সালাত কেন কীভাবে যাবতীয় অপকর্ম থেকে মানুষকে হেফাজত করে | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

সালাত কেন কীভাবে যাবতীয় অপকর্ম থেকে মানুষকে হেফাজত করে

18 September 2016, 9:31:28

মাহমুদ ইউসুফ

নবি করিম স. মৃত্যুবরণ করেন ৬৩২ সালের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার। মৃত্যুর পূর্বে অসুস্থতা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, কথা বলাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে যায়। তবে মৃত্যুর চারদিন পূর্বে বৃহস্পতিবার কিছুটা সুস্থবোধ করলে তিনি মসজিদে নববিতে যান। সেখানে তিনি বলেন, সালাত এবং অধীনস্থদের প্রতি খেয়াল রাখবে’ (ছফিউর রহমান মোবারকপুরী: আর রাহীকুল মাখতুম, (অনুবাদ- খাদিজা আখতার রেজায়ী) আল কোরআন একাডেমী লন্ডন, বাংলাদেশ সেন্টার ঢাকা, নবম সংস্করণ ২০০৩, পৃ ৪৮৬)। এটাই তাঁর শেষ নসিহত। এরপর আর কোনো উপদেশ দেয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। মহানবি স. এর এই শেষ বাণীই বলে দেয় সালাত কত গুরুত্বপূর্ণ?

একজন বনি আদমকে প্রকৃত মানুষ হতে হলে, বড় হতে হলে, সৎ ও সুন্দর জীবন যাপন করতে হলে, সুস্বাস্থ্য গড়তে হলে, অপরাধমূক্ত জীবন যাপন করতে হলে সালাতের বিকল্প নেই। যাপিত জীবন পরিপাটি, সাবলীল ও সুশৃঙ্খল করে গড়ে তুলবে সালাত। দুনিয়ায় অনেক দেশ, বহু সংগঠন, বহু মানুষ সাম্যবাদী শ্লোগান দেয়। অথচ গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে মসজিদ ছাড়া কোথাও সাম্যবাদ নেই। মসজিদে উচু-নিচু, ধনী-গরিব, শিল্পপতি-শূণ্যপতি, শাসক-শাসিত, রাজনীতিবিদ-আমজনতা কারও মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না। সেখানে সবাই এক কাতারে শামিল। মিলেমিশে সবাই একাকার। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সালাত প্রসঙ্গ এসেছে ৮২ বার। হাদিসে এসেছে অসংখ্যবার। কোথাও বলা হয়নি ‘সালাত পড়’। বর্ণিত হয়েছে, সালাত কায়েম করো। এর মানে মসজিদে যেভাবে সব মানুষ সমান হয়ে যায়, বাইরেও সেভাবে সব ভেদাভেদ ভুলে মসজিদের মতো সর্বত্র সবসময় সমানাধিকার বা সুষম মর্যাদার ভাগিদার হতে পারে। সেটাই হলো সালাতের নির্দেশনা। সালাত কায়েমের মুখ্য উদ্দেশ্য এটাই।

মহান রব্বুল আলামিন বলেছেন, হে রসুল! আপনার প্রতি কিতাব থেকে যা প্রত্যাদেশ করা হয়েছে তা আবৃত্তি করুন এবং সালাত কায়েম করুন। নি:সন্দেহে সালাত মানুষকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ হতে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই শ্রেষ্ঠতর। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন। (সুরা ২৯ আনকাবুত: আয়াত ৪৫)। আমরা এখন দেখবো সালাত কীভাবে অন্যায় কুকর্ম থেকে মানবজীবনকে রা করে। আমরা জানি, সালাত আদায় করতে ১৩টি ফরয এবং ১৪টি ওয়াজিবসহ আনুষঙ্গিক অনেক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এরমধ্যে মৌলিক চারটি কাজ হলো শরীর পাক, পোশাক পাক, জায়গা পাক এবং কুরআন তেলাওয়াত।

ক) শারীরিক বিশুদ্ধতাঃ নামাযিরা ‘শরীর পাক’ বলতে সাধারণত বুঝে দেহের উপরিভাগে পেশাব পায়খানা বা ময়লা আবর্জনার অনুপস্থিতি। এটা আংশিক সত্য, পুরোপুরি নয়। শরীর পাক বলতে দৈহিক বিশুদ্ধতা বুঝায়। দেহের চামড়া, গোশত হাড্ডি, রক্ত, কেশ, চিন্তাভাবনা সবকিছুর পরিশুদ্ধতা দরকার। আয় উপার্জনের বিষয়টি এর সাথে সংশ্লিষ্ট। রসুলুল্লাহ স. ইরশাদ করেছেন, যে গোশত হারাম খাদ্যে প্রতিপালিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর হারাম খাদ্যে বর্ধিত প্রতিটি গোশতপিণ্ড জাহান্নামের যোগ্য। (আহমদ, দারেমি, বায়হাকি; বর্ণনায় জাবির রা.)

অথচ অন্যত্র বলা হয়েছে সালাত জান্নাতের চাবি এবং সুন্দরভাবে দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায় করলে বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবেন। অথচ এখানে দেখা যায়, হারাম খাদ্য গ্রহণকারী জাহান্নামি। তাহলে একথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার নয় যে, হালাল রুজি বা শারীরিক বিশুদ্ধতা সালাতের পূর্বশর্ত। সুরা মাউনে সালাত আদায়কারীকে মুসুল্লি বলা হয়েছে। তাই যারা মুসুল্লি তাদেরকে বিষয়টি অবশ্যই ভাবতে হবে। পরের হক লুণ্ঠন, জুয়া, লটারি, অফিস ফাঁকি, সেবাগ্রহণকারীদের হয়রানি, সরকারি মাল আত্মসাৎ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভাউচার বাণিজ্য, দুর্নীতি, বখরা, উপরি, বখশিস প্রভৃতি অনৈতিক আয়ের সংশ্লেষ থাকলে ‘দৈহিক বিশুদ্ধ’ হবার সুযোগ নেই। শরীর পাক করতে হলে সর্বপ্রথম আয় রোজগারে স্বচ্ছতা চাই।

খ) পোশাকের বিশুদ্ধতা ঃ লেবাস শুধু বাহ্যিক নাপাকিমুক্ত হলে চলবে না। এর অর্থের উৎস বৈধ হতে হবে। সরকারি অফিসে চাকরি করছি- গ্রাহক খুশি হয়ে সাফারি বা শার্টপ্যান্ট উপহার দিলো। এটাকে ‘হালাল’ মনে করে গ্রহণ করলাম! এর কোনো বৈধতা নেই। মহানবি স. এ প্রসঙ্গে বলেছেন, তাকে চাকরিচ্যুত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হোক। দেখা যাবে কে তাকে বাড়ি হাদিয়া সামগ্রী পৌঁছায়। তদ্রুপ প্রতারণা, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, শেয়ারবাজি, মাদক ব্যবসা, ইয়াবা সরবরাহ, চোরাচালন, গুদামজাতকরণ, বিক্রিত মালে ভেজাল, অনুনমোদিত বাণিজ্য, অবৈধ ব্যবসা, ফরমালিনযুক্ত তথা মানবদেহের জন্য তিকর মালসামান বিক্রয়, বিষাক্ত পণ্যের ব্যবসা প্রভৃতি উপায়ে অর্জিত অর্থ দ্বারা সুন্দর রুচিসম্পন্ন মার্জিত পোশাক পরিধান করে, সামনের কাতারে ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে, সহিহ শুদ্ধভাবে দীর্ঘসময় নিয়ে মনোযোগ সহকারে সালাত আদায় করলাম। কিন্তু আল্লাহর দরবারে সালাত কবুল হলো কী? আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আল্লাহর রসুল স. একদিন এমন এক ব্যক্তির প্রসঙ্গে তুলে বললেন, যিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ধুলি-মলিন অবস্থায় (কোনো পবিত্র স্থানে হাজির হয়ে) দুহাত তুলে আসমানের দিকে তাকিয়ে (দুয়া করে আর) বলে, হে আল্লাহ! হে আল্লাহ ! অথচ তার খাদ্য, পানিয় ও লেবাস সবকিছু হারামের, এমনকি সে এ পর্যন্ত হারাম খাদ্য দিয়েই জীবন ধারণ করেছে। সুতরাং তার দুয়া কী করে কবুল হবে! (মুসলিম)। একজন মুসুল্লিকে অর্থ উপার্জনের েেত্র উপরিল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনার দাবি রাখে।

গ) স্থানিক বিশুদ্ধতা ঃ ‘জায়গা হতে হবে পাক সাফ’ সালাতের ১৩ ফরযের একটি। সালাত সাধারণত: মানুষ ঘরে বা মসজিদে আদায় করে। তাই সালাতের হক আদায় করতে হলে এ দুটি স্থানের পবিত্রতা অপরিহার্য। ঘর ও মসজিদের জায়গা, নির্মাণসামগ্রী, অর্থ হালাল হতে হবে। আধুনিক যুগে শহুরে এলাকার ঘরবাড়ির অধিকাংশই ব্যাংক ঋণে নির্মিত। ব্যাংকিং লোন বলতেই সুদি কারবার, সুদের হিসাব নিকাশ। অথচ আল্লাহ সুদকে স্থায়ীভাবে হারাম করে দিয়েছেন। সুদ ঘুষের অর্থ দিয়ে বাড়ি নির্মাণ কিংবা অন্যের জমি দখলে নিয়ে বসত গড়লে সালাতের স্থানিক বিশুদ্ধতা পূর্ণতা পাবে না। তদ্রুপ মসজিদের েেত্রও একই বক্তব্য প্রযোজ্য। সরকারি বা খাস জমি, গরিব ও ইয়াতিমের জায়গা জমিনের ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে মসজিদ বানালে বা মসজিদের নামে চাঁদাবাজি বা দুর্নীতির টাকা মসজিদের উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করলে ওই মসজিদে আদায়কৃত সালাতের পরিশুদ্ধতা অবশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন। জায়গা পাক হতে হলে সেখানে অবৈধ অর্থের অনুপস্থিত বাঞ্ছনীয়।

ঘ) কুরআন তেলাওয়াত ঃ আল্লাহর রসুল স. বলেছেন, কুরআন মানুষের মনোজগতের ওষুধ’ (ইবনে মাযাহ; বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.)। কুরআনের আগমন ঘটেছে মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোকিত পথে নিয়ে আসতে’ (সুরা ইবরহিম : ১)। আল কুরআনের প্রভাবেই আরবের অসভ্য, বর্বর বেদুইনরা দুনিয়ার সর্বোত্তম নাগরিক সমাজ গড়তে সম হয়। (আরও দেখুন: মানবেন্দ্র নাথ রায়ের দি হিস্টরিক্যাল রোল অব ইসলাম, পি কে হিট্টি রচিত হিস্টরি অব আরবস্, সুরজিৎ দাশগুপ্ত রচিত ভারতবর্ষ ও ইসলাম ইত্যাদি) বুদ্ধি বিবেক বিবেচনা প্রয়োগ করে কুরআন অধ্যয়ন করলে মানুষ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ক্যাট স্টিভেনসন, ড. লরেন্স বি ব্রাউন, ম্যারি গিলার, আবুল হোসেন ভট্টাচার্য, ক্যাসিয়াস কে, লিওপোল্ড উইস, শিবশক্তি স্বরূপজী, মার্মাডিউক পিকথল প্রমুখ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কুরআনের আলোয় উদ্ভাসিত মননের অধিকারী ব্যক্তি কখনও বদকাজ অর্থাৎ সেকুলার আদর্শে সম্পৃক্ত হতে পারে না। এই কুরআন প্রতি রাকাত সালাতের প্রধান অনুষঙ্গ। সালাতের ভেতর বুঝে বুঝে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে’ (আহমদ, মিশকাত: বর্ণনায় ইবনে উমার ও বায়াজি রা.) । এসব মুসুল্লি মসজিদ থেকে বের হয়ে আর কোনো মানব রচিত মতাদর্শে আসক্ত হতে পারে না। স্বভাবতই তিনি সকল নিকৃষ্ট বা বদ কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এছাড়া নিয়মিত সালাত আদায় করলে জিনা, ব্যাভিচার, পরকীয়া, প্রেমলীলা, লাম্পট্য, পরকীয়া, অসৎ সঙ্গ, অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। কারণ তিনি জানেন মসজিদে নিয়মিত তাকে হাজিরা দিতে হবে। তাছাড়া পরিবার পরিজনের কাছে জবাবদিহির বিষয়টি তো আছেই। বাধ্য হয়ে যাবতীয় নৈতিকতা বিরোধী কর্মকা- থেকে নামাযিকে দূরে থাকতে হয়।

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: