“সব যুদ্ধে আমি জয়ী হয়েছি” ভাষা সৈনিক অধ্যাপিকা লায়লা নূর | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ
প্রচ্ছদ / সারাদেশ / বিস্তারিত

“সব যুদ্ধে আমি জয়ী হয়েছি” ভাষা সৈনিক অধ্যাপিকা লায়লা নূর

22 February 2017, 12:45:50

না না, সে সময় আমার কিছু হয়নি। সব যুদ্ধে আমি জয়ী হয়েছি। কারণ, আমি একটা মজবুত খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আমি যা বলছি তার বিন্দু মাত্র ভুল কিংবা বানোয়াট নয়। এসব কথা বলছেন ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নারী সৈনিক অধ্যাপিকা লায়লা নূর।
ভাষা সৈনিক লায়লা নূরের সাথে ভাষা আন্দোলনের সে সব ঘটনা নিয়ে কথা হয়। কথা বলে জানা যায়, পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়া পর্যন্ত যতগুলো আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে সফল আন্দোলন হচ্ছে ‘ভাষা আন্দোলন’। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতিবৃন্দ এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেননি। এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছে। স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। যার ফলে আন্দোলনটাও অনেক দিন বেঁচে ছিল। এবং আমার আমাদের কাঙ্খিত ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় দেখতে পেয়েছি।
বার্ধক্যের এই ক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রফেসর লায়লা নূরকে দোলাদেয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই উত্তার দিনগুলির স্মৃতি। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরেন তিনি, অধ্যাপিকা লায়লা নূর বলেন, সালটি ছিল ১৯৪৮। পূর্ব পাকিস্তানে ‘মহিলা সংসদ’ নামে মহিলাদের একটি সংগঠন ছিল। তারা কুমিল্লা টাউনহলে একটি সভার আয়োজন করেছিল। সভায় আলোচনা বিষয় ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা কি হওয়া উচিত’। আমি তখন মেট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সবার জুনিয়র আমি। ওই সভায় যোগদানের জন্য কিভাবে দাওয়াত পেলাম তা ঠিক মনে নেই। এই প্রোগ্রাম যিনি আয়োজন করেছেন, তিনি নবাব বাড়ির মেয়ে জাহানারা হায়দার। ওই সভায় যারা বক্তব্য দিয়েছে, তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল উর্দুই হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। জাহানার আপা আমার বড় বোনেরও বড়। সেখানে একজন ওঠে দাঁদিয়ে বললেন, বাংলা কোন ভাষা হলো। ছোট্ট এ দেশে সিলেটে এক রকম, চট্টগ্রামে এক রকম, নোয়াখালীতে আরেক রকম ভাষায় কথা বলে। এটা কি বাংলা!! বাংলার কোন নির্দিষ্ট ভাষা নেই। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে কি করে? তখন আমার আর সয্য হলো না। আমি বললাম আমি কিছু বলতে পারি? সে সময় বক্তারও খুব সংকট ছিল। আমাকে কথা বলার অনুমোতি দেওয়া হল। তখন আমি গিয়ে বললাম, লোকজ ভাষা তো সব ভাষাতেই আছে, সব দেশে আছে। বাংলাতেও আছে। এটাতো কোন সমস্যা না। শুদ্ধ বাংলা তো সার্বজনীন। শহরে বন্দরে সবাই যেটা জানে। এবং এই ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা-দীক্ষা হয়। আর বাংলা ভাষার মধ্যে সবগুলো শক্তি আছে। যা রাষ্ট্রভাষার হওয়ার যোগ্য।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম মহিলা অধ্যাপিকা লায়লা নূর আরো বলেন, পাকিস্তান আমলে রাণীর বাজার নোনাবাদ নামে একটি কারখানা ছিল। সেখানে একদিন সন্ধ্যাকালীন একটি পার্টি চলছিল। ৭-৮ জন আমেরিকার সাহেব সহ প্রায় ৫০ জনের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। উর্দু প্রেমীরা আমাদের সাথে মজা নিতে লাগলো। বলতে লাগলো বাংলা ভাষা কোথায় আছে? কলকাতায় তো কেউ বাংলায় কথা বলে না । এটা শুনে আমার খুব রাগ হয়। আামি তাকে প্রশ্ন করলাম কি বললেন? তবে কলকাতায় কোন ভাষায় কথা বলে? তিনি বললেন, ওরা ক্যালকেশিয়ান বলে । আমি বললাম ক্যালকেশিয়ান বলতে আপনি কি বুঝাচ্ছেন? ক্যালকেশিয়ান বাংলা ভাষারই একটা ফরম। আমি ভাষার পক্ষে বিতর্ক করতে লাগলাম। উপস্থিত সবাই দেখি আমার কথা শুনছে। আমাকে এরকম অনেক জায়গায় অনেকের সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যুক্তিকতা নিয়ে কথা বলতে হয়েছে। এরকম অনেক সভায়, পার্টি ও ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠিতে বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক করতে হয়েছে। তাছাড়া সে সময় আমার কাজই ছিল এটা। এর কয়েকদিন পরে কুমিল্লা মহিলা কলেজে বাঙলা ভাষা নিয়ে আমাকে কথা বলতে হয়।
শিক্ষাবিদ লায়লা নূরের কাছে জানতে চাই, ভাষা আন্দোলনের সময় কুমিল্লার রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম কেমন ছিল। তিনি জানান, প্রায়শই কুমিল্লা সহ সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে মিছিল বের হতো। ১৯৮৪- ১৯৫২ পর্যন্ত কুমিল্লায় ভাষা আন্দোলন ছিল তীব্র। তবে ১৯৫২ সালে প্রায় কুমিল্লার রাজপথে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন হয়। ৫২ সালের ফেব্রুয়ারীর দিকে ভিক্টোরিয়া কলেজ শিক্ষক প্রফেসর নাসির ও অন্য একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মিছিল বের হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী জড়ো হতে থাকে। আমরা যেতে চাই। কিন্তু তখন শিক্ষক আমাদের যেতে বাধা দেন। বলেন, লাঢি র্চাজ হতে পারে। তখন দুজন শিক্ষককেই পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। পরে ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আক্তার হামিদ খান তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।
এখন অবসর সময় কিভাবে কাটে? এমন প্রশ্নে প্রফেসর লালায় নূর বলেন, আমরা সময় পার করতে সমস্যা হতো না। কারণ আমার ভীষণ পড়া-লেখা অভ্যাস আছে। পড়তে পারলে দুনিয়া ভুলে থাকা যায়। কিন্তু দু’বছর আগে আমার সিরিয়াস অসুখ হয়। সেই থেকে মাথায় সমস্যা হয়। ডাক্তার আমাকে পড়া-শোনা করতে বারণ করেছেন। তাই পড়া-শোনা ভীষণ মিস করি। এখন পড়তে খুব কষ্ট হয়। ১৯৯২ সালে শিক্ষকতা অবসর গ্রহণ করি। ভিক্টোরিয়া কলেজে শিক্ষকতাকালীন আমার বদলির আর্দেশ আসে। মা আমাকে খাঁটি দাউদকান্দির ভাষায় বললেন, তোর ওপর ওলারে ক, তোর বেতন কমাইয়া দেক, তবুও যেন বদলি না করে। সবচেয়ে মজার বিষয়, শিক্ষার্থী ছিলাম ভিক্টোরিয়া কলেজ। তারপর শিক্ষকতা শুরু এই কলেজে চাকুরি জীবনের সমাপ্তি টানি এই কলেজ থেকে।
ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষার্থী পরর্বতিতে শিক্ষক। ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষক হয়েও বাংলার প্রতি এতো ভালোবাসার কারণ কি? এ প্রসঙ্গে লায়লা নূর বলেন, বাংলা তো আমার মায়ের ভাষা। আর কেন জানি বাংলাকে আমি বেশ ভালোবাসি। তাছাড়া বাংলার প্রতি প্রবল অনুরাগের কারলেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি।
২১ দিন জেলখানায় আটক থাকা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম নারী শিক্ষক প্রফেসর লায়লা নূর বলেন, অনেক ত্যাগের বিনিময় আমাদের এ বাংলা ভাষা। এ ভাষা আমাদের সব শক্তি। কিন্তু এখন প্রায় দেখি বিভিন্ন মিডায়াতে এবং ভাষার ব্যবহার প্রয়োগে বিক্রিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি? প্রকৃত অর্থে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাঙলা আমার ভাষা। ভাষার জন্য কিছু করার দায়িত্ব আমাদের সবার। যেমন ধরুণ কলকাতা এক সময় বাঙলা ভাষার ও সাংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। বাঙালি সাংস্কৃতি মানেই কলকাতা। সে কলকাতাতে এখন হিন্দিরই জয় জয়কার। বাঙলা কেউ বলে না। ইতর বদ্র থেকে পেশাজীবী সবাই হিন্দি বলে। এটা তো তাদের ভাষা না। বাঙলা সেখান থেকে প্রায় উঠে যাচ্ছে। বাংলার আশ্রয়ই হল এখন বাংলাদেশ। বাংলাকে সঠিকভাবে ব্যবহার এবং বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বাঙালিদের।
লায়লা নূরের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে আসে কুমিল্লার দুই কৃতি সন্তান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও ভাষা সৈনিক রফিকুল ইসলামের অবদানের কথা। তিনি বলেন প্রথম বাঙালি হিসেবে বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তারপর বাংলাকে আন্তজার্তিক মাতৃভাষা করার জন্য ভাষা সৈনিক রফিকুল ইসলামকে অনেক প্ররিশ্রম করতে দেখেছি।
নতুন প্রজন্মকে উদ্দেশ্যে করে ভাষা সৈনিক অধ্যাপিকা লায়লা নূর বলেন, বাংলার ঠিকানা হল বাংলাদেশ। যোগ্যতার দিক থেকে বাংলাই সেরা। অনেক ত্যাগ বিনিময় অর্জিত হয়েছে এ ভাষা। বাংলা ভাষার সাথে উর্দ ভাষার কোন তুলনা হয় না। বাংলাকে সঠিকভাবে ব্যবহার এবং বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমাদের তথা সব বাঙালির।
প্রফেসর লায়লা নূর বাংলা ভাষাকে উচ্চ আদালতে ব্যবহারের জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, অপরাধীর ফাঁসি হচ্ছে-অথচ অপরাধী জানে না রায়ে কি লেখা হয়েছে! এটা খুবই দুঃখজনক। এ ভাষার জন্য অনেকে জীবন দিয়েছে । তাই ভাষার সঠিক চর্চা করা সকলের দায়িত্ব।

বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ভাষা সৈনিক অধ্যাপিকা লায়লা নূর । লায়লা নূর ১৯৩৪ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গাজীপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা আবু নাসের মোমাম্মদ নুরুলাহ। মাতা সামছুন্নাহার মেহেদী। ৩ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ২য়। পিতা ছিলেন ভারতের বিহার রাজ্যের জামশেদপুরে অবস্থিত টাটা স্টিল কোম্পানির প্রকৌশলী। সেখানেই তার বেড়ে উঠা। কুমিল্লায় এসে তিনি ১৯৪৮ সালে ফয়জুন্নেছা থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ইন্টারমিডিয়েট, ডিগ্রি পাশ করেন কুমিলা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে। মাস্টার্স সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ভাষা আন্দোলন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য লায়লা নূরকে বিনয় সম্মাননা পদক ২০১৪-তে ভূষিত করা হয়।
অধ্যাপিকা লায়লা নূর ১৯৫৭ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজে যোগদান করেন এবং তিনি প্রথম মহিলা অধ্যাপক ছিলেন । ভিক্টোরিয়া কলেজে একটানা ৩০ বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। তিনি লেখালেখির সাথেও জড়িত। তিনি একজন অনুবাদকও বটে। তিতাশ চৌধুরীর ১১৫টি কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন তিনি।লগো

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: