৯,’৭০ এবং’৭১ এর মত সমগ্র জাতি তাকিয়ে আছে যুবসমাজের দিকে। দেশ ও জনগণের ভবিষ্যত মূলত আপনাদেরই হাতের মুঠোয়। আপনারা সক্রিয় হলে দেশ এগুবে, নিষ্ক্রিয় থাকলে দেশ পিছাবে। আপনারা যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে আপনাদেরকেই দাঁড়াতে হবে ইতিহাসে অপরাধীর কাঠগড়ায়। কাজেই বাংলাদেশের যুবসমাজকে নতুন চিন্তার আলোকে, রাজনীতির নতুন ভাবনায় বলীয়ান হয়ে, মুক্তিযুদ্ধকালীন দুর্জয় সাহসী ঐক্য নিয়ে, নিজস্ব সংস্কৃতির বলয়ে দেশ পরিচালনায় স্বাধীন দেশের উপযোগী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি শ্রম-কর্ম-পেশার প্রতিনিধি নিয়ে সকল নাগরিকের দেশ শাসন বা পরিচালনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে আমরা যেন দ্রুত উন্নতি অর্জন করতে পারি। এ ব্যাপারে আমি মনে করি, আমাদের যুবসমাজ, আপনারা মুক্ত মন নিয়ে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সিরাজুল আলম খান-এর ১৪ দফা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি অধ্যয়ন করে দেখতে পারেন। তবে, এসবের চেয়ে উন্নত কোন কর্মসূচি যদি খুঁজে পান বা প্রণয়ন করতে পারেন তবে আরো ভালো। এটি আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত।

আপনাদেরকে সংগ্রামী স্যালুট জানিয়ে শেষ করছি। 

 

=***=

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: