শিরোনাম
◈ ক্ষমতার পতন ও অপেক্ষার মিষ্টি ফল-মহসীন ভূঁইয়া ◈ নাঙ্গলকোটে দুই গ্রামের মানুষের চলাচলের প্রধান রাস্তাকে খাল বানিয়ে নিরুদ্দেশ ঠিকাদার! ◈ নাঙ্গলকোটের তিনটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের টিম ◈ নাঙ্গলকোটে শত বছরের পানি চলাচলের ড্রেন বন্ধ ,বাড়িঘর ভেঙ্গে ২’শ গাছ নষ্টের আশংকা ◈ পদ্মা সেতুর রেল সংযোগে খরচ বাড়লো ৪ হাজার কোটি টাকা ◈ অরুণাচল সীমান্তে বিশাল স্বর্ণখনির সন্ধান! চীন-ভারত সংঘাতের আশঙ্কা ◈ কুমিল্লার বিশ্বরোডে হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ইউলুপ- লোটাস কামাল ◈ দুই মামলায়খালেদার জামিন আবেদনের শুনানি আজ ◈ মাদকবিরোধী অভিযানএক রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১১ ◈ নাঙ্গলকোটে চলবে ৩ দিন ব্যাপী মাটি পরীক্ষা

রমযানের রোজা: চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা- মুহা. জাকারিয়া শাহিন

১৩ মে ২০১৮, ১০:৫৬:২১

পৃথিবীতে একমাত্র বিজ্ঞানময় ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। যা সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। এধর্মের বিধানাবলী যেমন সহজ-সুন্দর, অনুগত-অনুকরণীয় তেমনি আত্মিক-দৈহিক, ইহলৌকিক-পরলৌকিক যাবতীয় কল্যাণ ও চিরশান্তির মূল উৎস। আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন, গবেষণা, সকল তথ্য-উপাত্ত, মন্ত্র-তন্ত্র এ ধর্মের কাছে স্তব্ধ হচ্ছে। বর্তমানে এ ধর্মের আদেশ-নিষেধ, উপদেশ ও মৌলিক বিধানাবলী নিয়ে চলছে সূচারুভাবে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও গভীর গবেষণা। তাতে খুঁজে পাচ্ছে নানান তথ্য-উপাত্ত ও বিজ্ঞান ভিত্তিক সকল জটিলতার সমাধান। পাশ্চাত্যের ২২ জন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইসলাম ধর্মের অন্যতম বিধান রোজা বা উপবাস থাকা স¤পর্কে গবেষণা করে বিস্মিত হয়েছেন। ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি স্তম্ভ হল রোজা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা দ্বিতীয় হিজরীতে মুসলমানদের উপর আরবি রমজান মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা ফরজ করেছেন। রোযা রাখার ব্যাপারে ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম হচ্ছে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৈহিক মেলামেশা ও পানাহার ত্যাগ করা।


পৃথিবীতে অনেক ধর্মে উপবাস বা রোজা রাখার বিধান থাকলেও মুসলমানদের রোজার সাথে ইহার রয়েছে ব্যাপক তফাৎ। নিয়ম-পদ্ধতি, গুণগত বৈশিষ্ট্যে মুসলমানদের রোজা মানব জীবনের সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। মুসলমানদের রোজার মধ্যে রয়েছে সাহরী গ্রহণ ও ইফতার; যা স্বাস্থ্যের জন্য মহৌষধ। এটি অন্য কোন ধর্মে নেই। হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করছেন- তোমরা সাহরী খাও। কেননা সাহরী খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে (বুখারী ও মুসলিম)। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইফতার ও সাহরীর তাৎপর্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। রোজার সকল বিধানাবলি স্বাস্থ্যরক্ষার দিকে লক্ষ্য করেই নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন- শিশু ও অতি বৃদ্ধের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে।
ইসলাম ধর্মে রোজা রাখার বিধানটি আরবী রমজান মাসের সাথে স¤পৃক্ত। রমজান শব্দটির শাব্দিক অর্থের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখব রমজান শব্দটি আরবী ভাষা “রম্জ’ শব্দ থেকে উৎকলিত। এর অর্থ দহন করা, জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে ফেলা, নিঃশেষ করা। প্রকৃতপক্ষে অর্থগুলোর বাস্তবিকতা প্রমাণ করছে রাসূল (সা.) এর অমিয় বাণীতে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখে তার পূর্বের সমুদয় গুনাহ মাফ করা হয়’’। (বুখারী, মুসলিম) আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও অর্থগুলোর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপলব্ধি করছে। তারা বলছে, রোজা বা উপবাস যাপন শরীরের বিষাক্ত পদার্থগুলোকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নির্মম করে ফেলে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামনীষী, দার্শনিক, গবেষক ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা মানবদেহের জন্য মহা প্রতিষেধক বা মহৌষধ। জগদ্বিখ্যাত সকল বৈজ্ঞানিক ও বিশেষজ্ঞেগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে মুসলমানদের উপবাস থাকার পদ্ধতি বা রোযা রাখা শারীরিক অসুস্থতা ও রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষার জন্য এক মহাপ্রতিকারক। এ জন্যই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণ পুরুষ রাসূল (সা.) ঘোষণা করেছেন যে, তোমরা জিহাদ কর, গণীমত-প্রাচুর্য লাভ করবে। রোজা রাখ, সুস্থ থাকবে। সফর কর, ধন সম্পদের অধিকারী হবে। (সহীহ বুখারী)।
রোজা স¤পর্কে আমেরিকার আধুনিক চিকিৎসাবিদগণ মনে করেন- বছরের কিছু সময় মানুষের জন্য এভাবে অতিবাহিত করা উচিত। যেন এটি ডায়েটিং করে স্বীয় হজম পদ্ধতি (উরমবংঃরাব ঝুংঃবস) কিছু সময়ের জন্য অবসর রাখে। এভাবে তার মধ্যে বিদ্যমান আর্দ্রতা যা সময় সাপেক্ষে বিষে পরিণত হয়- রোজা রাখার দ্বারা তা নিঃশেষ হয়ে যায়। আর রোজা রাখার মাধ্যমে যকৃত চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিশ্রাম পায়।
কায়রো থেকে প্রকাশিত ঝপরবহপব ঋড়ৎ ঋধংঃরহম গ্রন্থে পাওয়া যায়- পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদগণ একযোগে স্বীকার করেছেন যে, ঞযব চড়বিৎ ধহফ বহফঁৎধহপব ড়ভ ঃযব নড়ফু ঁহফবৎ ভধংঃরহম পড়হফরঃরড়হং ধৎব ৎবসধৎশধনষব; অভঃবৎ ধ ভধংঃ ঢ়ৎড়ঢ়বৎষু ঃধশবহ ঃযব নড়ফু রং ষরঃবৎধষষু নড়ড়স ধভৎবংয অর্থাৎ- রোজা রাখা অবস্থায় শরীরের ক্ষমতা ও সহ্যশক্তি উল্লেখযোগ্য। সঠিকভাবে রোজা পালনের পর শরীর প্রকৃতপক্ষে সজীবতা লাভ করে।
আধুনিক বিশ^বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বিজ্ঞ প-িতগণ রোজা বা উপবাস সম্পর্কে ইতিবাচক মত পোষণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
ডাক্তার লুটজানারের মতে, খাবারের উপাদান থেকে সারা বছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস। উপবাসের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে দহনের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থ সমূহ দগ্ধীভূত হয়ে যায়।
ডা. জুয়েলস এম. ভি. বলেছেন, যখনই একবেলা খাওয়া বন্ধ থাকে তখনই দেহ সেই মুহূর্তটাকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত রাখে।
ড. ডিউই বলেছেন, রোগে জীর্ণ-কিষ্ট মানুষের পাকস্থলী হতে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেলে। তুমি দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না। সত্যিকার রূপে উপবাস থাকছে রোগটি। তাই একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা রোগীদের তিন সপ্তাহের জন্য উপবাস পালনের নির্দেশ দিতেন।
জার্মানির এক স্বাস্থ্য ক্লিনিক এর গেটে লেখা আছে, “রোযা রাখ, স্বাস্থ্যবান হবে” এর নিচে লেখা আছে যে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী গধপভধফফবহ বলেন, একজন ব্যক্তি যত বেশি রোজা রাখে তার বুদ্ধি-প্রজ্ঞা তত প্রখর হয়।
ডা. এ. এম. গ্রিমী বলেন, রোজার মাধ্যমে শরীরের বিশেষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ডাক্তার কিম তাঁর ঋধংঃরহম ভড়ৎ যবধষঃয প্রবন্ধে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ (হাঁপানি), মাথাব্যথা, অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষতিকর নয় এমন টিউমার ইত্যাদি। তিনি বলেন বিশেষতঃ খাদ্যনালী পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াতে তার দেহে ক্ষয়ে যাওয়া টিস্যু তৈরি হতে না পারার কারণে অর্থপাচ্য আমিষ খাদ্য নালী শোষণ করে দুরারোগ্য (অঁঃড়, ঁহবফরংবধংব) সব ব্যধির সৃষ্টি হয়।
অধ্যাপক বি. এন. নিকেটন দীর্ঘায়ু লাভের এক গবেষণা রিপোর্টে তিনটি কাজের কথা বলেন। এগুলো হলো ১. পরিশ্রম করা ২. নিয়মিত ব্যায়াম করা ৩. প্রতিমাসে কমপক্ষে একদিন রোজা বা উপবাস থাকা।
ডা. লুইস ফ্রন্ট বলেন, “রোজা পালনে মানব দেহ যথেষ্ট পুষ্ট ও বলিষ্ঠ হয়ে থাকে। মুসলমানরা নিশ্চয়ই রোজার মাসকে সুস্বাস্থ্যের মাস হিসেবে গণ্য করে থাকে। রোজা বা উপবাস মেধাশক্তিকেও বৃদ্ধি করে থাকে।
ডা. নিধন চন্দ্র রায় বলেন, “রোজাকে সুন্দর একটি পবিত্র ঔষধ বললে ভুল হবে না।
ভারতের নেহেরু গান্ধী গোটা জীবনে রোজায় অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদেরকে বলেন, রোজার মাধ্যমে আত্মসংযম বাড়ে ও মানবাত্মা পবিত্রতা অর্জন করে।
বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার নুরুল ইসলাম বলেছেন, রোজা মানুষের দেহে কোন প্রকার ক্ষতি করে না। গ্যাস্ট্রিক, আলসারের রোগীদের রোজা নিয়ে যে ভীতি আছে তা ঠিক নয়, কারণ রোজা এসব রোগের কোন ক্ষতি করে না বরং উপকার করে।
১৯৫৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তার গোলাম আযম সাহেব কর্তৃক ‘মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব’ স¤পর্কে যে গবেষণা জানানো হয় তাতে প্রমাণিত হয় যে রোজার দ্বারা মানব শরীরের কোন ক্ষতি হয় না বরং কেবল ওজন সামান্য কমে। ১৯৬০ সালে তাঁর গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করে রোজা দ্বারা পেটের শূলবেদনা বেড়ে যায় তাদের এ ধারণা নিতান্তই অবৈজ্ঞানিক। কারণ উপবাসে পাকস্থলীর এসিড কমে এবং খেলেই এটা বাড়ে। এ অতি সত্য কথা অনেক চিকিৎসকই চিন্তা না করে শূলবেদনা রোগীদেরকে রোজা রাখতে নিষেধ করেন। আমি ১৭ জন রোজাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখেছি যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড বেশি বা কম রোজা রাখার ফলে তাদের এই উভয় দোষই নিরাময় হয়েছে।
বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে আমরা যদি জ্ঞান সমুদ্র ইসলামের আদর্শ ও বিধানাবলীকে আঁকড়ে ধরি তাহলে অতি শীঘ্রই পৃথিবীতে আমরা হব একমাত্র শান্তিপূর্ণ জীবনের অধিকারী।
তাই পরিশেষে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয় যে, মানব দেহকে নিরোগ-নিটোল, সুস্থ- সাবলীল ও সজীব-সতেজ রাখতে হলে রোজা রাখার প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। আসুন, আমরা সকলে মিলে রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’য়ালার বিধান পালন করি। আল্লাহ তাআলা সকলকে সুস্থতার সহিত স¤পূর্ণভাবে রমজানের রোজা সমূহ পালন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

 

লেখক: ইসলামী গবেষক
মুহা. জাকারিয়া শাহিন
ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: