সময়- মুকুল মজুমদার | Amader Nangalkot
শিরোনাম...
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ জমকালো আয়োজনে বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র ওমান শাখার কমিটি গঠন ◈ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার কমিটিতে ভোলাকোটের দুই রতন ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ

For Advertisement

সময়- মুকুল মজুমদার

10 January 2017, 10:02:17

কুমার হাঁটের রমজান আলী পেশায় সে একজন রিক্সা চালক। তেষট্রি বছর বয়সের বৃদ্ধ রমজান আলী বিগত চল্লিশ বছর যাবৎ এই কুমার হাঁটে রিক্সা চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। পরিবারের সদস্য বলতে এক ছেলে এক মেয়ে। ১৯৭১এর যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর হাতে এক মাত্র ছেলে মরতে দেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে এসে রমজান আলী বাসা বাঁধেন এই কুমর হাঁটে। রমজান আলীর মতই একটি কুমার পরিবার ১৯৭১এর আগে এখানে এসে বাড়িঘর বাধেঁন এবং এখানেই সে ব্যবসা বানিজ্য গড়ে তোলেন। এর সেই সুত্র ধরেই এখানকার নাম পড়েছে কুমার হাঁট। সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কুমার হাঁটকে কেন্দ্র করে পর পর অনেকগুলো পরিবার কুমার হাঁটের মহাজন আলী আশ্রাফ থেকে জায়গা খরিদ করে বাসাবাড়ি বাঁধেন।
রমজান আলী এই কুমার হাঁটের গরিব অসহায় মানুষগুলোর সুখে দু:খে বন্ধু। দিনকি রাত রাত-বিরাতে ডাক পড়লেই রমজান আলী স্ব-শরীরে হাজির। রমজান আলীর বড় ছেলে যখন পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন তখন রমজান আলীর স্ত্রীর আলেয়া বেগমের কোলে দু’বছরের কন্যা সন্তান। তাকে বুকে করেই আলেয়া বেগম কুমার হাঁটে আসে। তার পর এক এক করে আরো তিন মেয়ে ও এক ছেলে জন্ম নেয়। এদের ভরণ পোষণ জোগাতে গিয়ে রমজান আলী আর্থীক ভাবে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনী। এক এক করে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া আর ছেলেকে মানুষ করে তোলা নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার বয়স এখন শেষের পথে। ৪০ বছর পূর্বে হাতে থাকা কিছু স য় দিয়ে একটি রিক্সা কিনেছিল রমজান আলী। সেই রিক্সাটি মেরামত করে করেই কুমার হাঁটে চলছে তার উর্পজনের পথ চলছে জীবন প্রবাহ।
চল্লিশ বছর পরে এসে এই কুমার হাঁটে অনেক কিছুই বদলেছ। এই হাঁটে এখন চা-দোকান, মুদি দোকানসহ গড়ে উঠেছ কয়েকটি টং দোকানও। দোকান গুলো প্রত্যেকের স্ব-স্ব তত্তাবধায়নে চললেও নিয়োম মত হুকুম মেনে চলতে হয় মহাজন আলী আশ্রাফের। আশ্রাফ মহাজনের অত্যাচারের স্বীকার হয়নী এমন কেউ এই কুমার হাঁটে আছে বলে মনে হয় না। যে রমজান আলী মানুষের দু:খে স্বর্বস্ব বিলিয়ে দেয় সে রমজান আলীও মহাজনের অনৈতিকতার স্বীকার হয়েছে দিনের পর দিন। এমন অসংক্ষ্য দিন রয়েছে যে দিনে মহাজন রমজান আলীর রিক্সায় করে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পারিশ্রমিকের বদলে দিয়েছে দূর্ব্যবহার। এইতো সে দিন রমজান আলীর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে রমজান আলী নিজেও। তার পরও সেছেলের চিতিৎসার জন্য ঔষধের টাকা মেলাতে বৃষ্টি ভেজা আকাশের নিছে রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেই কুমার হাঁটে দেখা গেল মহাজন আলী আশ্রাফকে। দূর থেকে রমজানকে ডাক দিল আশ্রাফ
এই রমজান কোথায় যাচ্চিস?
মহাজন সাব আমার ছেলেডা অসুস্থ হইয়া পড়ছে হের লাইগা বাইর অইলাম দেহি কয়ডা টাহা অইলে ঔষধ কিনুম।
ভালো করেছ এখন চল আমাকে একটু বাড়ি পৌঁছে দাও। শুনলাম আমার ছেলেটাও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কে জানে না আবার ডাক্তারের জামেলায় পড়তে হয়।
ঠিক আছে চলে আপনেরে দিয়া আই। তবে হাজন সাব আমার একটা কথ আছে।
কি কথা বল।
আপনারে নিতে আনতে কোনদিনও টাহা পয়শা চাই নাই।
তাতো আমি জানি।
কিস্তু আইজ আমারে কয়টা টাহা দিতে অইব। ছেলের লাইগা ঔষধ কিনুম।
ঠিক আছে দেব যা লাগে নিস।
রমজান আলী বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রিক্সা নিয়ে হাজির হল মহাজনের ঘাটায়। ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। মহাজনের ছেলের অবস্থা খুবই খারাপ। এ অবস্থা দেখে মহাজন রমজানকে বলল-
রমজান চল ছেলেটারে উপজেলা সাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হবে।
মহাজন সাব আমার শরীরটা ভালনা, দূর্বল অইয়া গেছে। আপনি অন্য কাউরে খুঁইজা আনেন আমি অহন বাড়ি যামু। আপনি আমারে কয়ডা টাহা দেন, ছেলেটার লাইগা ঔষধ নিয়া যাই।
(রমজানকে ধমক দিয়ে) তোর ছেলৈ মারা যাক। তুই আমার ছেলেকে নিয়ে চল। আমার ছেলে না বাচঁলে তোরা কেউ বাঁচবিনা।
আপনি এইডা কি কইলেন মহাজন সাব আমি ঔষধ না নিলে আমার ছেলেডা মইরা যাইব।
আমার ছেলে বাঁচলে তোর ছেলের সম্পূর্ণ চিকিৎসার টাকা আমি দেব।
সাব জ্বরে আমার গাওডা পুইরা যাইতেছে। বাইরে যে বৃষ্টি আর কিছুক্ষণ ভিজলে আমি নিজেও মইরা যামু।
তুই মরলে সেটা আমি দেখবো। এখন চল দ্রুত..
মহাজনের সাথে কথায় কাটাকাটি করে না টিকতে পেরে শেষ পর্যন্ত আবারও বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রমজান তার চল্লিশ বছরের পুরনো রিক্সাটি নিয়ে চললো উপজেলা সাস্থ্যকমপ্লেক্সের দিকে। চারিদিকে অন্ধকারে ছেয়ে আসছে। ভারীর্বষণে রাস্তা ঘাট ডুবে গেছে। রাস্তার কাদা-মাটি উপর দিয়ে রমজান আলী টেনে চলছে তার তিন চাকার গাড়ি। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধা হয়ে গেল। জরুরী বিভাগের ডাক্তার মহাজনের ছেলেকে পরিক্ষা করে বললো-
– আর কিছুক্ষণ দেরি করলে ছেলেটা মারা যেতো। বাহিরের যে অবস্থা তাকে আনলেন কি করে।
– এই যে রমজান আলী ওর রিক্সায় করে এনেছি। ও না এলেতো আনতেই পারতাম না।

রমজান আলী হাসপাতালে বেে বসে কাঁপছে। মনে হচ্ছে সে একশত চার ডিগ্রী জ্বরে ভূগছে। রাত হয়ে গেছে এই রাতে আর বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়। রাতটা সবাইকে এই হসপিটালেই কাটাতে হবে। মহাজনের ছেলে এখন বিপদ মুক্ত। রমজান আলী বেে বসা। হাজন কাছে এসে রমজানকে বললো-
রমজান এখনতো আর বাড়ি য়েরা সম্ভব নয়, কাল সকালে গিয়ে তোর ছেলেকে ডাক্তার দেখাস। এই নে এখানে দু’হাজার টাকা আছে। এটা তোর ছেলের জন্য আমাকে এটা ফেরত দিতে হবে না। এই টাকা তোকে এক বারে দিয়ে দিলাম।

মনে কষ্ট আর দেহের জ্বর নিয়েও হাতে টাকা পেয়ে রমজান মহা খুশী। কাল ছেলেকে ভালো ডাক্তার দেখাবে। ছেলে সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে যাবে।
অন্যদিকে রমজান আলীর স্ত্রী ছেলের পাশে বসে দু’চোখের জল ঝরাচ্ছে। স্বামী রমজান ঔষধের টাকার জন্য বের হয়েছে সেই দুপুরে, অথচ এখন মধ্যরাত। স্বামীর ফেরার কোন সম্ভাবনাই নেই। রমজানের ছেলের গায়ে এখন ততটুকু জ্বর যতটুকু হলে একজন মানুষ মারা যায়। এদিকে রমজান আলী টাকা হাতে বসে আছে ভোর হওয়ার অপেক্ষায়।
অন্যদিকে আলেয়া বেগম বসে বসে দেখছে তার বুকের ধন কিভঅবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ভোর হয়েছে, ঘরের মেঝেতে আলেয়া বেগম বসে আছে ছেলের লাস নিয়ে। হাতে এক মুঠো টাকা নিয়ে দৌঁড়ে আসছে রমজান আলী। এসে দেখে সময়ের ব্যবধানে দারিদ্রের কাছে হার মেনেছে রমজান আলীর পরিবারের এক সদস্য। রমজান আলীর গুরুত্বপূর্ন সময়টা ব্যবহার করেছে মহাজন। মহাজনের ছেলের জীবনের বিনিময় হল রমজান আলীর ছেলের জবনেরসাথে। যুগ যুগ ধরে মহাজনরা চুষে য়েছে দরিদ্রদের জীবন ও জীবিকা। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। রমজান আলী ছেলেকে সমাধীস্থ করে সোজা গিয়ে হাজির হল মহাজনের ঘাটায়। আর মহাজনকে ডেকে বললো- মহাজন সাব সারাডা জীবন এই কুমার হাঁটে থাইকা গরীব মানুষগুলার সেবা করনের চেষ্টা করেছি। আইজ আপনের ছেলে পুরা সুস্থ।
গত কাইল দুপুর থেইক্কা আইজ ভোর পর্যন্ত এই সময়টা না হয় আপনার জন্য আমার পক্ষ থেকে সারা জীবনের উপহার। এ কথাগুলো বলতে বলতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো রমজান আলী। তার কিছুদিন পর কুমার হাঁটে গিয়ে দেখা গেলো রমজান আলীর রিক্সাটি অন্য একজনে চালাচ্ছে। রমজান আলীর বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে গুরুত্ব পূর্ণ কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

For Advertisement

Unauthorized use of news, image, information, etc published by Amader Nangalkot is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws.

Comments: