শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শিক্ষকের ভূমিকা- আফজাল হোসাইন মিয়াজী | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শিক্ষকের ভূমিকা- আফজাল হোসাইন মিয়াজী

27 May 2016, 10:00:53

সমাজ ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা এই তিনটির সাথে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। আজকের ছাত্র আগামী দিনে জাতির কর্ণধার।শিক্ষক মূল্যবোধ বিনির্মাণের আদর্শ কারিগর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূল্যবোধ চর্চার অনন্য কারখানা।কবি বলেছেন 
"লক্ষ আশা অন্তরে 
ঘুমিয়ে আছে মন্তরে
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা
সব শিশুরই অন্তরে।"

আমাদের আগামীদিনের প্রজন্ম যাতে সু-নাগরিক হিসেবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে সক্ষম হয়, তার জন্যও তাদের মাঝে মূল্যবোধ শিক্ষার প্রসার করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আর মূল্যবোধ লালন ও বিকাশের জন্য প্রয়োজন আদর্শের পতাকাবাহী মূল্যবোধের মূর্ত প্রতীক শিক্ষক ও শিক্ষক সমাজ। শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধে সৃষ্টিকরে প্রকারান্তরে সমাজ ও দেশকে মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পারে। একমাত্র শিক্ষকই পারেন ছাত্র ও সমাজের মাঝে মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে। 
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে মূল্যবোধ কী?

দৈনন্দিন সমাজ জীবনে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আচরণ যে নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, আমরা সেগুলোকেই সামাজিক মূল্যবোধ বলে আখ্যায়িত করতে পারি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শৃংখলা, ঐক্য প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক নির্নয় সামাজিক মূল্যবোধ দ্বারাই সম্ভব। দেশে দেশে ও সমাজে সমাজে সামাজিক মূল্যবোধের রূপও ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। দেশ, জাতি, সমাজ, কাল ও প্রকৃতিভেদে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে থাকে। যা ভালো, যা ব্যক্তি ও সমাজের পক্ষে কল্যাণকর, তার মূল্য আছে। ধর্ম, বিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা, জীবন দর্শন, রাজনৈতিক আদর্শ, যা আমাদের সমাজ সংস্কৃতিকে লালন করে থাকে সেসবই আমাদের মূল্যবোধের অন্তর্গত।বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানি স্টুয়ার্ট সি, ডাজ বলেছেন, “সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে ঐ সব রীতি-নীতির সমষ্টি, যা ব্যক্তি সমাজের নিকট হতে আশা করে এবং যা সমাজ ব্যক্তির নিকট হতে লাভ করে।

সমাজ বিজ্ঞানী বেসারের মতে-“সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সেসব গুণাবলী যা ব্যক্তি নিজের সহকর্মীদের মধ্যে দেখে খুশি হয় এবং নিজের সমাজ, জাতি, সংস্কৃতি ও পরিবেশে মূল্যবান মনে করে খুশি হয়।”
একমাত্র শিক্ষাই সমাজে মূল্যবোধ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা শিক্ষা ছাড়া আচার-আচরণে বিনয়ী ও নম্র হওয়া যায় না। শিক্ষা বিনয়ী হতে শিখায়,নম্র হতে শিখায়, ভদ্র হতে শিখায়। শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজের মাঝে নীতি-নৈতিকতা ও সততার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, “শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের আবিস্কার।”

এরিস্টটলের ভাষায়. “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।”সমাজে সে সমস্ত শিক্ষক, শিক্ষা ও মূল্যবোধ বিকাশে ভূমিকা রাখবেন তাদেরকেও সেমানের হতে হবে। একমাত্র আদর্শ শিক্ষকই পারেন শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সমাজে নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর মানসিক ও শারীরিক দুঃখ, ব্যথা, প্রয়োজন ও অসহায় অবস্থার কথা আন্তরিকভাবে উপলব্দি করবেন এবং এই গুলোর উৎকর্ষ সাধনে ব্রতী হবেন এটাই স্বাভাবিক।
শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের থাকবে অগাধ ভালোবাসা ও সহানুভূতি। সব শিক্ষার্থীকে তিনি ভালোবাসবেন। তাঁর ভালোবাসার স্পর্শ থেকে কোন শিক্ষার্থী বঞ্চিত হবেন না। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে পাপ থেকে পরিত্রাণ করে জাগতিক কল্যাণের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। চিনের প্রাচীন ও সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা কনফুসিয়াস বলেছেন-“শিক্ষক হবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস। তিনি হবেন একজন আদর্শ শাসক”।

দার্শনিক প্লেটোর মতে, “শিক্ষক হবেন ভাববাদী চিন্তার প্রত্যক্ষ ফসল, শিক্ষার মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করবেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হলো শিক্ষকের দায়িত্ব।”শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর বন্ধু, সহায়ক ও যোগ্য পরিচালক। শিক্ষার মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীর শারিরীক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের উপর গুরুত্ব আরোপ করবেন।

ফ্রেডরিক ফ্রয়েবেলের মতে-“শিশু হলো উদ্যানের চারাগাছ। শিক্ষক হলেন তার মালী। শিক্ষকের কাজ হলো সযত্নে চারাগাছটিকে বড় করে তোলা। শিশুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৎ ও সামাজিক গুণাবলীর বিকাশসাধন করা শিক্ষকের কর্তব্য”।যুগে যুগে পরিবার ও সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পিছনে শিক্ষক সমাজই ভূমিকা পালন করে আসছেন।

বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) ছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি মানুষের জন্য শিক্ষক হিসেবেই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনই মহানবী (সাঃ)এর চরিত্রের দৃষ্টান্ত। আরবের মাটিতে মুসলমানদের প্রথম শিক্ষক ছিলেন মহানবী। মদিনার মসজিদে তিনি সাহাবীদের কোরআন, নামাযও মূল্যবোধের শিক্ষা দিতেন। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় আল্লাহ্ বাণী বুঝিয়ে দিতেন। প্রয়োজনবোধে কঠিন বিষয় তিনবার উচ্চারণ করে সকলের বোধগম্য করে তুলতেন।

দার্শনিক ইমাম আল গাজ্জালী শিক্ষক সম্পর্কে বলেছেন-“শিক্ষক সর্বদা ছাত্রদের আদর্শ হিসেবে কাজ করবেন, শিক্ষার্থীকে সর্বদা দুষ্ট সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামনে সহকর্মী শিক্ষক সম্পর্কে কোন বিরূপ মন্তব্য বা সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শিক্ষক কখনো শিক্ষার্থীর অসাধুতা সহ্য করবেন না।

শিক্ষক -ছাত্রের সম্পর্ক থাকবে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ন্যয়।
শিক্ষক মূল্যবোধের মূর্ত প্রতীক।শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষক হলেন জাতির দিক নির্দেশক, মূল্যবোধ বিকাশের প্রধান সেনাপতি। শিক্ষক হলেন মূল্যবোধ সৃষ্টির নিপুণ শিল্পী। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষকতা হলো ব্রত, সাধনা। এ পেশার সফলতা ও সার্থকতা নির্ভর করে শিক্ষকের নৈতিক গুণাবলীর উপর এবং শিক্ষকের দক্ষতা, যোগ্যতা, বুদ্ধি, বিচার কৌশল এবং ব্যক্তিত্বের উপর।

শিক্ষক হলেন মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাঁকে কেন্দ্র করেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। শিক্ষার্থীর মাঝে মূল্যবোধের প্রসার তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। শিক্ষককে বাদ দিয়ে সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাঁকে বাদ দিয়ে কোন নৈতিক শিক্ষাও পরিপূর্নতা আসতে পারেনা। তিনিই মূল্যবোধও নৈতিকতা শিক্ষা দেন। শিক্ষক যদি শ্রেণীকক্ষে এবং বাইরে মূল্যবোধ সৃষ্টি অব্যাহত না রাখেন তাহলে সমাজে দেখা দিবে মূল্যবোধের শূণ্যতা। একমাত্র আদর্শ শিক্ষকই পারেন এ কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে।আমাদের দেশে দিন দিন অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শিক্ষক পাঠদান করছেন। কিন্তু তরপরও মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে।

বিভিন্ন কারণেই শিক্ষক সমাজ প্রত্যাশিত শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। শিক্ষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষক সমাজ এ ব্যাপারে যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারবেনা বলেই সচেতন মহল মনে করেন। শিক্ষকের পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা ও বেতন কাঠামো,শিক্ষা ব্যবস্থাকে দলীয়করণ, দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদার অভাবের কারণে শিক্ষক সমাজ সমাজের মূল্যবোধ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সমাজ ও ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে মূল্যবোধ সৃষ্টি করার জন্য শিক্ষক সমাজের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।

মেধাবী, যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হবে। মূল্যবোধ ভিত্তিক সিলেবাস প্রণয়ন করতে হব।যারা শিক্ষকতায় আসবেন তাদের শিক্ষকতা পেশাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ না করে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদেরকে সমাজ ও ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে নিজের আদর্শ স্থাপন করতে হবে। কেননা মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য শিক্ষকের ভূমিকাই প্রধান। এর জন্য শিক্ষক সমাজকেই সর্বাগ্রে মূল্যবোধে বলীয়ান হতে হবে।

শিক্ষক ও শিক্ষক সমাজের মধ্যে যদি মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দেয় তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এভাবে চলতে থাকলে জাতি একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে।বাংলাদেশের বর্তমানে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় চলছে। পাশ্চাত্যের স্টাইলে গড়ে উঠছে সমাজ ব্যবস্থা। নগ্নতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মাদক যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। মূল্যবোধের চরম সংকট মূহুর্তে দেশের শিক্ষক সমাজকে শ্রেণীকক্ষসহ সমাজ ও রাষ্ট্রে মূল্যবোধ বিকাশের জন্যে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখতেহবে। সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে ঘুণে ধরা মূল্যবোধকে শিক্ষক সমাজই আবার জাগিয়ে তুলতে পারেন। ছাত্র-ছাত্রী, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রধান কর্ণধারের ভূমিকা পালন করতে হবে শিক্ষক সমাজকেই।

 

 

আফজাল হোসাইন মিয়াজী
বিএ (অর্নাস)এমএ প্রথম শ্রেণী
27-05-2016

 

 

আফজাল হোসেন মিয়াজী নাঙ্গলকোট 800-450

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: