এক অসহায় মায়ের আর্তনাদ আর বাবার বুকে জমে থাকা কষ্ট! (পর্ব-১) | আমাদের নাঙ্গলকোট
সর্বশেষ সংবাদ
◈ বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুনাবলী ও ধর্মীয় চেনতা-মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ ◈ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন সব ছুটি বাতিল! ◈ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া সেই লিগ্যাল নোটিশ প্রত্যাহার ◈ কুমিল্লায় মাদ্রাসার কম্বলের নিচ থেকে শিশুর মরোদেহ উদ্ধার, মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ ◈ কুমিল্লার তিতাসে সংখ্যালঘু পরিবারের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ ◈ বাঙ্গড্ডায় সন্দেহ হওয়ায় পরিচয় জানতে চাইলে পিকআপ ভ্যান রেখে চালক উধাও ◈ ইটভাটার কালোধোঁয়ায় নাঙ্গলকোটে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি ◈ ঠিকানা খুঁজে পাওয়া গেল হারিয়ে যাওয়া শারমিনের ◈ কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল ছাত্রের প্রাইভেটকার চাপায় মৃত্যু ◈ সেবাই আমার কর্ম, মোঃ হেলাল উদ্দিন ভূইয়া ◈ নাঙ্গলকোটে নিজ ঠিকানায় ফিরে যেতে চায় শারমিন ◈ কুমিল্লায় সিজার করার ৫মাস পর পেট থেকে বের করা হলো গজ ◈ মেঘনায় হঠাৎ ফেরিতে আগুন, পুড়ে গেল ৬ট্রাক

এক অসহায় মায়ের আর্তনাদ আর বাবার বুকে জমে থাকা কষ্ট! (পর্ব-১)

7 December 2020, 10:22:09

বাপ্পি মজুমদার ইউনুস

জুলুমের শাস্তি না পেয়ে কেউ মরবে না। আল্লাহ তায়াআলা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে তুলে নেন এবং তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেন। মহান রব বলেন, আমার সম্মানের শপথ, কিছুটা বিলম্ব হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৯৮)

 

জুলুম একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো নির্যাতন বা অবিচার। সাধারণ অর্থে কাউকে অন্যায়ভাবে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক বা যেকোনো পন্থায় অবিচার বা নির্যাতন করা।

পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা জুলুমের ব্যাপারে মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অচিরেই জালিমরা জানতে পারবে, তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল কোথায় হবে।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ২২৭)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জালিমরা কখনো সফলকাম হয় না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৭)

 

মাথা গুলিয়ে যায়।কষ্ট পাই খুব।ইচ্ছা হয় একবার তাদের বলি, এ তোরা কি করছো বাপ। যে মা তোমাকে জন্মদিলেন সে মা আজ নাখেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন? যে বাবা উচ্চশিক্ষা শেষে তার সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে তোমাকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বপ্নের গন্তবে,যিনি নিজেও ছিলেন এমজন সফল ব্যক্তি তাকেও আজ এই কষ্ট নিয়ে মরতে হয়েছে। বড় সন্তানের সামর্থ্য থাকলেও নিজের চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় প্রিয় স্ত্রী চোখের জল ফেলবেন? তাহলে কেন এ মায়ার জাল,মোহাচ্ছন্নতা? অথচ এ সেদিন‌ও সন্তানের সফলতা ও উঠে দাঁড়াবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন!।

 

বাবা-মা এর মত আপন পৃথিবীতে কেউই হয় না । যারা সারাজীবন কষ্ট করে নিজের সন্তানকে মানুষ করে । নিজে খেয়ে না খেয়ে নিজের সন্তানদের জন্য ভাল খাবার যোগাড় করে । সন্তানকে মানুষ করার জন্য যিনি সারাটি জীবন সংগ্রাম করেছেন । সেই মানুষটা যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কষ্ট করে জীবন যাপন করে, তাহলে সেই সন্তানের বেঁচে থাকাই বৃথা ।

 

আজ যার কথা বলবো, তিনি ছিলেন একজন বেসরকারি চাকুরীজীবী । নাম তাঁর সিদ্দিকুর রহমান, স্ত্রী আবিয়া খাতুন। পাঁচ সন্তানের জনক। তিন ছেলে দুই মেয়ে। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কলকাতায় চাকরি করতেন জনাব সিদ্দিকুর রহমান। বর্ণাঢ্য জীবন যাপনে ছিল মানবিকতা। বিশাল সম্পদের অধিকারী ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আর ফিরে যেতে পারেননি নিজ কর্মস্থলে। সন্তানদেরকে নিয়ে নতুনভাবে জীবন যাপন করতে শুরু করেন গ্রামের বাড়ি নাঙ্গলকোটে। ভালো কোন চাকরি না পাওয়ায় নিজের জমানো সম্পদ ধীরে ধীরে সন্তানদের বিলিয়ে দিতে থাকেন। বড় সন্তানের পিছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে জনাব সিদ্দিকুর রহমান। ছেলেকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলে একজন ভালো পরিবারের মেয়েকে ঘরে তোলেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ছেলের আর্থিক অবস্থা ভালো হলে সপরিবারে পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। বড় সন্তান আবুল হাসেম সেও পাঁচ সন্তানের জনক। দুই ছেলে তিন মেয়ে নিয়ে তার সংসার। সিদ্দিকুর রহমানের সামর্থ্য অনুযায়ী দুই মেয়েকে উপযুক্ত পাত্রস্থ করেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে এসে কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং স্ত্রী ও নিজের ভরণপোষণ সহ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন। এই সম্পদ গুলো ছিল তাও সন্তানদেরকে সময় পাবে বন্টন করে দিলেন। মেয়েদের কোথায় পাব সম্পদ বুঝিয়ে দিলেন। যদিও ভাইয়েরা পরবর্তীতে তাদের সাথে ঝামেলা করতে বসে। বেশি করে বড় সন্তান।

 

মেজো ছেলের‌ও এক‌ই অবস্থা। বাবা মাকে রেখে পাড়ি জমান ঢাকায় এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করে সেখানে আজ অব্দি। বাবার পছন্দের মেয়েকে তালাক দিয়ে বিয়ে করেন অন্যথায় এবং সেখানে এখন পর্যন্ত রয়েছে। প্রথম ঘরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বর্তমানে সে বাপের বসতিতে জীবনযাপন করছে দারিদ্রসীমা। সামর্থ্য অনুযায়ী দাদা-দাদির পাশে আছে নাতি। সিদ্দিকুর রহমানের মৃত্যুর সময় এসেছেন, হয়তো মায়ের মৃত্যুর খবর পেলে আবার আসবে।

 

সিদ্দিকুর রহমানের ছোট ছেলে বাবা মার সাথে দীর্ঘদিন বসবাস করে এবং পরবর্তীতে অনেক দেনা মাথায় নিয়ে অবশেষে সেও পাড়ি দেন চট্টগ্রামে। বৃদ্ধ বাবা-মা পড়ে থাকেন আপন ঠিকানায়। এতোটুকু বয়স হয়েছে আমার এবং নিজেরও পরিবার সন্তান রয়েছে কিন্তু কখনোই সিদ্দিকুর রহমান ও তার স্ত্রী কে অন্যায়ভাবে কোন কিছু করতে দেখিনি। সমাজে তাদের যথেষ্ট মূল্যায়ন রয়েছে। একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায় তাহলে কেন ওনারা আজকে এত অসহায়? জীবনের শেষ অংশে এসেও শান্তির লেশমাত্র পেল না। মহান মনিব হয়তো শেষ বিচারে তাদেরকে জান্নাতের বাসিন্দা করে নিবেন।

 

দুই মেয়ের সামর্থ্য অনুযায়ী বাবা-মায়ের জন্য এবং সিদ্দিকুর রহমানের স্ত্রী আবিয়া খাতুনের ভাই যথাসাধ্য সাহায্য করেন। বলা যায় তাদের সাহায্যে বেশিরভাগ সময় তাদের জীবন ধারণ হয়েছে। নিজেদের চোখের সামনে কত নির্ধারণ জীবনযাপন দেখেছি তাদের। সমাজে যার যার অবস্থান থেকে তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করেন। কাউকে কৃপণতা করতে দেখিনি।

 

আজ থেকে ২০ বছর আগে বড় ছেলে দেশে বাড়িতে ফিরে আসেন স্বপরিবারে। তার চাকরি চলে যাওয়ার সুবাদে পরিবারকে সেখানে রাখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। পাড়ার মানুষ ভেবেছিল বাবা-মার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সে নেবে কিন্তু না। সে তার মত করে জীবন যাপন করছে। প্রথম অবস্থায় তার স্ত্রী শ্বশুর-শাশুড়ির খবর রাখলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেয়। আবুল হাশেমের উপযুক্ত দুই ছেলে থাকা সত্বেও তারাও বাবার পথ বেছে নেন। তারা ভালো চাকরি করলেও, সুযোগ থাকলেও সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। দাদা দাদির পাশে দাঁড়াতে দেখেনি কেউই।

 

২০১৪ সালে সিদ্দিকুর রহমান পাড়ি দেন পরপারে। আল্লাহ উনাকে কোন মৃত্যুর যন্ত্রনা দেয়নি। খুব সুন্দর ভাবে পরপারে পাড়ি দেন। যাওয়ার আগে একটাই কষ্ট ছিল স্ত্রীর জন্য কিছু রেখে যেতে পারছে না। তার দেখভাল করার জন্য কেউ নেই। মৃত্যুর আগে বড় ছেলেকে ডেকে আনেন, পাশে বসিয়ে সিদ্দিকুর রহমান তার ছেলে আবুল হাশেমকে বলেন, তোর প্রতি আমার কোনো রাগ নেই, অন্তত আমি এখন মৃত্যুশয্যায়, আমার পাশে বসে পবিত্র কোরআন পাঠ কর,মহান আল্লাহতালার বানী শুনে যাতে আমি মৃত্যুবরণ করতে পারি। বাবার পাশে বসে কয়েকদিন কোরআন তেলাওয়াত করেছেন এবং মহান আল্লাহতালা উনাকে নিয়ে যান।

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর বিপত্তি বাদে অন্য জায়গায়, চিন্তা পড়ে যান সিদ্দিকুর রহমানের স্ত্রী, ভিটে ঘর ছাড়া তাদের আর কোন জায়গা নেই। বড় সন্তানের জায়গা থাকলেও সে নিশ্চুপ। কোন কুল খোঁজে না পেয়ে তিনি বলেন, আমার স্বামীকে প্রয়োজনে ঘরের এক কোণে দাফন করা হোক।

পরে জানা যায় সিদ্দিকুর রহমানের চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে উনাকে কবরস্থ করার জায়গা দান করেছেন। মৃত্যুশয্যায় যখন পড়েন তখন উনার সাথে এ বিষয়ে কথা বলেন সিদ্দিকুর রহমান। অবশেষে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উনাকে দাফন করা হয়। জায়গা দানকারীনিও এই দুনিয়াতে আজ নেই, আল্লাহ উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন

 

সারাটি জীবন তিনি নিম্নআয়ের চাকুরী করেছেন । কিন্তু তার চাকুরী নিম্ন আয়ের হলেও তার মনটা অনেক বিত্তশালী ।

অনেক বছর আগের কথা । ছেলে অনেক বড় হবে সেই স্বপ্ন দেখে সিদ্দিকুর রহমান সাহেব তাঁর ছেলেকে ভাল স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন । তিনি এবং তাঁর স্ত্রী খেয়ে না খেয়ে ছেলের পড়াশুনার জন্য টাকা জমাতেন । ছেলে একদিন অনেক বড় অফিসার হবে এই স্বপ্নই তাঁরা সব সময় দেখতেন ।

আজ এত বছর পরে সেই ছেলেটি অনেক বড় চাকুরী করে । অথচ নিজের বাবা মাকে দেখে না । যে বাবা-মা নিজেরা না খেয়ে সন্তানকে বড় করে তুলেছে সে বাবা-মা নাকি তার সমাজে মেশার মত না । তার স্ট্যাটাসের সাথে নাকি তাঁরা যায় না । বাবা মাকে কোন অনুষ্ঠানে নিয়ে যায় না । তার বাসায় কেউ আসলে বাবা-মা কে কখনোই ডাকতেন না ।

সন্তানদের জন্য এত কিছু করার পরেও শেষ জীবনে এসে তাদের শান্তির খোঁজ পেলেন না এমনকি মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানা টুকুও তাদের নেই। সেই জালিম সন্তানদের চোখের কোনায় এক ফোঁটা পানির সন্ধান কেউ পায়নি। সমাজ নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে সমাজের কোন দায়বদ্ধতা নেই। এমন কুলাঙ্গার সন্তানদের স্থান যে সমাজে হয় সেই সমাজ ব্যবস্থা কেমন তা আপনারাই নির্ধারণ করুন।

 

সিদ্দিকুর রহমান এর বড় ছেলে তার বড় মেয়ের বিয়েতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন তা যদি পিতা-মাতাকে দান করতেন তাহলে হয়তো সারা জীবন তারে সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করতে পারতেন। বিয়ের জমকালো অনুষ্ঠান দেখে মালিক পরবর্তীতে তার চাকরি থেকে বের করে দেয়। পরবর্তীতে দেখা যায় তার জীবনের কিছু ছন্দপতনের।

 

 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্পটি সাজিয়েছি। এখানে যেমন পিতা-মাতার কষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং সমাজের বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোকপাত করা হয়েছে।

এই গল্পটি ধারাবাহিকভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো, যদি আপনারা পড়তে চান। প্রথম পর্বটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। জানার আগ্রহ থাকলে দ্বিতীয় পর্ব লিখবো ইনশাআল্লাহ। এখানে যে নামগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

বাকি অংশ দ্বিতীয় পর্বে। দেখার আমন্ত্রণ রইলো। আল্লাহ হাফেজ

 

বাপ্পি মজুমদার ইউনুস

সম্পাদক ও প্রকাশক

ভয়েস অব বাংলাদেশ

সভাপতি

নাঙ্গলকোট সাংবাদিক সমিতি

authorbappy@gmail.com

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য:

x