সর্বশেষ সংবাদ
◈ মারছে মানুষে মানুষ!- মোঃ: জহিরুল ইসলাম ◈ নাঙ্গলকোট উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদকের নামে ভূয়া আইডি খুলে প্রতারনার ফাঁদ ◈ “কাজী জোড়পুকুরিয়া সমাজকল্যাণ পরিষদ” কমিটি গঠন ◈ ছাত্রদলের সভাপতি পদে জনপ্রিয়তার শীর্ষে বাগেরহাটের ছেলে হাফিজুর রহমান ◈ চৌদ্দগ্রাম থানার ওসির নির্দেশে কবরে রেখে যাওয়া বৃদ্ধ মহিলাকে হাসপাতালে ভর্তি করলো পুলিশ ◈ নাঙ্গলকোটে ইভটিজিংয়ে প্রতিবাদ করায় সন্ত্রাসী হামলা প্রতিবাদে মানববন্ধন ◈ আজ টাইগারদের দায়িত্ব বুঝে নেবেন ডোমিঙ্গো ◈ জাতীয় দিবসগুলো শিক্ষকদের ছুটি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে কেন? ◈ কুমিল্লা মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাড়ছে লাশের সারি; নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮ জনে; পরিচয় মিলেছে সবার ! ◈ কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে ৭ যাত্রী নিহত

শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন

১৮ জুন ২০১৬, ২:০৬:৫৫

মো. আলাউদ্দিন মজুমদার

মানুষের বুদ্ধি বিকাশের জন্য শিক্ষা একটি অপরিহার্য বিষয়। দার্শনিক রুশো সাম্যবাদী সমাজের প্রত্যাশায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছেন। আর বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশে দেশে শিক্ষা মানুষের মৌলিক ও জন্মগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং নিরক্ষতা, অশিা, কুসংস্কার প্রভৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন বিস্তৃত হতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্খিত মান অর্জন করতে পারেনি।

শিক্ষা বিষয়টি একটি সর্বজনীন, ব্যাপক ও বিস্তৃত প্রসঙ্গ। তাই একে কোনো সংজ্ঞা বা তত্ত্ব দ্বারা সার্বিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাধারণত শিক্ষা বলতে মন-মানসিকতার উৎকর্ষ সাধন করে সাফল্যজনক অবদান রাখাকেই বোঝায়। একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম ব্যবহারের জন্য শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের শিাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক ধাঁচে গড়া। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল করে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করেছিল। পাকিস্তান আমলেও এই শিক্ষাব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। স্বাধীনতার পর শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন করা হলেও কোনো কমিশনই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি এবং শিক্ষাক্ষেত্রেও কাঙ্খিত সংস্কার হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি খুবই হতাশাজনক। দেশে অসংখ্য কেজি স্কুল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলেও শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার কারণ বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও কর্মক্ষেত্রে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার সংস্কারে ব্যর্থতা। এছাড়াও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নে ব্যর্থতা, ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা পদ্ধতির প্রচলন, মেধাহীন ও লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি, অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কম বাজেট বরাদ্দ এবং ক্রমাগত সেশনজটের কারণে আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি অত্যন্ত মন্থর।

সম্প্রতি বেসরকারি টিভি চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাক্ষাৎকারধর্মী একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে। এতে কয়েকজন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর কাছে বাংলাদেশসহ সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়ার মাধ্যমে দেশের বর্তমান শিক্ষারমান যে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, প্রতিবেদনে তার সচিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি প্রচার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনারও সৃষ্টি হয়। কিন্তু এটা তো সত্য যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, তা ওই প্রতিবেদনটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

আমরা জানি, আজকের শিশুরাই আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। তাই সব দেশেই  শিশু বেলার শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েই কারিকুলাম তৈরি করা হয়। এ প্রসঙ্গে গ্রীক মনীষী প্লেটো তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’-এ শিশুদের শিক্ষা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে বলেছেন, শিশুদের শিক্ষা হেলাফেলার কোনো বিষয় নয়। কারণ, নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্র যা চায়, তা শিক্ষার মাধ্যমেই কেবল তৈরি করা যায়।

কিন্তু আমাদের দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কি মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে? মানসম্মত শিক্ষা যে পাচ্ছে না, মাছরাঙা টেলিভিশনের ওই প্রতিবেদনটিই তো তার প্রমাণ। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়- ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করা হয়, জিপিএ-৫ মানে কী?  এর উত্তরে একজন ছাত্র বলে, জানি না। অন্যজন বলে, এখন মনে পড়ছে না। আরেকজন বলেছে, গ্রেডিং পয়েন্ট। আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এসএসসির মানে কি? এর উত্তরে এক  ছাত্র বলেছে, এখন মনে পড়ছে না। অন্যজন বলেছে, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট। একজন ছাত্র বলেছে, স্কুল সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট। আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি এর ইংরেজি কী হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে একজন বলেছে, আই এম এ জিপিএ-৫, অন্যজন বলেছে, আই গিভ জিপিএ-৫ এবং আরেকজন বলেছে, আই গেট জিপিএ-৫। শহীদ মিনার কোথায় অবস্থিত? এমন প্রশ্নের উত্তরে ছাত্রছাত্রীরা বলেছে, ‘জানি না। মনে পড়ছে না।’ অপারেশন সার্চ লাইট সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন বলেছে, জানি  না, অন্যজন বলেছে, অপারেশন করার সময় যে লাইট জ্বালানো হয় তাকেই অপারেশন সার্চ লাইট বলে। এর মধ্যে একজন ছাত্র বলেছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী  তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তাকে অপারেশন সার্চ লাইট বলে। শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস কবে? এ প্রশ্নের উত্তরে ছাত্রছাত্রীদের একজন জানায়, ‘জানি না’, অন্যজন বলেছে, ১৭ আগস্ট, আরেক জন বলেছে, ১০ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কবে জানতে চাইলে বলে, ‘জানি না।’ স্বাধীনতা দিবস কত তারিখে তারও সঠিক উত্তর দিতে পারেনি তারা। তাদের কেউ বলেছে, ১৬ ডিসেম্বর। আবার বিজয় দিবস কত তারিখে জানতে চাইলে বলেছে, ২৬ ডিসেম্বর। রণসংগীতের রচয়িতার নাম বলেছে তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর জাতীয় সংগীতের রচয়িতার নাম বলেছে কাজী নজরুল ইসলাম। মাউন্ট এভারেস্ট কোথায় অবস্থিত? এর উত্তর জানতে চাইলে তারা ইংল্যান্ডের নাম বলেছে। পিথাগোরাস একজন উপন্যাসিক বলে মত দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। নিউটন কোন তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত তাও তারা জানে না। অবলীলায় বলেছে, ‘জানি না।’ আইনস্টাইনের কোনো তত্ত্ব পড়েছে কি না জানতে চাইলে তারা বলেছে, আইনস্টাইনের তত্ত্ব পড়িনি কিন্তু নিউটনের পড়েছি। নিউটনের ওই তত্ত্বের নাম কি জানতে চাইলে তাদের উত্তর, জানি না, মনে হয় গাছ থেকে আপেল পড়ে।

জিপিএ-৫ প্রাপ্ত এসব শিক্ষার্থীকে এমন আরও অনেক সাধারণ প্রশ্ন করা হয়েছিল, এর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়।

ঐতিহাসিকভাবে আমরা পেয়েছি একটি শিক্ষানীতিহীন শিক্ষাব্যবস্থা। ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরে ক্রমেই দানা বেঁধে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ ৪৫ বছরে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার গুণগত মানের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। অপরিকল্পিত, কর্মবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত থাকার ফলে শিক্ষার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে কত সহজে কম পড়াশোনা করে পরীায় পাস করা যায় সেদিকেই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ। সেজন্য মুখস্থবিদ্যা ও প্রচলিত নোট-গাইডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। এ প্রবণতার সুযোগে কোচিং সেন্টারগুলো রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবসায়িক মনোভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে শিক্ষকরা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার চেয়ে কোচিং সেন্টার কিংবা প্রাইভেট পড়ানোর প্রতিই বেশি মনোযোগী। অন্যদিকে দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারিভাবে স্কুল-কলেজসহ এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যেখানে টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি লাভ করা সম্ভব। শিক্ষাঙ্গনে নকল প্রবণতা অব্যাহত থাকার কারণেও শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন, দুর্নীতি, ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা পদ্ধতি প্রভৃতি কারণে অভিভাবকদের মনে হতাশা দেখা দিয়েছে।

তাই যে সব কারণে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি ঘটেছে সেগুলোকে চিহ্নিত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান হলে সার্বিকভাবে শিক্ষার মান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক গুণাবলি অর্জন ও দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে।

Alauddin আলাউদ্দিন।

 

লেখক : মো. আলাউদ্দিন মজুমদার

(সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক) 

সহ-সম্পাদক: দৈনিক আমাদের নাঙ্গলকোট

সাধারণ সম্পাদক: নাঙ্গলকোট লেখক ফোরাম

নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।

মোবাইল: 01871-328379

Amader Nangalkot'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  আমাদের নাঙ্গলকোট পত্রিকা তথ্য মন্ত্রনালয়ের তালিকাভক্তি নং- ১০৫।

পাঠকের মন্তব্য: