কি রকম গণতন্ত্র বাংলাদেশে দরকার ? | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ বিশ্ব পর্যটন দিবস ও আমাদের সম্ভাবনা ◈ মোল্লা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা- এ,কে,এম মনিরুল হক ◈ বাইয়ারা প্রবাসী কল্যাণ ইউনিট’র বাহারাইন শাখা কমিটি গঠন ◈ পাই যে কৃপার ভাগ – মোঃ জহিরুল ইসলাম। ◈ কুমিল্লায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে জুতা পেটা খাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ◈ সামাজিক সংগঠন ”খাজুরিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার” ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন ◈ দৌলখাঁড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার ◈ শিক্ষকদের মূল্যায়ন কতক্ষণ করবে- জহিরুল ইসলাম ◈ শুধু ভুলে যাই- গাজী ফরহাদ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

কি রকম গণতন্ত্র বাংলাদেশে দরকার ?

7 May 2014, 2:42:46

Ahsan Ullah Abm

স্কো. লি. আহসান উল্লাহ (অব.)

গণতন্ত্র।

গণতন্ত্র বয়সে সুপ্রাচীন। এর যাত্রাপথ দীর্ঘ এবং সমস্যাসঙ্কুল কিন্তু নিরন্তর এবং আশাবাদী। কারণ, গণতন্ত্র বিরোধী ফ্যাসিবাদ, নাৎসীবাদ, সমাজবাদ, সাম্যবাদ প্রভৃতি সর্বাত্মকবাদী মতাদর্শও এখন গণতন্ত্রের নামাবলী গায়ে চাপিয়ে রাজনৈতিক আসরে অবতীর্ণ হয়। এমনকি স্বৈরাচারী সামরিক একনায়কও পতনের আগে গণতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আবেদন রাখে। এটি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। এর অর্থ ‘জনসাধারণ কর্তৃক দেশ পরিচালনা। জনসাধারণের কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য বজায় থাকে যে দেশে তার নামের আগে বিশেষণ হিসেবে যুক্ত হয় গণপ্রজাতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্র বা জনগণতন্ত্র। এই শব্দের উৎপত্তি প্রাচীন গ্রীক শব্দ demos (অর্থজনগণ) এবং Kratia (অর্থ ব্যবস্থা) থেকে। গণতন্ত্রকে হেরোডোটাস (খৃষ্টপুর্ব ৪৮৪-৪২৫) প্রথম সংজ্ঞায়িত করেছেন,‘এমন এক শাসনব্যবস্থা যা আইনত ও ব্যাপকভাবে সমাজের সকল সদস্যের ওপর ন্যস্ত।  তারপর প্রাচীন গ্রীক, রোম, ইউরোপ ঘুরে অনেক পথ পেরিয়ে আধুনিক আমেরিকায় আব্রাহাম লিঙ্কন সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘‘ জনগণের স্বার্থে জনগণের দ্বারা জনগণের নিজস্ব সরকারের নাম গণতন্ত্র । লিন্ডসে, লাস্কি, টয়েনবী প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মধ্যে গণতন্ত্র কেবল শাসন ব্যবস্থা নয়, বরং একটি সমাজব্যবস্থাও বটে। বর্তমান যুগে শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র বলতে বোঝায়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত এমন এক সরকার যা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে এবং জনমতের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। এক্ষেত্রে জনগণ পরোক্ষ শাসক আর তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের সেবক।

কেবল ভোটাভুটি, প্রতিনিধি, সংসদ ও সরকার গঠন করলেই গণতন্ত্র কায়েম হয় না বরং তা স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়। পরিবার থেকে রাষ্ট্রিয় ও সামাজিক সংস্থা পর্যন্ত, সবখানে গণতান্ত্রিক আচরণ, সংস্কৃতি ও সাংগঠনিক কাঠামো চালু হলে তবে সমাজব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র একটি নিত্য গতিশীল ও ক্রমবিকাশমান আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। গণতান্ত্রিক সমাজের মৌল আদর্শ হচ্ছে সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ব। এ এমন এক ব্যবস্থা যেখানে মানুষ ধর্ম, বর্ণ, বংশ, মর্যাদা ও সম্পদ নির্বিশেষে পরষ্পরের সঙ্গে মিলে মিশে সকলের জীবনের অভিন্ন কল্যাণ সাধনে কাজ করার সুযোগ পায়। বর্তমান বিশ্বে তাই গণতন্ত্র একটি সমাজব্যবস্থা হিসেবেই বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ শতকে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় উদারবাদী ধারার অভিমুখে। এপথে আসতে যুদ্ধ, বিপ্লব, উপনিবেশিকতা মোচন, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রভৃতি বাধা পার হয়ে এগুতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ওসমানী ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে ইউরোপে গণতন্ত্রের সূচনা হয়। প্রথম দু’দশকে বেশ ভালোই চলছিল কিন্তু বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দায় ছন্দপতন ঘটে এবং ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায় সে সুযোগে লৌহমানবের একনায়কতন্ত্র জেঁকে বসে। নাৎসীবাদ জার্মানীতে, ফ্যাসিবাদ ইতালীতে, স্বৈরতন্ত্র স্পেন ও পর্তুগালে এবং বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক শাসক জন্ম লাভ করে বাল্টিক, বলকান, ব্রাজিল, কিউবা, চীন, জাপানসহ আরো বহু দেশে। তার সমান্তরালে বিপরীত মেরুতে চলতে থাকে মার্কস-এঙ্গেল-সের সমাজতান্ত্রিক আদর্শভিত্তিক গণতন্ত্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এ ধারাকে পাল্টে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী, অস্ট্রিয়া, ইতালী এবং জাপান গণতন্ত্রের মডেলে রূপান্তরিত হয়। অধিকাংশ পূর্ব ইউরোপ ও পূর্ব জার্মানী পড়ে যায় সমাজতান্ত্রিক/সৌভিয়েত ব্লকে। তার পরই শুরু হয় উপনিবেশিকতা মোচনের লড়াই এবং জন্মলাভ করে অনেক নতুন সাংবিধানিক নামমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের। উপমহাদেশে আবির্ভূত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

১৯৭০ এর দশকে স্পেন, পর্তুগালসহ দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশে সামরিক একনায়ককে হটিয়ে, বেসামরিক শাসন চালু হয়। তবে দশকে বেশীরভাগ দেশেই নামমাত্র গণতন্ত্র চালু হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ জনগণই বাস করতেন ভাওতাবাজীর নির্বাচন কিংবা কোন না কোন ছলচাতুরীপূর্ণ গণতন্ত্রে। তারপর ১৯৮০ এর দশকে আসে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ঢেউ আর্জেটিনা, বলিভিয়া, উরুগুয়ে, ব্রাজিল ও চিলিতে। এ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় অনুরূপ ব্যবস্থা চালু হয়। দশকের শেষদিকে অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং কম্যুনিজমের নামে শোষণ নিপীড়নের প্রতি জনগণের অসন্তোষ সোভিয়েত ব্যবস্থার পতন ও স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে, পূর্ব-ইউরোপীয় ও মধ্য এশিয় দেশ গুলোতে গণতন্ত্রায়ন শুরু হয়। বেশী সফলতা দেখা যায়, পশ্চিম ইউরোপের সন্নিহিত রাষ্ট্রসমূহে। ওরা এখন য়ুরোপিয় য়ুনিয়ন (ই ইউ) ও ন্যাটোর সদস্য। তবে, সমকালীন রাশিয়ায় এখনও গণতন্ত্রের নামে একধরনের একনায়কতন্ত্র চালু রয়েছে, সত্যিকার গণতন্ত্র কায়েম হয়নি বলে কেউ কেউ মনে  করেন। ১৯৯০ এর দশক থেকে গণতান্ত্রিক ঢেউ আছড়ে পড়েছে আফ্রিকায়ও। দক্ষিণ আফ্রিকা এক্ষেত্রে অগ্রগামী। সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে দেখা যায় (১৯৯৮ সন থেকে) এ ঢেউ খেলছে ইন্দোনেশিয়ায়, যুগোশ্লাভিয়ায়, জর্জিয়ায়, ইউক্রাইন, লেবানন, কিরগিজস্তানে। এবং সর্বসম্প্রতি ২০১১ সন  থেকে তিউনিশিয়া, মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, সিরিয়া, ইরাক জর্দান, মরক্কো, কুয়েত সহ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়। গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে বিশ্বের মোট ১৯২টি রাষ্ট্রের মধ্যে ১২০টি দেশ এবং ৫৮.২% বিশ্বজনসংখ্যার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন। তন্মধ্যে ৮৫টি দেশ এবং ৩৮% জনগণ মানবাধিকার ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করে অর্থাৎ উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ফল ভোগ করে। এতে ধারণা করা যায় যে, গণতন্ত্রই ভবিষ্যত মানবসমাজের সার্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। 

গণতন্ত্রের মূল্যায়ন 

গণতন্ত্রের পক্ষে বিপক্ষে প্রচুর জোরালো যুক্তি এবং ইতিবাচক ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এসব পটভূমিতেও গণতন্ত্র অন্য যে কোন শাসন ব্যবস্থার চেয়ে অধিক উপযোগী ও ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত। তবে ভাল গণতন্ত্র চর্চায় নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই শ্রেয়। এ নিয়ে মতবাদও গড়ে উঠেছে। যার ভিত্তিতে স্বীকার করা হয় যে: (১) সবরকম অবস্থায় গণতন্ত্র সফল হয় না; (২)  অনুকূল অবস্থায়ও গণতন্ত্রের কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে; (৩) গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের গতিশীলতার জন্য পর্যালোচনা ও সমালোচনার দরজা জানালা সবসময় খোলা রাখা দরকার। গণতন্ত্রের মূল্যায়ন প্রসংগে জন ডিউয়ীর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: ‘‘মানুষের প্রকৃতিগত যোগ্যতা, প্রজ্ঞা এবং সমন্বিত ও সহযোগিমূলক অভিজ্ঞতার শক্তিতে আস্থাশীল থাকাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। প্রকৃতিগতভাবে মানবসমাজে সে বৈচিত্র্য ও অমিল বিদ্যমান, তার কারণেই গণতন্ত্রে সাম্যনীতির প্রয়োজন। কারণ কোন রাষ্ট্রের আইন ও সরকার যদি তার নাগরিকদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে সমতা নীতি মেনে না চলে, তবে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীরাই মেধা ও যোগ্যতার বিকাশ লাভের সুযোগ পায়, জনগণ যে তিমিরে, সে তিমিরেই থেকে যায়।” তাই অধ্যাপক ম্যাক্সির ভাষায় বলা যায় যে, গণতন্ত্র নিছক একটি রাজনৈতিক সূত্র বা শাসনপ্রণালী  বা সমাজ ব্যবস্থা নয়, এটি এমন এক জীবন দর্শন, যা বলপ্রয়োগ ছাড়াই ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা ও অবাধ কর্মতৎপরতার সঠিক সমন্বয়ক হতে পারে এবং এমন আস্থা গড়ে তোলা যায় যে, গণতন্ত্রই মানবজাতির সবচেয়ে কল্যাণকর জীবনদর্শন ।

গণতন্ত্রের প্রকারভেদ।

রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক, সরকারী ও বেসরকারী সব ধরনের প্রশাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রয়োগযোগ্য। গণতন্ত্রের যাত্রা থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রায়োগিক এপর্যন্ত ৩২টিরও বেশী প্রকারভেদ দেখা যায়। পরিস্থিতির প্রয়োজনেই এসব প্রকারভেদের জন্মলাভ ও বিকাশ ঘটে। যাহোক, সমকালীন বিশ্বে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত প্রধান প্রধান প্রকারভেদ, যেমন: প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, ধর্মীয় গণতন্ত্র, সরাসরি বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, ই-গণতন্ত্র ও অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রভৃতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। বেশী ভোটে বিজয়ীরা সরকারে যায়, বাকীরা সরকার-বিরোধী ভূমিকা পালন করে। বিশ্বে বিদ্যমান প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রকে ৭ ভাগে বিভক্ত করা যায়। যেমন:

ক। দলীয়-কর্তৃত্ব-প্রধান গণতন্ত্র।   দলীয় রাজনীতিতে এক বা একাধিক দল কোয়ালিশন গঠন করে, নির্বাচিত দলীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার চালায়।

খ। সংসদীয় গণতন্ত্র। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকারের নির্বাহী বিভাগ বা মন্ত্রী পরিষদ গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর নের্তৃত্বে দেশ পরিচালনা করা হয়। আইনবিভাগ বা সংসদের নিকট সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়।

গ। ওয়েস্টমিনিস্টার গণতন্ত্র। যুক্তরাজ্যের দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় পদ্ধতির সরকার যা আদর্শ/মডেল হিসেবে পরিগণিত।

ঘ। প্রজাতান্ত্রিক গণতন্ত্র। জাতি-রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক কাঠামোর সরকার বিশিষ্ট জাতিরাষ্ট্র।ভোটের আগে জনগণ খোলামেলা ও মুক্ত আলোচনা ও বিতর্ক নীতিতে বিশ্বাসী। জনগণ সার্বভৌম। তার গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা আইনের শাসনের ওপর গুরুত্ব দেয়।

ঙ। জ্যাকসনিয় গণতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসন (১৭৬৭-১৮৪৫) প্রবর্তিত ব্যাপক জনপ্রিয়তাপ্রাপ্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় কংগ্রেসের বলে বলিয়ান হয়ে সরকারের নির্বাহী বিভাগ ও প্রেসিডেন্সির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।

চ। গণতান্ত্রিক পরিষদ বা সোভিয়েত। কোন নির্দিষ্ট এলাকার শ্রমিক, কর্মজীবি ও জনগণ সরকার বা প্রশাসন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ হিসেবে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যা প্রত্যাহারযোগ্য (recallable)। স্থানীয় প্রতিনিধিরা আবার তাদের ভোটে আঞ্চলিক প্রতিনিধি পরিষদ গঠন করে। আঞ্চলিক প্রতিনিধিরা তাদের উচ্চতর প্রতিনিধি পরিষদ গঠন করে। এভাবে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদ গঠন করা হয়, যারা দেশের সর্বোময় কর্তৃত্ব ধারণ করে। রুশ ভাষায়, এর নাম সোভিয়েত। একে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রও বলা হয়; আবার সর্বহারার একনায়কতন্ত্রও বলা হয়।

ছ। সমগ্রতাবাদী গণতন্ত্র। কোন রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার জন্য একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করে, যেখানে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের  বৈধ প্রতিনিধিদের হাতে দেশের সর্বোময় কর্তৃত্ব অর্পণ করে। এ ব্যবস্থায় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা হয়না।

জ। উদারনৈতিক গণতন্ত্র।   জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত  আইনের শাসন দ্বারা নির্ধারিত হয়, যা প্রধানত এমন এক সংবিধান দ্বারা প্রবর্তিত হয়, যেখানে ব্যক্তি অধিকার, মতামতের স্বাধীনতা সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। এই ব্যবস্থা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বাধিক সংখ্যক নাগরিকের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে।

ঝ। আধিজাতিক গণতন্ত্র।   ইউরোপিয় মন্ত্রী পরিষদে রোম চুক্তি অনুসারে এই পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর নাম Qualified majority voting (QMV) পদ্ধতি। এতে জনসংখ্যা অনুপাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে মন্ত্রীনিয়োগের বন্টনব্যবস্থা করে দেয়া হয়, তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়। এটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হলেও মন্ত্রীপরিষদের সদস্য সরাসরি ভোটের বদলে মনোয়নের মাধ্যমেও নিয়োগ করা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আধিজাতিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের এ এক উত্তম দৃষ্টান্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদ সদস্যরা সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়।

২। ধর্মীয় গণতন্ত্র। কোন দেশের বা রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিশেষ ধর্মাবলম্বী হলে, সে দেশের জনগনের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশাসনের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক উপায়ে আইন-কানুন ও বিধি-বিধান প্রণয়নের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করার নামই ধর্মীয় গণতন্ত্র। কোন বিশেষ ধর্মীয় গণতান্ত্রিক দেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও তাদের নিজ ধর্মীয় আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপনের অবাধ সুবিধা পেতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাস গণতন্ত্রকে ব্যাহত করেনা। তবে ইহবাদী ও রক্ষণশীল ধর্মবাদী উভয়েই ধর্মীয় গণতন্ত্রের বিরোধী। ধর্মীয় গণতন্ত্রের প্রচলন অতীতেও ছিল বর্তমানেও রয়েছে। যেমন:

ক। অতীতে ছিল এমন ঐতিহাসিক গণতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে: (১) এথেনিয় গণতন্ত্র, যাতে প্রাচীন গ্রীক ধর্মীয় আইন প্রচলিত ছিল। (২) রোম প্রজাতন্ত্র, যেখানে প্রাচীন রোমান ধর্মীয় আইন প্রচলিত হয়। (৩) বৌদ্ধ গণরাজ্য, যাতে বৌদ্ধ ধর্মের নীতি আইন হিসেবে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন লৌহযুগে (খৃষ্টপূর্ব ১২০০-২৭২) গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চল তথা আজকের বাংলাদেশ, ভারতের আসাম, বিহার, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ এবং নেপালের দক্ষিনাঞ্চল মাধেশ পর্যন্ত বি¯তৃত অঞ্চলে বৌদ্ধ গণরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় যার প্রাচীন নাম ছিল: মহাজনপদ, মগধ, নন্দ ও মৌর্য সাম্রাজ্য। আধুনিক ভারতেরও আরেক নাম ভারত গণরাজ্য। (৪) আইসল্যান্ড কমনওয়েলথ, যেখানে ১০০০ খৃষ্টাব্দের পর নরদিক পেগান ধর্মের নীতিই ছিল আইন। (৫) প্রাচীন সুইস কনফেডারেশন, যেখানে খৃস্টান ধর্মীয় নিয়ম-কানুনই ছিল রাষ্ট্রিয় আইন।

খ। বর্তমানে নিম্নে বর্নিত দেশসমূহে রাষ্ট-্রধর্ম ভিত্তিক গণতন্ত্র প্রচলিত: (১) খৃস্টান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রÑ  গ্রীস, আর্জেটিনা, বলিভিয়া, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য বা গ্রেট ব্রিটেন। (২) ইসলামি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রÑ আফগানিস্তান, আলজিরিয়া ও ইরান। (৩) ইহুদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রÑ ইসরায়েল।

গ। ইসলামি গণতন্ত্র।  ইসলামি দেশ বা রাষ্ট্র হিসেবে সুপরিচিত কিংবা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ও প্রভাবশালী ইসলাম ধর্মাবলম্বি দেশে সরকার পরিচালনায় যে গণতান্ত্রিক ধারা চর্চা করা হয়, তাকে ইসলামি গণতন্ত্র বলা যায়। বর্তমানে এরূপ দুধরনের ইসলামি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রয়েছে। 

(১) আলজিরিয়া , ইরাক, কুয়েত, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, মিশর, লিবিয়াসংযুক্তআরব আমিরাতসুদান, সোমালিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকার করা হয়। এসব দেশে গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতিও অনুসরণ করা হয়। এসব দেশের ইসলামি মূল্যবোধ সরকারীভাবে পালিত হয়। মুসলমানদের জন্য শরিয়তী আইনের পাশাপাশি অন্যান্য নাগরিকদের জন্য আলাদা আইনও প্রচলিত রয়েছে। এ কারণে এসব দেশকে ইসলামি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যায়।

(২) কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যদি শরিয়তী আইন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাকেও ইসলামি গণতন্ত্র বলা যায়। এ ধরণের ইসলামি গণতন্ত্রে সকল রাষ্ট্রিয় কর্মকান্ডে কোরান ও সুন্নাহকে অনুসরণ করা হয়। যেমন- আফগানিস্তান, ইরান, ইয়েমেন, ওমান, পাকিস্তান, বাহরাইন, মৌরিতানিয়া, তুরস্ক, জর্দান, মরক্কো, নাইজিরিয়ার উত্তরাঞ্চল প্রভৃতি দেশে শরিয়তী আইন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলেও আংশিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। তবে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রীরা একে গণতন্ত্র বলে স্বীকার করেনা।

এছাড়া আরও কতেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আছে, যারা সাংবিধানিকভাবে ইহবাদী গণতান্ত্রিক। তবে ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব সেসব দেশে প্রবল এবং ইসলামি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মৌলবাদী জঙ্গী তৎপরতা মাঝে মাঝে পরিলক্ষিত হয়। এমন দেশগুলো হচ্ছে:  আজারবাইজান, আলবেনিয়া , ইন্দোনেশিয়াউজবেকিস্তান , কসভো, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, গিনি, গ্যাম্বিয়া, জিবুতি, তাজিকস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তুরস্ক, বসনিয়া-হার্জেগোবিনা, বাংলাদেশ , বার্কিনা ফাসো, মালি, সা-দ, সেনেগালপ্রভৃতি।

মধ্যযুগে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনকালে ইসলামি বিশ্বে উদারতাবাদ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বা অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র  ব্যাপকভাবে প্রবর্তিত ছিল। উদাহরণ স্বরূপ, হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর সময় মদিনায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। খোলাফায়ে রাশেদীনগণও উদার গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করতেন। এই প্রক্রিয়া পরবর্তিকালে শিয়া-সুন্নী বিভাজনের ফলে ক্রমশ বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমান বিশ্বে মোট ৪৭টি ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী দেশের তালিকা নিম্নে দেয়া হল। এর মধ্যে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষিত ৭টি , রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষিত ১৬টি, ইহবাদীঘোষিত ১৭টি এবং কোন কিছুই ঘোষিত নয় এমন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী দেশের সংখ্যা ৭টি। ৩৮টি দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রজাতন্ত্র, এবং বাকী ৯ টি দেশে রাজতান্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র চলছে, তবে খুব শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে। কারণ, বর্তমানে ইসলামি সভ্যতায় পূণর্জাগরণের কাল চলছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর সাম্প্রতিক গণজাগরণে তার লক্ষণ সুস্পষ্ট।

সরাসরি বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র আদি নাম বিশুদ্ধ গণতন্ত্র। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণ, কোন রকম প্রতিনিধি বা মাধ্যম ছাড়াই, সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে সরকারী সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করতে পারে । আবার, নির্বাচিত প্রতিনিধির  মাধ্যমেও  মতামত রাখতে পারে। এ ক্ষত্রে গণতন্ত্র কেবল ভোটাভুটি নয়, বরং জনগণকে সত্যিকার ক্ষমতায়ণের প্রক্রিয়া হিসেবেও কাজ করে। সরাসরি বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জনগণ ব্যক্তিগতভাবে: (১) শাসনতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তন করতে পারে; (২) স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে, ভোট দিতে পারে এবং আইন প্রণয়নের জন্য সরাসরি প্রস্তাব রাখতে পারে; এবং (৩) সর্বোপরি, নির্বাচিত প্রতিনিধির ক্ষমতার মেয়াদ নির্ধারণ বা পরিবর্তন করতে পারে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারে। প্রাচীনকালে এথেনীয় গণতন্ত্র এরকম ছিল এবং উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে এখনও এ ব্যবস্থা চলছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটে দু’কোটি ভোটার ও সুইজারল্যান্ডে পঞ্চাশ লক্ষ ভোটার সরাসরি ভোট দেয়। সুইজারল্যান্ডের ক্যান্টনে বা স্থানীয় পর্যায়ে এবং কম্যুনিটিতেও এ ব্যবস্থা চালুআছে। কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত যে কোন প্রতিষ্ঠানে সরাসরি গণতন্ত্র সবচেয়ে ফলদায়ক।

গণতন্ত্র  ই-গণতন্ত্র সর্বসাম্প্রতিক। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইনস্টিট্যুট অব টেকনোলজি, মেটাগবর্নমেন্ট নামক প্রকল্পের মাধ্যমে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে এবং এখনও গবেষণা চলছে। ইতোমধ্যে তারা অনেক সফটওয়্যার তৈরী করেছে। এটি সরাসরি গণতন্ত্র হিসেবে গণ্য। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে সর্বোতভাবে এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে আংশিকভাবে এর প্রচলন খুব দ্রুত বাড়ছে। ই-গণতন্ত্র একটি বিকাশমান নতুন ধারা। তাই এটি আলাদা আলোচনার দাবি রাখে। 

এর অর্থ  ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির সাথে গণতন্ত্র যুক্ত হয়ে ই-গণতন্ত্র। অর্থাৎ ই-মেইল, ওয়েবসাইট, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ভোট দেয়ার মেশিন  ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তি বা নাগরিক তার মতামত ও ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ ও কর্তব্য সম্পাদন করা বুঝায়। তার মানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাথে রাজনৈতিক, জনসেবা ও শাসন পদ্ধতি বা সরকারী নীতির সমন্বয় ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পরিচালনা করা। এর অন্তর্ভুক্ত থাকে সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান: যেমন- কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকার, সরকারী ও  স্বায়ত্ত্ব-শাসিত সংস্থা প্রভৃতি; এবং গণতন্ত্রের   কর্মীবৃন্দ : যেমন- মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, কমিশনার, চেয়ার পারসন, মেম্বার ইত্যাদি; মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা; গণমাধ্যম; রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক ও অদলীয় সংস্থা বা সংগঠন এবং সর্বোপরি নাগরিক তথা ভোটারবৃন্দ। 

লক্ষ্য ই-গণতন্ত্রের লক্ষ্য ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সহ অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিনিধিত্বশীল, অংশীদারিত্বমুলক ও প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করে নাগরিক ও ভোটার বা জনগণকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অধিকতর সরাসরি অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ জনসেবা ও জনপ্রশাসন নিশ্চিত করা।

বৈশিষ্ট্য  ই-গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যাবলী সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

(১)  সবচেয়ে শক্তিমান প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র যার মাধ্যমে জনগণ শাসনতান্ত্রিক/সাংবিধানিক (খবমরংষধঃরাব) কার্যক্রমে সরাসরি অবদান রাখতে পারে। এটি বিচার-বিবেচনা, মন্ত্রণা ও পরামর্শ প্রদানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অনেকে একে অবাধ উৎস বা খোলামেলা ও সহযোগিতামূলক গবর্নেন্স বলেও আখ্যায়িত করেন।

(২)  সরাসরি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন ও ভোট প্রদান করা। নাগরিকগণ সরাসরি সংবিধান ও আইন প্রণয়নে, সংশোধনেও হাল-নাগাদকরণে মতামত রাখতে পারেন। এমনকি, প্রয়োজনে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার (ৎবপধষষ) করতে পারেন।

(৩)   প্রতিনিধির  মাধ্যমেও  সরাসরি মতামত বা ভোট দেয়া যায়। যেমনÑ তনিমা, শৈলী ও শ্রেয়াণ তিনজন মিলে তাদের বন্ধু জাহিদকে তাদের পক্ষে মতামত দেয়ার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারে। আবার প্রয়োজনে তা প্রত্যাহার করে আরেক বন্ধু সাফিরকেও নিয়োগ দিতে পারে।

ঘ। প্রসার।  ই-গণতন্ত্র বা ডিজিটাল গণতন্ত্র অপেক্ষাকৃত নতুন একটি ধারণা হলেও ইন্টারনেট বা অন্তর্জালের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। দিন দিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এর প্রয়োগের আগ্রহ বাড়ছে। নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীগণ ও ভোটদানে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনে এখন এই পদ্ধতি ব্যবহারে অধিক আগ্রহী, বিশেষ করে তরুণ সমাজ। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায়, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানীতে এই কার্যক্রম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এগুচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৫০% ও যুক্তরাজ্যে ৬৫% ভোটার এখন এর মাধ্যমে ভোট দেয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এখন ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। সরকারী ও বেসরকারী সংস্থা, গবেষণা সংস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা প্রয়োজনে জনগণের মতামত নিচ্ছে। জনগণও এর মাধ্যমে তাদের চাহিদা ও  দাবী-দাওয়া নিয়ে দেন-দরবার বা আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। সর্বশেষ ঘটনা, সাম্প্রতিক জানু/ফেব্রু ২০১১ সালে তিউনিশিয়া, মিশর, লিবিয়া, বাহরাইন, ইয়েমেন, সিরিয়া ও  ইরানসহ উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইন্টারনেট প্রযুক্তির (ফেসবুক ও টুইটার) মাধ্যমে সরকার বিরোধী অহিংস গণ-আন্দোলন (মিশর) কিংবা সহিংস অভ্যুত্থান (লিবিয়া) সংগঠিত করছে।

সামাজিক গণতন্ত্র (Social Democracy)  

সামাজিক গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক আদর্শ/মতবাদ। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্রমান্বয়ে সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক/ব্যবস্থা কায়েম করা এর লক্ষ্য। অন্যকথায়, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সার্বজনীন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন এবং যৌথ দরকষাকষি প্রথার মাধ্যমে দাবী আদায়ের পলিসির নাম সামাজিক গণতন্ত্র। বিশ শতকের শেষার্ধে পশ্চিম ও উত্তর য়ুরোপে এভাবেই এটি সামাজিক মডেল/আদর্শ এবং অর্থনৈতিক পলিসি রূপে খ্যাতি লাভ করে।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে সমাজবাদীরা বিপ্লবী ও সংস্কারবাদীতে ভাগ হয়ে যায়। তার পর থেকে সামাজিক গণতন্ত্রীরা শান্তিপূর্ণ এবং বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সমাজন্ত্রে রূপান্তর করার কথা বলে আসছেন। তারা আইনের শাসনাধীন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বমূলক সাংবিধানিক সরকারের ওপর দৃঢ় আস্থা পোষণ করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকতার বাইরেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের যথেষ্ট মতামত রাখার অধিকার নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে মতামত রাখেন এবং তা প্রবর্তনে সহায়তা করেন। সামাজিক গণতন্ত্র মিশ্র অর্থনীতির সমর্থক এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি অথবা পুরোপুরি পরিকল্পিত অর্থনীতির বিপক্ষে। তারা মনে করেন, এমন অর্থ ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অসমতা (inequality), দারিদ্র্য এবং বিভিন্ন শ্রেণিগত শোষণের সুযোগ না থাকে। তার জন্য তারা মিশ্র অর্থনীতিকেই যথার্থ/উপযুক্ত মনে করেন।

সামাজিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান প্রধান পলিসিগুলোর মধ্যে রয়েছে সার্বজনীন সামাজিক অধিকার। যাতে সবাই সব ধরণের সামাজিক সেবার সুযোগ যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ, শিশুর যত্ন ও বুড়োদের ভরণপোষণ সমভাবে পায়।সামাজিক গণতন্ত্র ট্রেড ইউনিরনের মাধ্যমে শ্রমিক আন্দোলনের সম্ র্থক এবং শ্রমজীবীদের যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গগত দাবি আদায়কে সমর্থন করে। বেশীরভাগ সামাজিক গণতন্ত্রী দলগুলো আন্তর্জাতিক  ‘সোশ্যাল ইন্টারন্যাশনাল’এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

সামাজিক গণতন্ত্র’-এর যাত্রা শুরু হয় জার্মানিতে ঊনিশ শতকে। কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেল্স-এর আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সমাজবাদী এবং সাম্যবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ, এবং ফার্ডিনান্ড ল্যাজেল (Lassalle) এর সংস্কারবাদী সমাজবাদী মতাদর্শ  দুটোই সামাজিক গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। ১৮৬৮ থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত এ দুই মতবাদের অনুসারীরা রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রভাব খাটানোয় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ১৮৬৯ সনে জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ওয়ার্কার্স পার্টির অফিসিয়াল ভিত্তি হয়    মার্ক্সবাদ। ১৮৭২ সনের হেগে (Hague) অনুষ্ঠিত সম্মেলনে কার্ল মার্ক্স স্বয়ং বিপ্লব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে ঘোষণা করেন, ‘শ্রমিক শ্রেণি তাদের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণভাবেও অর্জন করতে পারেন। তবে এটি সবদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’ অর্থাৎ যে সব দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান মজবুতভাবে গড়ে উঠেছে, সেসব দেশে সংস্কারবাদী ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়া যেতে পারে। মার্ক্স সার্বজনীন ভোটধিকারের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকায় কারণে প্যারিসের কমিয়ুন প্রথাকে/ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন।

ব্রিটেনে ঊনিশ শতকের শেষ দশকে মার্ক্সের প্রভাব ছাড়াই সামাজিক গণতন্ত্র চালু হয়। তার কারণ, ১৮৮৪ সনে ফ্রাঙ্ক পদমোর (Frank Podmore)  ‘ফেবিয়ান সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করে সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য ক্রমবিবর্তন এবং সংস্কারের পদ্ধতির উপর গুরুত্বারোপ করেন। ফ্যাবিয়ান মতবাদ বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েমের কথা বলা শুরু করে তার কারণ মার্ক্সবাদের সংশোধনবাদী এডুয়ার্ড বার্নস্টেইনের (Eduard Bernstein) এর প্রভাবে। বার্নস্টেইন মার্কস ও এঙ্গেলস-এর অনেক তত্ত্বকে অশুদ্ধ (inaccurate) অথবা অচল বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি সমাজতন্ত্র ও কট্টর/রক্ষণশীল মার্ক্সবাদী যু্ক্তি যেমন সমাজবাদী বিপ্লব এবং শ্রেণি সংঘাতের-এর বিরোধীতা করেন। তিনি এর বিপরীতে দাবী করেন যে, সমাজে বিদ্যমান সকল শ্রেণির মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভবন। তিনি বলেন যে, একটি সুদীর্ঘ সময়ের, সরকারী, সমবায়ী এবং ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এন্টারপ্রাইজগুলো নিজেদের প্রচেষ্টায় এক সময়সমবায়ী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে।

১৯৩১ এর দশক থেকে সামাজিক গণতন্ত্র মারক্সবাদের সঙ্গ ছেড়ে উদারনৈতিক সমাজবাদের দিকে ঝুঁকতে থাকে । ঐ দশকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী উদারনৈতিক ও সামাজিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে মিত্রসম্পর্ক জনপ্রিয়তা অর্জন করাও অন্যতম কারণ। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আগুনে ঘি ঢালার মতো বার্নস্টেইনের  ‘নিয়ন্ত্রিত/সংগঠিত উদারতাবাদ’(organized liberalism) যার আরেকনাম সমাজতন্ত্র।এ ধারণা মার্ক্সের উদারতাবাদ বিরোধীতাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপের বেশিরভাগ  ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যোর্টরা, পুঁজিবাদের রূপান্তরে সংস্কারবাদী সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে গ্রহণ করতে থাকেন। বিশ্বের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর মধ্যে তৃতীয় বারের মতো বিভাজন হয় ১৯৯০ এর দশকে। তাদের একদল নিজেদেরকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বলে দাবি করেন, অন্যরা বলেন তাদেরকে নব্যউদারতাবাদ (neoliberal)। সম্প্রতি আরেকটি বিভক্ত অংশ বাজার সমাজতন্ত্রের (market socialism) প্রস্তাবক। নব্যউদারতাবাদীরা চায় অর্থনৈতিক উদারনীতি- মুক্ত বানিজ্য হা ফ্রি ট্রেড, খোলাবাজার, প্রাইভেটাইজেসন, ডিরেগুলেশন করে প্রাইভেট সেক্টরের ভূমিকা বাড়িয়ে আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে। বাজার সমাজতন্ত্র এক ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা/পদ্ধতি যেখানে উৎপাদনের উপকরণ মালিক হবে হয় সরকার অথবা সমাজ। তার রূপ হবে সমবায় এবং বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় তা কার্যকরী হবে।

 

অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে গণতন্ত্রেরও তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিবর্তন ঘটেছে। সমকালীন বিশ্বে অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র (Participatory Democracy) ধারাটি খুবই জনপ্রিয় এবং অগ্রসরমান। তাই এটি একটু বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

সংজ্ঞা অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র-এর অর্থ সঙ্গী হওয়া, সহযোগী হওয়া, শরিক হওয়া ও বন্ধু হওয়ার সুযোগ আছে বা থাকে এমন ধরনের গণতন্ত্র। এটি একটি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি যা কোন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বা সিস্টেমে বৃহত্তর জনগণের সকল অংশের ব্যাপক অংশগ্রহণ সহজ এবং কাজ করার সুযোগ করে দিতে পারে। গণতন্ত্রের মৌলিক অর্থ যেহেতু ‘জনগণের ক্ষমতা’, সেহেতু সবধরনের গণতন্ত্রেই জনগণের অংশীদারীত্ব সাধারণভাবে থাকে। তবে, প্রচলিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনগণ কেবল রাজনীতিকদের ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করে; ভোট পেয়ে যেসব রাজনীতিক ক্ষমতাসীন হয়, তাদের প্রতি জনগণের নিয়ন্ত্রণাধিকার থাকে না। এমতাবস্থায়, জনগণের সেবার নামে ভোট পেয়ে যদি তারা জনগণের সেবক না হয়ে প্রভূ কিংবা স্বেচ্ছাচারী শাসক হয়ে যায়, তখন বৃহত্তর গণআন্দোলন ও সহিংসতা ছাড়া তাদেরকে হটাবার অন্য কোন উপায় থাকে না। এতে অস্থিরতা, অশান্তি, জীবন ও জাতীয় সম্পদ নষ্ট, হিংসা হানাহানি প্রভৃতি নেতিবাচক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই নেতিবাচক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র কার্যকরী। এই পদ্ধতিতে যে কোন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বা দলের সকল সদস্য সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়। কারণ, এই প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী তথ্য জনগণ, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় সহজে পেতে পারে।

রাজনৈতিক রূপভেদ অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিভাষায় পরিচিত। এর সমার্থক অন্যান্য প্রচলিত পরিভাষা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(তৃণমূল গণতন্ত্র এটি বিকল্প পরিভাষা। এরও লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ প্রক্রিয়া একই। সম্প্রতি এর সাথে নতুন নতুন প্রযুক্তিগত ধারণার পরিভাষাও যুক্ত হয়েছে: যেমন- শাসন প্রক্রিয়ার মুক্ত উৎস (Open source governance), সহযোগিতামূলক শাসন পদ্ধতি (ঈড়ষষধনড়ৎধঃরাব মড়াবৎহধহপব), মুক্ত রাজনীতি (Collaborative governance) এবং এর সাথে অত্যন্ত দ্রুত যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক তথ্য প্রযুক্তি। উদ্ভাবিত হয়েছে তার বিভিন্ন হাতিয়ার যেমন- উইকি (Wikis) এবং উইকি সরকার (Wikigovernment) ইত্যাদি।

(অংশীদারিত্বের রাজনৈতিক সরকার (Parpolity)। এটি একটি দীর্ঘ পরিসরবিশিষ্ট রাজনৈতিক তত্ত্ব। এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত থাকে উপরোক্ত বহুমুখী প্রচেষ্ঠা যার সাহায্যে যতদূর সম্ভব জনগণকে সরাসরি এক করে সামনাসামনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করানোর চেষ্টা করা হয়।

(প্রত্যেক ব্যক্তির শাসন  (Panocracy)। এটি খুবই সাম্প্রতিক তত্ত্ব। এই নীতি অনুসারে, যেহেতু সব মানুষ সমান, নিজ-স্বার্থ রক্ষা করার অধিকার তার জন্মগত, তাই তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিবে। তবে তার বৈধ ও প্রকাশ্য অনুমতি নিয়ে তার প্রতিনিধিও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এটিও একধরনের অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র। তবে এটা জনগণ বা জনগণের পক্ষে কারো একক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বাস করেনা । তারা মনে করে যে, বিভিন্ন  ব্যক্তির মতামত বিভিন্ন রকমেরই হবে এবং প্রত্যেকেরই মতামতই সমান গুরুত্ব বহন করে। বহুজনের এক সিদ্ধান্ত বা বহুজনের পক্ষে হয়ে দলীয় শাসন মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

() লটারী ভিত্তিক গণতন্ত্র (Demarchy or Lottocracy)। লটারী ভিত্তিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, দৈবচয়ন বা এলোমেলোভাবে (randomly) জনগণের মধ্য থেকে পলিসি মেকার নির্বাচিত করা হয়, যাদেরকে ‘পলিসি জুরি’ বা ‘নাগরিক জুরি’ বা ‘ঐক্যমতের সম্মেলন’ বলা হয়। তারা অপরাধ সংক্রান্ত মামলা বা ক্রিমিনাল কেইসের জুরিদের মতো স্বেচ্ছায় দেশ পরিচালনায় সুচিন্তিত মতামত দেয়। এটি একটি অনুমান নির্ভর প্রশাসন ব্যবস্থা। ছোট ছোট স্বায়ত-শাসিত গ্রুপে ভাগ হয়ে বা বিকেন্দ্রীভূত হয়ে এরা কাজ করে। প্রত্যেক গ্রুপ সমাজের একটি নির্দিষ্ট কাজ বা একাধিক কাজের জন্য দায়ী থাকে। এই পদ্ধতির সরকারের নির্বাচনের প্রয়োজন হয়না। তবুও এটি একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক উপায় হিসেবে পরিগণিত। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও অন্টারিও প্রদেশে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে। এই ব্যবস্থা অংশীদারিত্বের গণতন্ত্রের সমার্থক বলে গন্য করা হয়।

গ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও সমাজে অংশীদারিত্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলন

শুরুতেই উল্লেখ করেছি যে, অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র ধারণাটি বর্তমানে খুব জনপ্রিয় এবং অগ্রসরমান। প্রমাণ স¦রূপ, আফ্রিকা, আমেরিকা এশিয়া সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংঘটিত ও চলমান এ রকম কয়েকটি আন্দোলনের বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হল।

দক্ষিণ আফ্রিকা

() বস্তী উচ্ছেদবিরোধী প্রচারাভিযানএইসি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ-টাউনের পশ্চিমাঞ্চলে হতদরিদ্র, বঞ্চিত ও শোষিত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বস্তী উচ্ছেদ-বিরোধী জঙ্গী আন্দোলন ‘এইসি’ ((Anti-Eviction Campaign-AEC)। ২০০০ সনের নভেম্বরে এটি শুরু হয়। তখন তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বস্তি উচ্ছেদ প্রতিরোধ করা, ব্যবহারিক ও পানীয় জল ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিদ্যুত সরবরাহ করা, বাসযোগ্য আবাসনের ব্যবস্থা করা এবং পুলিশী নির্যাতন প্রতিরোধ করা। বর্ণবাদ উচ্ছেদের পর এটি ‘নয়া সামাজিক আন্দোলন’ হিসেবে খ্যাতি পায়। কোন রকম ‘সর্বহারার ভ্যানগার্ড’ এনজিও কর্মীর খবরদারীর তোয়াক্কা না করে বস্তিবাসীরা নিজেরাই সরাসরি সহিংস আন্দোলনের অবতারণা করে। তারা মনে করে মধ্যবিত্তরা গরীব মানুষের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি বিশ্বস্ত নয় বরং তাদের নিজ-স্বার্থ রক্ষায় তৎপর। এইসি-ই গরীব জনগণের ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা, তারা অন্যান্য সমমনা সংগঠনের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়া বর্জন করে। সকল ধরনের নির্বাচনী রাজনীতি বয়কট করে জনগণের বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষমতায়ণের প্রতি দৃঢ় আস্থা স্থাপন করে। বর্তমানে এইসি দশটিরও বেশী বিভিন্ন শ্রম-কর্ম ও পেশাজীবি সংগঠনের সমন্বয়ে এক বিশাল ছাতার আকার ধারণ করেছে এবং এর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। 

এইসি’র ছাতার মতো সাংগঠনিক কাঠামো একটি কার্যকরী কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় । একজন চেয়ারপারসন, একজন ভাইস-চেয়ারপার্সন, একজন সচিব, ভাইস-সচিব, ট্রেজারার এবং পাঁচজন আঞ্চলিক কোঅর্ডিনেটর নিয়ে কমিটি গঠিত। বর্তমান চেয়ারপার্সন ২০১০ সনের নভেম্বরে নির্বাচিত হন; তাঁর নাম ম্সিডিসি তোয়ালো ((Mncedisi Twalo))।

এইসি আবাসন ব্যবস্থা না করে বস্তি উচ্ছেদ না করা বা বিলম্বিত করা এবং ব¯িতবাসীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করার জন্য কর্তৃপক্ষকে চাপ দেয়। তাদের আন্দোলনের পদ্ধতি: আইনী ব্যবস্থা বা মামলা করা, ব্যাপক প্রচারাভিযান, বস্তিবাসীদের শিক্ষার উদ্যোগ নেয়া এবং তাদেরকে ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন আর্থিক ও সামাজিক কর্মসূচী গ্রহণ করা প্রভৃতি। এ আন্দোলনের প্রধান শ্লোগান No Land! No House! No Vote!  (আমরা জমি আর ঘর না পেলে তোমরাও ভোট পাবে না! )

দক্ষিণ আফ্রিকার বস্তি উচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রভাব খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও পড়ে। মিয়ামির `Take Back the Land’ এবং শিকাগোর `Anti-Eviction Campaign’  আন্দোলন তার দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়।

() লাল শার্ট আন্দোলন  দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রামের ভূমিহীন এবং শহরের বস্তিবাসীরা  ২০০৫ সনে এ আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল গ্রামের গরীব চাষী ও ভূমিহীনদের এবং শহরের বস্তিবাসীদের ভূমি ও আবাসনের উপযোগী খাস জমি বন্টন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, হতদরিদ্রদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সমাজের নীচু তলা থেকে গণতন্ত্রায়ণ, শহরের ভূমির বাণিজ্যিক মূল্যের চেয়

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: